15/07/2024
তোমার মাখানো ভাতের সে স্বাদ, এখনও ভুলিনি মাগো। ভাতের থালা সামনে নিয়ে এখনও কি রাত জাগো। ...... পারতেই হবে সইতে মাগো যত দিক যন্ত্রণা। কিছুতেই আমি জানতে দিব না, মক্তির আস্তানা। আংগুল গুলো অবস ভীষণ, একটিও নেই নখ। হয়তো আজই টর্চার সেলে, তুলেই নেবে চোখ। স্বাধীন হল বাংলা, তবু মায়ের চোখে জল। কোথায় হারাল আজাদ, তোরা কেও ত এসে বল...।
"ছবির ছেলেটাকে চেনেন?
শহীদ আজাদ একটি দেশ। শহীদ আজাদ একটি মানচিত্রের নাম। একটি লাল-সবুজের পতাকায় স্মৃতিগাঁথা এক অমর নাম। অথচ সেই আজাদের জন্ম বার্ষিকী কিংবা মৃত্যু বার্ষিকী নীরবে আসে নীরবে চলে যায়। ক’জন আমরা রাখি সে খবর? ক’জনই বা জানি শহীদ আজাদ ও তাঁর মা সম্পর্কে? আর জানলেই বা কতোটুকো জানি?
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। রাতে আজাদের মগবাজারের বাড়িতে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। গুলিতে আহত হন আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ। একই সময় ধরা পড়ে ক্র্যাক প্লাটুনের একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সেসময় আজাদকেও আটক করা হয়। তাকে ধরে নিয়ে রাখা হলো রমনা থানা সংলগ্ন ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে।
এরপর রমনা থানায় ছুটে গিয়েছিলেন আজাদের মা ছেলের সাথে দেখা করার জন্য। মাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আজাদ। মা জানতে চাইলেন ‘কেমন আছো’, আজাদ মাকে বললেন, ‘খুব মারে, ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি’। ছেলের সামনে তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। বরং ছেলেকে সাহস দিয়ে বলেছিলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোন কিছু স্বীকার করবে না’।
সেদিন থানা হাজতে মায়ের কাছে আজাদ ভাত খেতে চান। আজাদ মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়ে বলেন, ‘মা কতদিন ভাত খাই না। আমার জন্য ভাত নিয়ে এসো’। মা ভাত নিয়ে যান থানায়। গিয়ে দেখেন ছেলে নেই। এই ছেলে আর কোনদিনও ফিরে আসে নি। ধরে নেওয়া হয় সেদিন-ই ঘাতকরা মেরে ফেলেছে মায়ের যাদুধন আদরের আজাদকে।
ছেলে একবেলা ভাত খেতে চেয়েছিলেন। মা পারেননি ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে। সেই কষ্ট-যাতনা থেকে পুরো ১৪টি বছর ভাত মুখে তুলেন নি মা! তিনি অপেক্ষায় ছিলেন ১৪ টা বছর ছেলেকে ভাত খাওয়াবেন বলে। বিশ্বাস ছিলো তাঁর আজাদ ফিরবে। ছেলের অপেক্ষায় শুধু ভাতই নয়, ১৪বছর তিনি কোন বিছানায় শোন নি। শানের মেঝেতে শুয়েছেন শীত গ্রীষ্ম কোন কিছুতেই তিনি পাল্টান নি তার এই পাষাণ শয্যা। আর এর মুল কারণ আজাদ রমনা থানায় আটককালে বিছানা পায় নি।
ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ে পড়ার সময় দেশের স্বাধীনচেতা মানুষ যখন স্বাধীনতার জন্য প্রচন্ড উত্তপ্ত তখন মায়ের কাছে লেখা আজাদের চিঠি হুবুহু তুলে ধরলাম।
মা,
কেমন আছ?আমি ভালো ভাবেই পৌছিয়াছি। এবং এখন ভালোই আছি।হরতাল বন্ধ হয়ে গেছে।রীতিমত ক্লাস হচ্ছে। পরীক্ষা শীঘ্রই হইবে। দোয়া করো। তোমার দোয়া ছাড়া কোন উপায় নাই। আমি নিজে বা কি ধরণের মানুষ আমি নিজেই বুঝতে পারি না। আচ্ছা মা তুমি বল তো আমি সব দিক থেকে কি ধরণের মানুষ। আমি তোমাক আঘাত না দেয়ার চেষ্টা করি। তুমি আমার মা দেখে বলছি এবং তোমার মত মা পাওয়া দুর্লভ। এই বিংশ শতাব্দিতে তোমার মত মা যে আছে কেহ বিশ্বাস করবেনা। আমি এগুলি নিজ হৃদয় থেকে বলছি। তোমার কাছে ভালো ছেলে সাজার জন্য নয়। যদি কোনদিন পৃথিবীতে তোমার দোয়ায় বড় নাম করবো। যদি হতে পারি পৃথিবীর সবাইকে জানাবো তোমার জীবনি, তোমার কথা। আমি ভালো পড়াশুনা করার চেষ্টা করছি।
ইতি
তোমার ছেলে আজাদ
শুভ জন্মদিন শহীদ মাগফার উদ্দিন চৌধুরী আজাদ।
ভালো থাকুক জীবনের প্রেমগুলো। ভালো থেকো কিংবদন্তী।