12/11/2025
এক রূহানী আলোকপ্রভা
আলহামদুলিল্লাহ!
যিনি পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ পীর, হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশেবন্দী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর প্রিয় খলিফা ও মুরীদ — সেই মহান রূহানী ব্যক্তিত্ব, আমাদের প্রিয় শায়খ মোহাম্মদ (দা.বা.)।
তিনি নকশেবন্দিয়া সিলসিলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করেন, আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেন।
বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম, পীর ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিত্ব তার নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করেন, অনেকেই তার হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেছেন। এমনকি দেশের নামকরা অনেক সেলিব্রিটির হৃদয়ও তার রূহানী দৃষ্টিতে পরিবর্তিত হয়েছে।
আমি নিজেও— আলহামদুলিল্লাহ— তার পবিত্র হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেছি। দিন দিন তার সোহবতে আমার অন্তর নরম হচ্ছে, ইলম ও আমলের পাত্র পূর্ণ হচ্ছে, রূহ সতেজ হচ্ছে।
একদিন তার বয়ানে তিনি এমন একটি ঘটনা শুনালেন যা আমার অন্তরকে নাড়া দিয়ে গেল।
তিনি বললেন—
“এক সফরে আমি সিরিয়ায় ছিলাম। সেখানে বিভিন্ন স্থানে আলেম, তালিবুল ইলম, সাধারণ মানুষ— সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। আমি প্রত্যেককে এক প্রশ্ন করতাম:
‘এদেশে হানাফী বেশি, না শাফেয়ী?’
কেউ বলতেন— ‘শাফেয়ী’, আবার কেউ বলতেন— ‘হানাফী’।
কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, তারা কেউ নিজেদের মাজহাবকে বড় করে দেখেন না। বরং অপর মাজহাবের অনুসারীদের সম্মান করেন, শ্রদ্ধা করেন। তাদের চরিত্র, তাদের বিনয়, তাদের আখলাক দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম।
অদ্ভুত এক সৌন্দর্য— তারা নিজেদের মতকে নয়, অপরের মতকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন।”
এরপর শায়খ মোহাম্মদ (দা.বা.) একদিন সিরিয়ার একটি লাইব্রেরিতে গেলেন।
দেখলেন— সেখানে শুধু হানাফী মাযহাবের কিতাবাদি ছাপা হয়।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কি হানাফী?”
তারা উত্তর দিলেন, “না, আমরা তো শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাই।”
শায়খ অবাক হয়ে বললেন, “তাহলে হানাফী কিতাব কেন ছাপাচ্ছেন?”
তারা বিনম্র হেসে বললেন—
“আমাদের পূর্বপুরুষ আমাদের ওসিয়ত করে গেছেন, যেন আমাদের বংশে কেউ না কেউ হানাফী মাযহাবের খেদমত করে যায়। আমরা শাফেয়ী, তাই আমাদের দায়িত্ব— হানাফীদের জন্য কিছু করা। এভাবেই তো উম্মতের ঐক্য টিকে থাকে।”
সুবহানাল্লাহ!
কী বিশুদ্ধ মন!
কী হৃদয়স্পর্শী উদারতা!
যেখানে আমরা নিজেদের মতের বাইরে এক পা ফেলতেও সংকোচ করি, সেখানে তারা নিজেদের ভিন্ন মাজহাবের খেদমতে জীবন উৎসর্গ করছেন।
একবার ফকীহুল মিল্লাত হযরত মুফতি আবদুর রহমান (দা.বা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন,
“হযরত, বাংলাদেশে তো অনেকে নামাজে হাত উঠায় না। আবার কেউ কেউ উঠায়। এই নিয়ে বিতর্ক কেন? সালাফীদের বিরোধিতা করেন কেন?”
হযরত নরম স্বরে উত্তর দিলেন—
“আমরা তাদের বিরোধিতা করি, কারণ তারা বলে— যারা হাত না উঠায় তাদের নামাজ শুদ্ধ নয়।
অথচ শাফেয়ী মাযহাবে হাত উঠানো আছে, হানাফী মাযহাবে না উঠানোর দলীল আছে।
কিন্তু শাফেয়ী হানাফীর নামাজকে অশুদ্ধ বলেন না, হানাফীও শাফেয়ীর নামাজকে অশুদ্ধ বলেন না।
পক্ষান্তরে সালাফীরা শুধু নিজেদের মতকেই সঠিক বলে দাবি করে— এ কারণেই আমরা তাদের বিরোধিতা করি।”
আসলে আমাদের দেশে এক বড় রোগ ঢুকে গেছে—
যদি কেউ শাফেয়ী হয়, আমরা তাকে সন্দেহের চোখে দেখি;
যদি কেউ হানাফী হয়, তার প্রতি পক্ষপাত করি।
অথচ উভয়ই ইসলামের সুপ্রাচীন, সুপ্রতিষ্ঠিত মাজহাব।
সম্মান, সহনশীলতা, ভালোবাসা— এটাই প্রকৃত দ্বীনি রূহ।
আমরা ভুলে গেছি, “উম্মতের ঐক্য মতের মিল নয়, মননের বিশুদ্ধতায়।”
যদি কেউ আল্লাহর পথে, নবীর সুন্নাহর পথে থাকে— তবে সে আমাদের ভাই, সে আমাদের আপন।