04/04/2026
“রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল”
(ইংরেজিতে: “Nero fiddled while Rome burned”)
একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক কিংবদন্তি এবং প্রবাদ।
এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, নির্লিপ্ততা বা সংকটের সময় অপ্রাসঙ্গিক কাজে মগ্ন থাকাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
ঘটনার পটভূমি
৬৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে রোমের মহা অগ্নিকাণ্ড (Great Fire of Rome) ঘটে। এই আগুন ৬ দিন ধরে জ্বলে এবং রোমের প্রায় ৭০% এলাকা ধ্বংস করে দেয়। হাজার হাজার মানুষ গৃহহারা হয় এবং অনেকে মারা যায়। আগুন সম্ভবত সার্কাস ম্যাক্সিমাসের কাছে দোকান থেকে শুরু হয়েছিল এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সম্রাট নিরো (Nero Claudius Caesar) তখন রোমান সাম্রাজ্যের শাসক (৫৪–৬৮ খ্রি.)। তিনি ছিলেন জুলিও-ক্লডিয়ান রাজবংশের শেষ সম্রাট এবং ইতিহাসে বিতর্কিত চরিত্র কেউ তাকে নিষ্ঠুর, পাগলাটে ও অত্যাচারী বলে, আবার কেউ তার শিল্পপ্রিয়তা ও নগর পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে।
প্রবাদের উৎস ও কাহিনি
প্রাচীন রোমান ঐতিহাসিকদের লেখায় এই ঘটনার উল্লেখ আছে:
ট্যাসিটাস (Tacitus): বলেন যে, আগুনের সময় নিরো সম্পর্কে গুজব ছড়িয়েছিল যে তিনি রোমের ধ্বংস দেখে ট্রয়ের পতন নিয়ে গান গেয়েছিলেন।
সুয়েটোনিয়াস (Suetonius): নিরো নাকি থিয়েট্রিক্যাল পোশাক পরে ট্রয়ের ধ্বংসের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন এবং কাঁদছিলেন।
ক্যাসিয়াস ডিও (Cassius Dio): নিরো নাকি সিথারা (cithara) বাদকের পোশাক পরে গান গেয়েছিলেন।
এই গল্প থেকে পরবর্তীকালে প্রবাদটি তৈরি হয়েছে যে, নিরো নির্লিপ্তভাবে সংগীত বাজাতে বাজাতে রোম পুড়তে দেখছিলেন।
বাংলায় “বাঁশি” বলা হলেও মূল ইংরেজি প্রবাদে “fiddle” (বেহালা জাতীয় তারযুক্ত যন্ত্র)।
সত্যতা কতটা?
এই কাহিনিটি মূলত কিংবদন্তি বা অতিরঞ্জিত গুজব, পুরোপুরি সত্য নয়। কয়েকটি কারণ:
যন্ত্রের সমস্যা: “Fiddle” (বেহালা) ১০ম-১১শ শতাব্দীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। নিরোর সময় (১ম শতাব্দী) এটি ছিল না। নিরো সংগীতপ্রিয় ছিলেন এবং তিনি লাইর (lyre) বা সিথারা (cithara এক ধরনের তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র, লুট বা গিটারের পূর্বসূরি) বাজাতে পারতেন।
কিন্তু আগুনের সময় তিনি এটি বাজিয়েছিলেন এর কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
নিরোর অবস্থান: আগুন শুরু হওয়ার সময় নিরো রোমে ছিলেন না, তিনি অ্যান্টিয়াম (Antium) নামক স্থানে (রোম থেকে প্রায় ৫৫ কিমি দূরে) ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ফিরে আসেন এবং ত্রাণকার্যে অংশ নেন, তার নিজের প্রাসাদ ও বাগান গৃহহারা মানুষের জন্য খুলে দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক প্রচারণা:
নিরো অজনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ফ্লাভিয়ান রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। তাদের সময়ে নিরোর বিরুদ্ধে অনেক গুজব ছড়ানো হয়। যেমন তিনি নিজেই আগুন লাগিয়েছিলেন (নতুন প্রাসাদ “Domus Aurea” বানানোর জন্য)। এসব গল্প তার খারাপ ইমেজ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, নিরো আগুন লাগানোর সাথে জড়িত ছিলেন না এবং তিনি ত্রাণকার্যও করেছিলেন। তবে আগুনের পর তিনি রোমকে নতুন করে গড়ার পরিকল্পনা নেন, যা অনেকের কাছে অসময়োচিত মনে হয়েছিল।
প্রবাদের অর্থ ও ব্যবহার
এই প্রবাদটি আজও ব্যবহৃত হয় যখন কোনো নেতা বা ব্যক্তি বড় সংকটের সময় নির্লিপ্ত থাকেন বা অপ্রয়োজনীয় কাজে মন দেন।
উদাহরণ:
রাজনৈতিক সংকটে নেতারা যখন অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
ব্যক্তিগত জীবনে জরুরি কাজ ফেলে রেখে অকাজে সময় নষ্ট করা।
সংক্ষেপে,
এটি একটি শক্তিশালী রূপক প্রবাদ, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এর অনেক অংশ অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা।
নিরোকে “পাগল সম্রাট” হিসেবে চিত্রিত করার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকা বেশি।
#শাহ_আজিজ