22/07/2025
20/7/25
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন পরিচালিত একটি টকশোতে এমন একটি দৃশ্য উপস্থাপিত হয়েছে, যা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থান এবং আলেম সমাজের প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। টকশোতে উপস্থিত ছিলেন তিনজন বক্তা—দুইজন কওমি ধারার আলেম: রফিকুল ইসলাম মাদানী ও ইবনে নুরুল ইসলাম, এবং একজন অ্যাক্টিভিস্ট: আসিফ আদনান। আলোচনার এক পর্যায়ে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও আলেমদের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ইলিয়াস হোসাইন।
তিনি বলেন—“কবে হুজুরদের হাতে রাষ্ট্র তুলে দিলে তারা তা পরিচালনা করতে পারবে? তাদের তো দাওরা হাদীস ছাড়া আর কোনো শিক্ষা নেই। তারা অর্থনীতি বোঝে না, তারা ভূগোল বোঝে না, তারা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জানে না, তারা আধুনিক রাষ্ট্রনীতি কিছুই বোঝে না।”
এই প্রশ্ন কেবল চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়নি, বরং একটি বাস্তব পরিস্থিতির অসহায়তা প্রকাশ করেছে।
এই প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম মাদানী সাহেব বললেন—“কুরআন-হাদীসে অর্থনীতির কথা আছে।” কিন্তু যখন উপস্থাপক ইলিয়াস হোসাইন সরাসরি জানতে চান—“কুরআনের কোথায় অর্থনীতির কথা আছে?”—তখন রফিকুল ইসলাম মাদানী একটি নির্দিষ্ট দলিল বা আয়াত পেশ করতে পারেননি। পুরো জাতি তখন একটি লাইভ আলোচনায় প্রত্যক্ষ করল—একজন আলেম রাষ্ট্র ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কেবল আবেগ ও বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ হাতে নেই সুনির্দিষ্ট দলিল বা আধুনিক জ্ঞানের কোনরূপ প্রস্তুতি।
এই এক মুহূর্তেই বুঝা যায়, কেন আজ কওমি মাদ্রাসা নিয়ে সাধারণ শিক্ষিত জনগণের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। যখন আলেম সমাজ বাস্তব জিজ্ঞাসার সামনে নিশ্চুপ বা অস্পষ্ট, তখন ইসলামের শত্রুরা নয়, বরং ইসলামকে উপস্থাপনকারীরাই ইসলামকে দুর্বল ও অক্ষম হিসেবে তুলে ধরেন।
টকশোতে আরও বলা হয়েছে—“কওমি আলেমরা ইংরেজিকে হারাম মনে করেন। আধুনিক শিক্ষা, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা যদি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেন, তাহলে দেশ অচল হয়ে যাবে।”—এমন মন্তব্য এখন আর কেবল মিডিয়ার কথা নয়, অনেক সাধারণ মানুষের মনেও একই ধরনের ধারণা গড়ে উঠেছে।
আমরা যদি বাস্তবতার মুখোমুখি হই, তবে এ কথাগুলো একেবারে অমূলক নয়। কওমি মাদ্রাসায় ১৪-১৫ বছর দাওরা হাদীস পর্যন্ত পড়ে একজন শিক্ষার্থী ইসলামি ফিকহ, হাদীস, তাফসীর ও আরবি ভাষায় পারদর্শী হন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তিনি রাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, আধুনিক অর্থনীতি, গণিত, বিজ্ঞান, কিংবা এমনকি মৌলিক ইংরেজি শিক্ষাও অর্জন করতে পারেন না। একজন আলেম কিভাবে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন করবেন, বৈদেশিক চুক্তি বুঝবেন, করনীতি নির্ধারণ করবেন কিংবা আধুনিক যুদ্ধনীতি ব্যাখ্যা করবেন—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আবেগ দিয়ে সম্ভব নয়, দরকার কঠিন বাস্তবিক প্রস্তুতি।
তবে এটাও সত্য, কুরআন-হাদীসে অর্থনীতি, রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা—সবই আছে। হযরত ইউসুফ (আ.) মিশরের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। হযরত উমর (রা.) এমন এক রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন যিনি অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনে যুগান্তকারী সংস্কার এনেছিলেন। কিন্তু তাঁরা শুধু ওহির উপর ভরসা করেননি, বরং বাস্তবতাও বুঝতেন, যুগের ভাষাও জানতেন, কৌশলও জানতেন।
আজকের কওমি আলেমদের সেই যুগের নেতৃত্বের স্বপ্ন যদি থাকে, তবে সেই যুগের প্রস্তুতিও নিতে হবে। হাদীস মুখস্থ করার পাশাপাশি বিশ্ব মানচিত্র পড়তে জানতে হবে, উসুলে ফিকহ পড়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান জানতে হবে, ফাতওয়া দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কও বুঝতে হবে।
সমাধান কী?
সমাধান হলো আত্মসমালোচনা এবং শিক্ষার কাঠামোতে সংস্কার। কওমি মাদ্রাসায় ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ভূগোল—এই বিষয়ে ন্যূনতম পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এমন আধুনিক শিক্ষাকে দুশমনের অস্ত্র মনে না করে দাওয়াতের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। একজন আলেম যদি আজকের যুগের চ্যালেঞ্জ বুঝে, যুক্তির ভাষায় কথা বলতে পারেন, আধুনিক মিডিয়াতে সপ্রতিভ থাকেন—তবে তবেই তিনি সত্যিকারের দীনের প্রতিনিধি হবেন।
ইসলামকে মিডিয়ায় বা সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হলে তা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো—আত্মউন্নয়ন। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে নয়, দূর করতে হবে। কওমি আলেমদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে এমন এক যুগের জন্য, যেখানে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় জ্ঞানে তারা দক্ষ, সপ্রতিভ ও প্রজ্ঞাবান।
আজকের কওমি ছাত্রের লক্ষ্য শুধু ইমাম হওয়া নয়—রাষ্ট্রচিন্তায় নেতৃত্ব দেয়া হওয়া উচিত। আর এর জন্য দরকার একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেটি কুরআন-হাদীসের আলোতেই গড়ে ওঠে, তবে যুগের বাস্তবতা ও বিজ্ঞান দিয়ে পরিপূর্ণ হয়।
26/06/2025
26/06/2025
26/06/2025
22/05/2025
22/05/2025
14/05/2025
03/12/2024