17/10/2024
আব্বু, আমি আপনাকে ভুলতে পারছি না
আজ ১৭ অক্টোবর,২০২৪ ঈ। আপনি আমাদের থেকে হারিয়ে যাবার ৪৪তম দিন। এখন বছরের ৩৫৫/৫৬ দিন বড়ো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মহাকালের এই এই সফর কখনও ফুরোবে না। মৃত্যুুর আগেই আমাকে মৃত্যু গ্রাস করছে প্রতিমুহূর্তে। আমি যেন বার বার মৃত্যু থেকে জেগে ওঠি। দিনরাতে কয়েকবার আমার মৃত্যু হয়। সঙ্গে পরিবারের সবারও হয়তো। এই বেদনা ও শোক আমাদের তিলে তিলে ক্ষয় করে দিচ্ছে। চোখ মেললেই আপনার ছায়া দেখি। আপনার চেহারা দেখি। আপনার গলার অমিত তেজ ভেসে আসে। আপনি আমাদের নাম ধরে ধরে ডাকছেন। এখনও কানে বাজে সেসব ডাক।
আপনার গড়া মাদরাসায় পড়ে আছি মরা মানুশের মতো।নিজস্ব,চৈতন্য,বোধ–উপলব্ধি, গরিমা মরে গেছে সেই সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখেই; আপনার ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গেই। জানি না কোন্ শক্তিবলে এখনও চোখ মেলে তাকাই! আকাশ দেখি, জগৎ দেখি। জনমানুশের কোলাহল দেখি। তবুও যেন নিজের অজান্তে আপনার ছবিটা খুঁজি—মাদরাসার দফতরে, মাদরাসার মাঠে, খোলা আঙিনায়; যেখানে প্রায়শঃই আপনি হুজুরদের ডেকে নিয়ে বসতেন। মনখুলে মাদরাসা ও নিজের ভালোমন্দ আলোচনা করতেন। কখনও সূর্যের চিকচিক আলো আপনার গায়ে গড়িয়ে পড়ত। কখনও বা আমকাঁঠাল গাছের স্নিগ্ধ ছায়া আপনাকে বেষ্টনী দিয়ে রাখত। চা তৈরী করে সবাইকে নিয়ে পান করতেন। সবজিওয়ালা, মাছবিক্রেতা যেতে দেখলে ডেকে আনতেন। মাছ–সবজি কিনে নিতেন নিজের জন্য ও মাদরাসার জন্য। আজ সেই গুলবাগিচায় সব আছে আগের মতো, নেই শুধু দিলখোলা সেই মজলিস। নেই পরমনির্ভরতার আপনজন৷ জীবনের রওনক আসবে কোত্থেকে?
•আব্বু, আপনার রুমের সামনের খোলা জাগার চেয়ারগুলো দিব্যি এখনও বহাল। উপরে ঝুলে থাকা ফ্যান! কিছুইতো যায়নি। হারায়নি। রুমের তালাছাবি আছে আগের মতোই। গ্যাস-স্টোভ, পানি উঞ্চতার তড়িত্বযন্ত্র গিজার, কিতাবের আলমিরা, হোমিও অষুধের অনিন্দ্য সুন্দর দুটি আলমারিতে সাজানো বিবিধ অষুধ আগের মতোই আছে। শেষরাতে জেগে যেই জায়নামাজে নামাজ পড়েছেন দীর্ঘদিন। কেঁদেছেন, হাত উঠিয়েছেন, নিজের জন্য, আমাদের জন্য, মাদ্রাসার জন্য, সবার জন্য দোয়া করেছেন— যেন আলেম হই, বড় হই, সুখেশান্তিতে থাকি, আল্লার রহমত, আল্লাহর অনুগ্রহ, আল্লাহর করুণা, আল্লাহর কৃপা সবসময় শামেলেহাল হয়, সঙ্গী হয়।" সেই দোয়া করেছেন যেই জায়নামাজে বসে দীর্ঘদিন, সেই জায়নামাজ আজও পড়ে আছে, ভাঁজ করে রেখেছি। আপনার সেই পুরনো চেয়ার!
—যে চেয়ার দেখে আসছি আজ ৩০ বছর, সেই লৌহকাঠের চেয়ার পড়ে আছে আগের মতোই। শুধু পুরো ঘরজুড়ে বিরানভূমির নীরবতাকে নবাগত মনে হয়। নির্জন,কোলাহলশূন্য মধ্যদুপুরের নিঃসঙ্গতা আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আমাদের সময়গুলোকে।
আব্বু, আপনি বিশ্বাস করুন যখনই আপনার ঘরে ঢুকি, ঢুকতে হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও, বুকফেটে হৃদয় চৌচির হয়ে এই জমিন ছেড়ে কান্নার অবিরাম জলধারা ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আমি ভাসতে ভাসতে কখনও উদাস হয়ে পড়ি, আর নিজের প্রতি নিজেকেই হারিয়ে ফেলি, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি।
•কল্পবাস্তবে দেখি, আপনার দুপাশের জানলার পার্টগুলো খোলা, কিছুটা আড়াল করা, রুমের মধ্যস্থিত পর্দাটা নামানো। একটু সরালেই আপনাকে দেখব বেগোর ঘুমে অথবা বইপত্রে ডুবে আছেন৷ এরকইমই দেখে আসছি গত ২৭/২৮ বছর। হাল্কা শব্দ করলে জেগে বলবেন, কে? খালেদ?!একটু চা বানা! আমার জন্য একটু নাশতা নিয়ে আয়...! অজুর পানি দে।
কিন্তু না, এটা আজ কল্পনায় শুধু। বাস্তবতা তো ভিন্ন কিছুরই ইঙ্গিত দেয়। জানি না, আপনি কবরে কেমন আছেন। আপনার রব—প্রভু আপনার প্রতি সদয় আচরণ করছেন? না মহান রাব্বুল আলামিন আপনার প্রতি খড়গহস্ত হয়ে উঠেছেন, আমরা জানি না।
•মানুশ হিসেবে আপনিও ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না নিশ্চয়ই, কিন্তু আল্লাহর রহমত, আল্লাহর অনুগ্রহের প্রত্যাশা যদি আমরা না হারাই—আমরা আশা করতে পারি, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহান আপনার প্রতি রহম করেছেন, রহম করবেন আর কবর হয়ে উঠেছে পরম কোমল–স্নিগ্ধ, আপনি জান্নাতের গোলাপ ও হাসনাহেনার সুবাসে ঘুমিয়ে আছেন। রহমতের ফিরিশতারা আপনার উপর শীতলতার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। আপনি একঘুমেই হাজির হবেন ময়দানে মাহশারে। সেদিন আপনার হিসাবনিকাশ হয়তো সহজ হবে। আমরা এই আশা করি। আপনি ক্ষমা পাবেন আপনার রবের কাছে। রহমানুর রহিমের কাছে। সেদিনের চূড়ান্ত হিসাবে নাজাত পেয়ে জান্নাতুল ফেরদাউসে আপনার সাথে দেখা হবে পুনর্বার,বারবার।
•আব্বু, আপনি বিশ্বাস করেন! গতকাল আপনার নাতি বাকির মোহাম্মদ খান, যেই নাতিকে আপনি আদর করে "বাকু" বলে ডাকতেন, আপনার স্মরণে, আপনাকে খুঁজে না পেয়ে প্রবল কান্নাকাটি করেছে। জানলাম, বাকির কাঁদতে কাঁদতে হয়রান হয়ে গিয়েছে। আপনাকে অনবরত–বিরামহীন ডাকছে।
আপনি হয়তো কবর থেকে আমাদের এই কান্না শুনছেন না, কিন্তু আমরা কাঁদছি ওরা কাঁদছে। আমাদের এই অবিরাম ক্রন্দন কোথায় কখন থামবে বা এর সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে সেটা আমাদের অজানা।
•বাড়ির উঠান, পুকুরপাড়, চালতাগাছের তলা নারকেলগাছের তলা এবং গেটের সামনে আপনি চেয়ার পেতে বসে থাকতেন। আপনার জন্য আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী খেদমত–সেবা, শুশ্রূষা যাই বলি না কেন তাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছি। আপনার সেবার মাধ্যমে মাওলার সন্তুষ্টি খুঁজতাম, খোঁজার চেষ্টা করতাম। হয়তো কখনো কখনো ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার প্রতিদান আমরা সেভাবে দিতে পারতাম না। মানুশ হিসেবে আমাদের অপারগতা এবং অক্ষমতা ওজর হিসেবেই কবুল করবেন আশা করি।
•আব্বু, আজ অনেকদিন হয়ে গেল আপনি ইনতেকাল হয়েছে। কিন্তু আপনার বিয়োগ বেদনা– আপনাকে হারানোর কষ্ট আমরা আজও ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারছি না।
•সন্তান হিসেবে নানান কারণে আপনার প্রতি রাগ–অভিমান কিছুটা আমারও ছিল। কিন্তু আপনার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই অভিমান রাগ ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। অচিন দিগন্তে মিশে গেছে সেসব মনোজঞ্জাল। আজ আপনি বিশ্বাস করুন, আপনি আমাদের জন্য বৈষয়িক প্রথাগত উল্লখযোগ্য কোন সম্পদ রেখে যাননি বা রেখে যেতে পারেননি সেটা নিয়ে আমাদের আজ আর কোন হতাশা আফসোস অভিমান কিছুই নেই। আমরা শুধু এটুকু বিশ্বাস করি, আপনার মতন সবার একদিন মৃত্যু হবে, আমরাও কবরে চলে যাব, আমাদের কবরস্থ করা হবে। আমরাও এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাব একদিন। যদি আপনার সঙ্গে দ্বিতীয়বার আমাদের সাক্ষাৎ হয়, একান্ত মুলাকাত হয়, তবে তা হবে জীবনের পরমপ্রাপ্তি। এর চেয়ে বেশি কিছু আমরা আশা করছি না। জানি না, মহান আল্লাহ আমাদের সেই আশা পূরণ করবেন কিনা!
•আপনি আর কখনো ডাকবেন না। রাত বেশি হয়ে গেলে পথ থেকে, বাজার থেকে ডেকে নেওয়ার জন্য ফোন করবেন না; বলবেন না, "তুই কই আছোত?' আমার মোবাইলফোনে আপনার নম্বর থেকে কখনও আর আপনার রিং আসবে না! ফোন রিসিভ করতেই হৃদয়গাঁথা সেই কন্ঠ আমি শুনতে পাবো না আর।
•আজ আমি অভাগা, খুব অল্প বয়সে বড়ো দুঃসময়ে আমি আপনাকে হারিয়েছি। জগতের নিঃসার্থ অসীম অকৃত্রিম মমতার চাদর হারিয়ে ফেলেছি। আপনার প্রকৃত ভালোবাসা আর কখনও সিক্ত করবে না আমার হৃদয়জগৎ।
•এই বেদনাবিধুর লগনে মনে জেগে উঠছে স্মৃতির অনেক চারাগাছ। কোনটা রেখে কোনটা বলি, সেই হিসাব করে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। স্মৃতি বলছে, ১৯৯৮ ঈসায়িতে আপনি আমাকে হাত ধরে ঢাকার মাদরাসায় নিয়ে এসেছিলেন। পড়াশোনা করার জন্য। লেখাপড়া করার জন্য। মানুশ হবার জন্য। আপনার নিজের গড়া মাদরাসা। জীবনের সবটুকু দিয়ে গেছেন যে মাদরাসা বা দীনি মারকাজের জন্য।
তখন আপনার বয়স হিসাবমতে চল্লিশের কোঠায়। সকালে বেরিয়ে পড়তেন মাদরাসার কাজে বেশিরভাগ সময় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে আসত। পুরাটা দিন আপনার অপেক্ষায় থাকতাম। বারান্দার খিলান ধরে পথ চেয়ে থাকতাম, আপনি কখন ফিরে আসবেন সেই আশায়। কখনও কখনও আমার এক উসতাজ সান্ত্বনা দিত, " হুজুর চলে আসবে, আসতেছে" বলে। আহ! সেসব দিন তো জীবনের অতীত। সেই ত্যাগতিতিক্ষার বিনিময় গড়া ওঠা প্রতিষ্ঠানের চাহানে আপনাকে ছাড়া আমার যাপিত সময়গুলো বড়ো বিষাদপূর্ণ ও শোকদগ্ধ।
প্রায় বলতেন, আমি দোয়া করি তুমি আলেম হও। আল্লাহ তোমার মর্যাদা বুলন্দ করবেন। দুনিয়ায় রিজিক–আহারের অভাব হবে না। সুখসমৃদ্ধি তোমার পিছু নেবে।
এইযে আমার প্রতি আপনার বাবাসুলভ নিঃস্বার্থ শ্রমপ্রচেষ্টা রোনাজারি ভাতকাপড়ের ছুটোছুটি এ সব ভাবলে কান্নার ঢেউ ধলা পাকিয়ে উঠে। তোলপাড় হয়।
•দেখতে দেখতে লম্বা একটা সময় পড়াশোনা করি। আচমকা নানান কারণে আমার পড়াশোনায় চ্ছেদ ঘটে। তবুও আমাকে পড়াশোনায় ফেরানোর আকুলতা ছিল। যদিও নিজের কমজুরি ও সাহসহীনতার ফলে পড়ালেখার হারানো দুর্মর প্রত্যাশা কখনও ফিরে পাইনি। নির্ঝঞ্ঝাট হয়নি পরবর্তী জীবন। হিসাবের মতো সমীকরণ মিলিয়ে জীবন আর সময় এগোয়নি আমার। অসময়ে বিয়ে করিয়ে দেন। অগোছালো জীবনের সেই পথচলা আজও অটুট। একসময় আহ্লাদের সুভাস নিয়ে আপনার নাতনির আগমন হয়। আপনার আশা ছিল নায়নাতকুর দেখবেন। আলেম হবে। হাফেজা হবে। হাফেজ হবে। জগতজোড়া খ্যাতি আনবে।বিয়েশাদি দেবেন। আল্লাহ আপনার সেই কামনা দুনিয়ায় পূরণ করেননি। হয়তো পরকালে এর নতিজা পাবেন।
এখন বড়ো নাতিন কুরআনের অর্ধেক হাফেজা হয়েছে। আপনার মৃত্যুর সময় দেখে গেছেন ১৫ পারা শেষ হয়েছে। আশা করি বাকিটুকুও শেষ করবে আল্লাহর রহমতে। ইনশাআল্লাহ।
আপনি দেখবেন, আল্লাহ আপনার সেই আশাও পূরণ হবে।
আপনার খরচে বিরল উদারতা ছিল। বিশেষত খাবারদাবারে। খানাখাদ্যে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আপনার উদারতা ইতিহাস হয়ে থাকবে।এই খাতে আপনার আপসহীন উদারতা আমরা চিরকাল মনে রাখব। পকেটে ৫ টাকা থাকলে আপনি দশ টাকা খরচ করার বন্দোবস্ত করতেন। ১০ টাকা থাকলে আপনি ৩০ টাকা খরচ করতেন। পৃথিবীর কেউ না জানুক আমরা জানি। মহান রব তিনি সব জেনেছেন, দেখেছেন।
নিশ্চয়ই এর আজর–বা প্রতিদান দিতে আল্লাহ ভুলবেন না৷ আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। কবরের ঘুম হোক চিরপ্রশান্তির।
"রব্বিরহাম হুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা"।
আলকুরআন।
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪