07/06/2026
ডিউটি চলাকালীন প্রায়ই এমন আতঙ্কিত মা-বাবার মুখোমুখি হতে হয় ডাক্তারদের। কোলে মাত্র কয়েক মাসের ফুটফুটে সন্তান, আর হাতে একটা এক্স-রে প্লেট। প্লেটের দিকে তাকালে যে কেউ প্রথম দেখায় সত্যিই ভয় পেয়ে যাবেন। উরু আর পায়ের নিচের অংশের দুটি হাড়ের মাঝখানটা একদম ফাঁকা! আমাদের চেনা গোল ‘হাঁটুর বাটি’ (Patella) বলতে সেখানে কিচ্ছু নেই।
প্রথম প্রথম দেখলে মনে হতে পারে বাচ্চার হয়তো বড় কোনো জন্মগত ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান এই আতঙ্কের আড়ালে থাকা প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও নিখুঁত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গল্প শোনায়।
আসলে, জন্মের সময় মানবশিশুদের হাঁটুতে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো কোনো শক্ত হাড় থাকেই না! তার বদলে সেখানে থাকে অত্যন্ত নরম ও নমনীয় এক ধরণের ‘তরুণাস্থি’ বা কার্টিলেজ। এই তরুণাস্থির ঘনত্ব হাড়ের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় এক্স-রে রশ্মি একে খুব সহজেই ভেদ করে চলে যায়। ফলে এক্স-রে রিপোর্টে জায়গাটিকে সম্পূর্ণ শূন্য বা ফাঁকা দেখায়।
কিন্তু প্রকৃতি কেন নবজাতকদের সাথে এমন লুকোচুরি খেলল? এর পেছনের বাস্তব কারণটি জানলে প্রকৃতির দূরদর্শিতা দেখে অবিশ্বাস্য লাগবে।
একটি শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে—প্রথমে উপুড় হয়, তারপর হামাগুড়ি দিতে শেখে, আর একসময় প্রথম হাঁটা শুরু করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সে দিনে শতবার আছাড় খায়, ধপাধপ মেঝেতে পড়ে যায়। আর প্রতিবারই সবচেয়ে বেশি চাপ বা ধাক্কাটা লাগে তার ছোট্ট দুটি হাঁটুতে।
একটু ভেবে দেখুন, জন্মের সময়ই যদি তাদের হাঁটুতে আমাদের মতো শক্ত হাড় থাকত, তবে বারবার এই পড়ে যাওয়ার ধাক্কায় সেটি সহজেই ভেঙে বা ফেটে গিয়ে বাচ্চাটি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যেতে পারত! কিন্তু প্রকৃতি সেখানে নরম তরুণাস্থি দিয়ে রেখেছে, যা একটি ন্যাচারাল ‘শক অ্যাবজরবার’ (Shock absorber) বা কুশনের মতো কাজ করে। এটি বাইরের সব আঘাত নিজে শুষে নেয় এবং ভেতরের কোমল অংশগুলোকে সুরক্ষিত রাখে।
অবশ্য শিশু তো আর সারাজীবন হামাগুড়ি দেবে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে ও দৌড়াতে শেখে, তখন তার শরীরে আরও শক্ত সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। আর ঠিক তখনই মানবদেহ তার পরবর্তী ম্যাজিকটি দেখাতে শুরু করে।
অসিফিকেশন’ (Ossification) নামক একটি বিশেষ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাঁটুর সেই নরম কার্টিলেজ ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ে রূপান্তরিত হতে থাকে। সাধারণত একটি শিশুর বয়স ৩ থেকে ৫ বছর হওয়ার পর এক্স-রে রিপোর্টে এই নি-ক্যাপ বা হাঁটু পরিলক্ষিত হয়।