05/10/2023
'শিক্ষক দিবসে করোনাকালীন ছুটে চলা এক শিক্ষকের গল্প'
মাস্টার নজরুল ইসলাম। ১৯৮৯ সালে ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে যাঁর শিক্ষক জীবন শুরু। অগণিত শিক্ষার্থীর অভিভাবক হয়ে সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষ শেষ আশ্রয়, মাথার উপর আকাশসম ছায়া হয়ে থাকা এই মানুষটি খ্যাতি নামযশ, পদ-পদবী'র উচ্চ পদস্থের লোভকে পাশ কাটিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনটা ৩১ বছরে অতিবাহিত করে গেছেন ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে। নিজের মেধা আর যোগ্যতায় তিঁনি চাইলে নামকরা অনেক নামি-দামি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হতে পারতেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম করা অফিসার হতে পারতেন, এসবকে তিঁনি তুঁড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে হয়েছেন অফিসার গড়ার কারিগর। এই অঞ্চলের যেসব গর্বিত সন্তানরা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে, নিজের এলাকাকে আলোকিত করছে, যাঁদের নিয়ে আমরা গর্ব করি সে-সব সু-সন্তানের জীবনে অদৃশ্যে আলো ছড়ানো, সাহস যোগানো, সব দুমড়েমুচড়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগানো মানুষটি নজরুল ইসলাম স্যার। যিঁনি শিক্ষকতাকে ভালোবেসে, শিক্ষার্থীদের ভালোবেসে এক প্রতিষ্ঠানেই কাটিয়ে দিয়েছেন যৌবনের স্বর্ণালী সময় জীবন সায়াহ্নের সুদীর্ঘ ৩১ বছর।
২০২০ সালে করোনার থাবায় যখন বিমূর্ষ পৃথিবী, স্বাভাবিক জনজীবন যখন হয়ে পড়েছে দূর্বিষহ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠান যেখানে বন্ধ, মানুষ মানুষ থেকে দূরে। যে সময় মা'কে ছেড়ে পালিয়ে গেছে সন্তান, বাবাকে ফেলে উধাও নিজ পুত্র, মানুষে মানুষে সৃষ্ট হয়েছে সংস্পর্শের নানা প্রটোকল, এক পাড়ার লোক কে অন্য পাড়ায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না ঠিক সে সময়ের কথা।
নজরুল স্যার আফজলীয়া মাঝের পাড়া থেকে ফিরছেন, ঘড়ির কাটা সাড়ে ৫ টা ছুঁই ছুঁই। স্বভাবতই মনে করেছি তিঁনি কোনো কাজ সেরে ফিরছেন। পরের দিন সন্ধ্যা, কয়েকজন মিলে রাস্তায় হাঁটছিলাম নজরুল স্যার চালিয়াতলী থেকে হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। তখনও মনে হলো কোনো কাজে গেছেন করোনার কারণে গাড়িতে নিরাপদ মনে না করে হেঁটে যাচ্ছেন। তারপরের দিন আসরের নামাজের পর পর স্যার উত্তর নলবিলা বড়ুয়া বাজারের মাঝপথ ধরে বড়ুয়া পাড়ার দিকে হেঁটে যাচ্ছেন, আমিও যাচ্ছিলাম কোনো এক কাজে তবে স্যারের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। মাঝপথে তিঁনি এক বাড়ির দিকে হেঁটে গেলেন আমি চলে গেলাম আমার গন্তব্যে। ফেরার সময় দেখি স্যার অন্য জায়গায়, কয়েকজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলছেন। দু'জন ছেলে তিন কিংবা চারজন মেয়ের সাথে। আমি চলে আসতেই মাঝপথে একজন আমাকে দাঁড় করালেন একটি বিষয়ে আলাপ করতে। তার সাথে আলাপ চলার প্রাক্কালে কিছুক্ষণ আগে স্যারের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলা এক ছেলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, আমি তাঁকে ডাকলাম। কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলাম নজরুল স্যার তোমাদের কি বলতেছে...? প্রতিত্ত্যুরে সে বললো, " স্কুলবন্ধ কিন্তু আমাদের পড়াশোনা বন্ধ কিনা সেটা স্যার চেক দিতে আসছেন" আমি প্রথমত বোঝে উঠতে পারিনি, আবার জিজ্ঞেস করলাম চেক দিতে আসছে মানে ঠিক বুঝতে পারিনি। ছেলেটা আরেকটু সহজ ভাবে বললো, "করোনার কারণে স্কুল বন্ধ, প্রাইভেট বন্ধ, কিন্তু আমরা বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করছি কিনা খোঁজ নিতে আসছে নজরুল স্যার, সবার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেয়" কিছুটা কৌতূহলী হয়ে বললাম, প্রত্যেকের বাড়িতে বাড়িতে খোঁজ নেয়? ছেলেটি জবাব স্বরূপ হ্যাঁ বোধক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। আমি বললাম, এটা কতোদিন থেকে...? ছেলেটি জবাব দিলো, "করোনার কারণে ১৭ মার্চ স্কুল বন্ধ দেয় তার পরের সপ্তাহ থেকে স্যার কখনো একদিন পর, দুদিন পর, আবার অনেক সময় প্রত্যেকদিন আমাদের সকলের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বাবা মায়েদের কাছে জিজ্ঞেস করে নিয়মিত পড়াশোনা করছি কিনা" আমি আর ছেলেটার সাথে কথা বাড়ালাম না।
নজরুল স্যার কে প্রায় নিয়মিত কখনো মাঝেরপাড়ার দিকে, কখনো চালিয়াতলীর দিকে, কখনো বড়ুয়া পাড়ার দিকে যেতে কিংবা আসতে দেখা যায়। বয়সের পড়ন্ত বেলায়, ক্লান্ত শরীরে নিরব নিশ্চুপ ছুটে চলা এই মানুষটিকে থামাতে পারেনি মহামারী। সবাই যখন ঘরবন্দী, তিঁনি হেঁটে হেঁটে সেসব বন্দী ঘরে টোকা মারছেন, তাঁর শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনা করছে কিনা সে তদারকিতে। এ যেনো মহামারীতেও বিদ্যার হারিকেন নিয়ে ছুটে চলা রানার। এমন সমাদরে শিক্ষার্থীদের আগলে রেখে'ই তিঁনি হয়ে উঠেছেন আস্থার বটবৃক্ষ। কতোটুকু দায়িত্বশীল, শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্নশীল, ছাপোষা সন্তানকে মানুষ বানাতে কতোটুকু কর্তব্যবোধ থাকলে একটি মানুষ এই বৃদ্ধ বয়সেও এভাবে ছুটে চলতে পারে আমার জানা নেই। শিক্ষকতা ও শিক্ষার্থীদের কতোটা ভালোবাসলে মানুষ ক্লান্তিহীন এভাবে ছুটে চলতে পারে আমার জানা নেই। মাস যায় বছরও পেরিয়ে গেছে স্কুল খোলেনা, আর নজরুল স্যারও থামলেন না এভাবে ছুটেই চলেছেন। শিক্ষার্থীদের নানা জটিলতার সমাধানের একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে থেকেছেন আজীবন, লুকোচুরি করে কতো শিক্ষার্থীদের দোষত্রুটি আড়াল করেছেন তার হিসেবও বোধহয় জানা নেই কারো। এভাবে শিক্ষার্থীদের উপর ছায়া হয়ে থাকা মানুষটি হজ্ব করেছেন শিক্ষার্থীদের পড়ানো প্রাইভেটের টাকায়। তিঁনি মনে করতেন এই উপার্জিত অর্থের চেয়ে পবিত্র অর্থ আর নেই, সে অর্থের টাকায় তিঁনি হজ্ব করেছিলেন।
অদ্যবধি স্কুল খুলেছে, প্রাণ ফিরেছে স্কুলে। কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে শিক্ষাঙ্গন, আর নিরবে নিভৃতে মহামারীকালে শিক্ষার্থীদের ধারে ধারে গিয়ে আদর সমাদরে খোঁজ নেওয়া নজরুল স্যারও নিস্তার পেলেন। নিরব নিশ্চুপে কারো ভবিষ্যৎ কে আলোকিত করার জন্য চুপিসারে ঘাম ছড়ানো এমন শিক্ষক আছে বলেই কারো কারো জীবন আলোকিত হয়ে উঠে, আলো ছড়ায় সর্বত্রে।
বলতে ইচ্ছে করছে...
নিজ পেশাকে যতনে,
শ্রদ্ধাভরে আগলে রাখে ক'জনে।
এমন শিক্ষক আছে যতো,
তব শ্রদ্ধা প্রতি জনে জনে।
"যেখানে যেথায় স্বস্তি ফিরে পায় প্রাণ,
সেখানে থাকুক পদচারণা, থাকুক স্মৃতি অম্লান।
শ্রদ্ধা, প্রিয় নজরুল স্যার শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার এই সমাদর নিঃশব্দে আমরণ থাকুক।
•লেখা- কাব্য সৌরভ
ইউনুছখালী নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়
এস.এস.সি ব্যাচ-২০১১
লেখার সময়কালঃ ৫ অক্টোবর ২০২১