11/09/2023
(১)
স্কুলে পড়ার সময় আমার এক সহপাঠী ছিল। ক্লাসে পড়াশোনার ব্যাপারে তার মনযোগ কোনকালে ছিল বলে আমার মনে পড়েনা। ক্লাসে টিচার পড়া কেন হয় নি এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তার সহজ স্বীকারোক্তি ছিল স্যার পড়ালেখা ব্যাপারটা কোনভাবেই আমার মাথায় ঢুকে না। সঙ্গত কারনেই ক্লাসে তার রোল নাম্বার অবধারিতভাবে শেষের দিকের দুয়েকজনের মধ্যেই থাকতো। তারপরও এই ছেলেটিকে আমরা সবাই পছন্দ করতাম অন্য কিছু কারনে। জৈষ্ঠ্য মাসের কাঠফাটা রৌদ্রের দিনগুলোতে সে প্রায় প্রতিদিন এক ব্যাগ করে ক্ষীরা নিয়ে এসে সে আমাদের ক্লাসের সবাইকে খাওয়াতো। হয়তো আশেপাশের গ্রামের কারো বাড়ি পুড়ে গেছে, সাহায্যের জন্য এসেছে আমাদের স্কুলে, সে একেবারে দ্বায়িত্ব নিয়ে প্রত্যেক ক্লাসে যেয়ে যেয়ে টাকা তুলে দিত। টিফিনের সময় খেলাধুলার প্রবল উৎসাহে আমরা যখন স্কুল মাঠে বেধে রাখা গরু ছাগলের রশি তুলে দিয়ে তাড়িয়ে দিতাম তখন সে নিজ দ্বায়িত্বে এসব গরু ছাগল নিরাপদ জায়গায় বেধে দিত যাতে কারো ক্ষেতের ফসল নষ্ট না করতে পারে!!! আশেপাশের সবকিছুর প্রতি যার এত ভালোবাসা, সে যে কী অদ্ভুত কারনে পাঠ্য বইয়ের সাথে কোন ভালোবাসাই করতে পারলো না সে রহস্য কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন!!! যথারীতি সময়মত এসএসসি পাশ করে আমরা অনেকেই যে যার দিকে চলে গেলাম। সেও তার পথ ধরে একদিকে চলে গেল শুধু তার এসএসসি পাশ করাটাই আর হয়ে ওঠেনি কোনদিন। আমরা তার জীবনের শ্রীহীন গল্পের শেষটুকুতে ফিরবো তার আগে অন্য একজনের গল্প শুনে আসি।
(২)
এই গল্পটা আমাদের সকলের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এবং প্রিয় মানুষ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের। তিনি একবার বিদ্যাসাগরের উপর এক আলোচনা সভায় এই অসাধারণ গল্পটি বলেন।
গল্পটি অনেকটা এরকম। স্যার একবার একাদশ শ্রেণীর প্রায় শ'খানেক ছেলেমেয়ের একটা ক্লাস নিচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ পাশের বস্তিতে আগুন লেগ্ব যায়। মুহুর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা আর লোকজনের চিৎকার চেচামেচিতে আশেপাশের এলাকাটা নরকে পরিনত হয়। কিছুক্ষনের মধ্যেই ক্লাসের ছেলেমেয়েরা প্রায় সুস্পষ্ট তিনটা দলে ভাগ হয়ে যায়। একদল দৌড়ে গেটের বাইরে চলে যায়। আরেকদল গেটের কাছাকাছি একটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আশেপাশের বিক্ষিপ্ত লোকজনকে বিভিন্নরকম অর্ডার দিতে থাকে। আরেকদল দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। যাহোক ঘন্টা দুয়েক পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলে শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই আবার ক্লাসে এসে উপস্থিত হয়। ক্লাসে গত দুই ঘন্টায় ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনা নিয়েই আলোচনা চলতে থাকে৷ দেখা যায় যারা এতক্ষণ গেটের বাইরে বা গেটের আশেপাশে নিরাপদ দূরত্বে ছিল এবার ক্লাসের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশী উচ্চকিত হয়ে নিজেদের অবদান জাহির করতে থাকে। এরমধ্যে একদলকে দেখা যায়, যাদের প্রায় সবাই কমবেশী আহত। কারো হাতে ফোস্কা, কারো হাত পা ছিলে গেছে, কারো শার্টপ্যান্ট ছিড়ে গেছে। দৈনন্দিন ক্লাসের পারফরমেন্সে এদের অধিকাংশ এতটাই অনুজ্বল ছিল যে তারা এই ক্লাসের কী না স্যার অনেক কষ্টেও তাদের চেহেরা মনে করতে পারছিলেন না। তাদের এ অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করতে তারা অস্ফুট অসংলগ্ন কথাবার্তায় যা বোঝায় তার মর্মার্থ দাঁড়ায় যে তারা পাশের বস্তিতে আগুন নিভাতে গিয়েছিল। সেখান থেকেই তাদের এই অবস্থা!!!
এই ঘটনা থেকে স্যার আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যাবস্থা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি একটা খুব গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন তুলেছেন। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যাবস্থায় এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমাদের ছেলেমেয়েদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন সবসমই মেধার ভিত্তিতে করা হয়। কিন্তু মেধা একটা মানুষের মানসিক পরিপক্কতার খুব গুরুত্বপূর্ন একটি উপাদান হলেও একমাত্র উপাদান নয়। মেধা ছাড়াও শারিরীক শক্তিমত্তা, পরিশ্রমক্ষমতা, মূল্যবোধ, মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরার্থপরতা সহ আরো অজস্র উপাদান একজন মানুষকে পূর্নাঙ্গ মানবিক মানুষ হিসেবে পরিনত করে। অথচ আমরা মূল্যায়ন করছি কেবলমাত্র মেধার!!! ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে দলটি সম্পূর্ন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এই অগ্নিকান্ডের ভয়াভহতার রোমাঞ্চ উপভোগ করেছিল তাদের অধিকাংশই মেধাবী ছিল। আবার যে দলটি নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সবকিছু ভুলে বোকার মত কেবলমাত্র মানবিকতার টানে একটা বিপদের মধ্যে ছুটে গিয়েছিল তাদের প্রায় সবাই মেধার দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল। অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশী মানবিক হওয়ার পরেও কেবলমাত্র মেধার দিক থেকে পিছিয়ে থাকার কারনে এই ছেলেমেয়েগুলো আমাদের সমাজে আজীবন অবমূল্যায়িত থেকে যাবে!!!
(৩)
আমাদের দেশের সামাজিকীকরণ কিংবা প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ছেলেমেয়েদের নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারটা সবসময়ই ভয়ংকরভাবে উপেক্ষিত। বাচ্চারা কথা শুরু করার পর থেকেই আমাদের অভিভাবকরা যেভাবে তাদেরকে এ, বি, সি, ডি, অ, আ, ক, খ কিংবা বিভিন্ন ইংলিশ রাইম মুখস্থ করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যান, কিংবা আরেকটু বড় হলে চুল কীভাবে কাটতে হবে, জামাকাপড় কিভাবে পড়তে হবে, সবার সাথে মেশা যাবেনা, বন্ধুত্ব করা যাবেনা এসব ব্যাপার নিয়ে যতটা তৎপর থাকেন বাচ্চাদেরকে নৈতিক শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে তাদের তেমন কোন আগ্রহ থাকে না। আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে পরবর্তী জীবনে ছেলেমেয়ের উজ্বল ভবিষ্যতের জন্য যে ব্যাপারটা সবচেয়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একমাত্র জরুরী বিষয় তারা সজ্ঞানে হোক অজ্ঞানে হোক শুধু সে ব্যাপারটিকেই পেট্রোনাইজ করেন৷ ফলে ছেলেমেয়েদের মেধার বিকাশ নিয়ে অভিভাবকরা যতটা উৎকন্ঠিত থাকেন বাচ্চাদের মানবিক বিকাশ নিয়ে তাদের তেমন কোন মাথাব্যাথা থাকে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, দেশে মেধার বিকাশ হচ্ছে কিন্তু মনুষ্যত্বের বিকাশ হচ্ছে না। আমরা মেধাবী মানুষ পাচ্ছি কিন্তু মানবিক মানুষ পাচ্ছি না৷ মেধাবী পেশাজীবি পাচ্ছি কিন্তু মানবিক পেশাজীবী পাচ্ছি না। মেধাবী এসব পেশাজীবী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যাবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ঘুস এসব ব্যাপারকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি, হা হুতাশ করছি কিন্তু এই অবস্থার পেছনে আমাদের নিজেদের দায়ভারটুকুর দিকে কেউ দৃষ্টিপাত করছি না।
ঘুণে ধরা একটা সমাজ, একটা দেশকে হুট করে বদলে দেয়া যায় না। আমরা যদি আজকে থেকে আমাদের পরিবারে ছেলেমেদের নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া শুরু করি তাহলে হয়তো আমাদের অনাগত প্রজন্ম একদিন সুন্দর একটা মানবিক সমাজে বেড়ে উঠবে। পূর্বসূরী হিসেবে এটা আমাদের এক ধরনের নৈতিক দ্বায়িত্ব। আমাদের মনে রাখা উচিৎ মেধাহীন একটা মানবিক সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব কিন্তু মানবিকতাহীন একটা মেধাবী সমাজে বেঁচে থাকাটা হবে দুঃস্বপ্নের মত!!!
(৪)
আমার সেই বন্ধুটি এখন ক্ষেতে কামলা দিয়ে খায়! মেধার বিকাশের অভাবে সে আমাদের সমাজের তথাকথিত সভ্যদের মধ্যে নিজের জায়গা করে নিতে পারেনি। কিন্তু সে এখনো আগের মতই মানবিক আছে। এখনো আশেপাশের সবকিছুর প্রতি তার ভালোবাসা সীমাহীন। কিন্তু সে সম্ভবত খুব ভুল একটা সময়ে জন্ম নিয়েছে, যে সময় একটা যান্ত্রিক সমাজ কাঠামো একটা মানুষের মেধার বিকাশের পেছনে তার সবটুকু বিনিয়োগ করে আশা করে বসে থাকে সর্বাঙ্গসুন্দর একজন মানবিক মেধাবী মানুষ সৃষ্টি হবে!!! একটি শিশুর মেধার বিকাশের জন্য যেমন পরিচর্যার প্রয়োজন তেমনি তার মনুষ্যত্বের বিকাশের জন্যও প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা!!! আমরা এই সমাজের মানুষগুলো এই সত্যটা যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবো আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীটা তত তাড়াতাড়ি আরো সুন্দর বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
© Anik Iqbal