01/04/2026
বিসিএস লিখিত পরীক্ষার্থীদের জন্য কিছু পরামর্শঃ
বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শুধু লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার একটি যোগ্যতা মাত্র। মূল লড়াইটা হয় বিসিএস লিখিত পরীক্ষায়। আর বিসিএস মৌখিক পরীক্ষা ভালো হওয়াটা অনেকক্ষেত্রে ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভাইভা বোর্ডের মার্কিং স্টাইল, আপনার প্রস্তুতি, আত্মবিশ্বাস এবং স্বল্প সময়ে আপনার উত্তর দেয়ার ভঙ্গি অনেক কিছুই জড়িত। তাই, কেউ কেউ ভালো প্রস্তুতি নিয়েও অনেক সময় আশানুরূপ ভাইভা দিতে পারেন না। আবার কারও কারও কপাল ভালো হলে প্রশ্নগুলো অনুকূলেও পড়ে যেতে পারে। তবে, বিসিএস লিখিত পরীক্ষা ক্যাডার হওয়ার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কারণ এখানেই মেধার আসল লড়াই হয়। তাই, লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা খুবই জরুরী। এই দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য পরীক্ষার জন্য কিছু কার্যকরী পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রিলির পাশাপাশি লিখিত প্রস্তুতিঃ
প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পড়ে আসা অনেক কিছুই আপনার লিখিত পরীক্ষায় কাজে লাগে। সেক্ষেত্রে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সময় লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসেও আছে এমন টপিকগুলো একটু বিস্তারিত পড়ুন। যেহেতু বিসিএস লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফলাফলের পর যে সময় দেয়া হয় তা পর্যাপ্ত নয় তাই প্রিলিমিনারির পাশাপাশি লিখিত প্রস্তুতি খানিকটা এগিয়ে রাখা উচিৎ। বিসিএস মানেই শুধু প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নয়। কিন্তু অনেক প্রতিযোগীর পড়ার ধরণ দেখলে মনে হয়, প্রিলিমিনারিতেই সবচেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে, লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেশি সময় দেয়া উচিৎ।
২. প্রস্তুতি কৌশল ও রিসোর্সঃ
পিএসসি-র নির্ধারিত সিলেবাসের প্রতিটি টপিক ধরে প্রস্তুতি নিন। একেবারে A to Z সব পড়ার প্রয়োজন নেই। অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয় কিছু টপিক বাদ দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে বিগত বছরের প্রশ্নগুলো দেখে এনালাইসিস করুন। বিষয়ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো মার্ক করুন। সেক্ষেত্রে আপনার পড়া কিছুটা কমবে। "Work smarter not harder" এই নীতি অনুসরণ করতে পারেন।আপনার "Strong Zone" এ সর্বোচ্চ মার্ক তুলুন আর "Weak Zone" এ একটু বেশি সময় দিয়ে সেটা শুধরানোর চেষ্টা করুন। দেখা যাবে, মোটের উপর ভালো পরীক্ষা হয়েছে।
আর রিসোর্সের জন্য বিভিন্ন রেফারেন্স বইতো আছেই। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকা, বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর, পত্রিকার আন্তর্জাতিক পাতা, সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে আপডেটেড তথ্য এবং ইউটিউব বা ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত তথ্য এসব বিষয় নিয়ে নোট করতে পারেন। মূল কথা, আপনাকে শুধু বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। পাশাপাশি যেকোনো বিষয়ে বিশ্লেষণের জন্য আপনার জ্ঞান এবং অনুধাবনের সীমা বাড়াতে হবে। সবকিছু একদম তৈরি থাকবে না। কিছু জিনিস নিজের বিশ্লেষণ দক্ষতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
৩. বিষয়ভিত্তিক গুরুত্বঃ
গাণিতিক যুক্তি, মানসিক দক্ষতা ও বিজ্ঞানে তুলনামূলক বেশি নম্বর তোলা সম্ভব, তাই এগুলোতে বাড়তি জোর দিন। পাশাপাশি কিছু টপিক আছে যেমনঃ বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার পার্ট যেগুলোতে মার্ক কাটার আসলে তেমন কোনো সুযোগ নেই। সে বিষয়গুলোতে আপনার সর্বোচ্চ নাম্বার তুলুন।
বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির উত্তরের মান বাড়াতে প্রাসঙ্গিক ম্যাপ, চার্ট, ডাটা এবং উদ্ধৃতি ব্যবহার করুন। বাংলা সাহিত্যও কমন পড়ার মত কিছু টপিক আছে যেখানে ভালো নাম্বার তুলতে পারবেন। ইংরেজির জন্য নিজের ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং প্রাকটিসের উপর জোর দিন।
৪. পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনা
লিখিত পরীক্ষায় নম্বরের পার্থক্য হয় উপস্থাপনার গুণে। সুন্দর হাতের লেখা এবং স্পষ্ট মার্জিন পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।পাশাপাশি লেখার ক্ষেত্রে গড়পড়তা লেখা পরিহার করতে হবে। প্যারা আকারে লিখলে প্রতিটি প্যারায় একটা করে থিম পরীক্ষককে বুঝানোর চেষ্টা করবেন।
প্রথমে ভূমিকা টাইপ কিছু লেখা, তারপর মূল লেখা এবং শেষে উপসংহার টাইপ কিছু লিখা। কোটেশন, ডেটা, চার্ট ও ম্যাপের সুযোগ থাকলে ব্যবহার করা। অপ্রাসঙ্গিক লেখা থেকে বিরত থাকা। প্রতিটি প্রশ্নের মান অনুযায়ী উত্তর করা। লেখার পৃষ্ঠার উপর নয় বরং মানের দিকে খেয়াল রাখা।
লিখিত পরীক্ষা একটি ম্যারাথনের মতো। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য সময় বরাদ্দ করে রাখুন যেন কোনো প্রশ্ন উত্তরহীন না থাকে। কোনো প্রশ্নের উত্তর খালি রেখে আসবেন না। ধারণা করে লিখে আসতে পারেন তবে অবশ্যই আপনার ধারণা যেন একেবারে অপ্রাসঙ্গিক না হয়। প্রশ্ন বুঝে উত্তর করবেন, প্রশ্নে কী চেয়েছে সেটাতে ফোকাস করুন। অনেকে দেখা যায়, মূল লেখার চেয়ে "Beat around the bush" এই টাইপ কাজ করে আসেন।
৫. শেষ মুহূর্তের করণীয়ঃ
বারবার রিভিশন: আপনার সবল ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে বারবার রিভিশন দিন। বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞানের সূত্রগুলো ঝালিয়ে নিন।
মডেল টেস্ট: প্রস্তুতির মান যাচাই করতে নিয়মিত মডেল টেস্ট দিন। এটি আপনার আত্মবিশ্বাস ও লেখার গতি বাড়াতে সাহায্য করবে। তবে মডেল টেস্টে নাম্বার কম উঠলে হতাশ হওয়া যাবে না। কারণ মডেল টেস্টে কম নাম্বার উঠেছে এমন অনেকেই ক্যাডার হয়েছে। আপনাকে শুধু আপনার প্রস্তুতির ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং সেগুলো শুধরাতে হবে।
৬. শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতিঃ
সুস্থতা বজায় রাখা: দীর্ঘ সময় ধরে টানা পরীক্ষা চলে, তাই এই সময়ে পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং মানসিক স্থিরতা অত্যন্ত জরুরি। ব্রেনকে রেস্ট দিবেন মাঝে মাঝে। Effort এর থেকে Efficiency তে গুরুত্ব দিবেন বেশি।
শান্ত থাকা: পরীক্ষার হলে ঘাবড়ে না গিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে শুরু করা।কোনো প্রশ্ন নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকা যাবেনা। পরীক্ষার স্ট্র্যাটেজি বা প্ল্যানিং এর জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন সেটা বজায় রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব প্রশ্ন উত্তর করে পরীক্ষা শেষ করতে হবে।
***বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি আলাদাভাবে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে বিস্তারিত জানাবো পরবর্তীতে।
আরাফাত হোসেন মজুমদার
বিসিএস পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডার (৪৪ তম বিসিএস)
বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার (সুপারিশপ্রাপ্ত) (৪৫ তম বিসিএস)