12/03/2015
ভূমিকা
মোঃ মুখলেসুর রহমান মাস্টার
আরম্ভের আগেও আরম্ভ আছে। রামকৃষ্ণপুর কলেজের পথ চলার সেই আরম্ভ কে কি বলব? ভূমিকা? ইতি-হ-আস? “ইতিপূর্বে যাহা ঘটিয়েছে” তা হচ্ছে ইতিহাস। আমি ঐতিহাসিত নই। দিন-ঘন্টা ধরে নব কুশীলবের চিত্রঙ্কন সম্ভব নয়। তাই স্মৃতি আচঁড়ে আমার এ ভূমিকা।
পীরজী হুজুর; বড় কাটারা।বাংলাদেশের অনেকেই মাওলানা ওহাবকে এ নামে চেনেন।কিন্তু ওনার বাড়ি যে রামকৃষ্ণপুর কলেজের পাশেই এটা বোঁধ হয় অনেকের জানা নেই। এ পরিবারের সদস্যগণ শুধু ইসলামী শিক্ষায়ই সুপন্ডিত ছিলেন না। তাঁদের অনেকেই সাধারন শিক্ষায়ও সবোর্চ্চ ডিগ্রীধারী। শিক্ষা বিস্তারেও এঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রামকৃষ্ণপুর গ্রামের চার জমিদার বাড়ির বড় শরীক কানাই সাহা পরিবারের মুকুটহীন জমিদার কর্মবীর বাবু যোগেন্দ্রলাল রায় সর্বধর্ম মিশনের সাধক পুরুষ বাবু লবচন্দ্র পালের প্রেরনায় ১৯২৮ সনে “ রামকৃষ্ণপুর কেবল কৃষ্ণ রাজ কৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে পীরজী হুজুরের বড় ভাই ইসহাক মুন্সি, অন্যান্য শিক্ষানুরাগী-হাজী বারিক ভূঞা,হরলাল রায়, শ্রীনগর নিবাসী শীর মিঞা চৌধুরী প্রমুখ সক্রিয় সহযোগিতা করেন। রামকৃষ্ণপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার এটা ছিল সিঁড়ির প্রথম ধাপ।দ্বিতীয় ধাপটি হল “কামাল স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়”। ১৯৭২ সনে তৎকালীন গণপরিষদের সদস্য হাজী হাসেমের নেতৃত্বে আমরা এটি প্রতিষ্ঠিত করি। আমাদের মধ্যে মরহুম দবির উদ্দীন আহমেদ, ইন্দুভূষন সাহা, খলিলুর রহমান(প্রঃ শিক্ষক), সৈয়দ মোঃ সফিউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন। ১৯৭৩ সনে মরহুম ছলিমউদ্দিন সওদাগর এবং আলহাজ্ব মোঃ আবদুল মোমেন কর্তৃক “ দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠিত হলে এতদঞ্চলে কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। অবিভক্ত চান্দেরচর ইউনিয়নের এককালীন প্রেসিডেন্ট বাবু যোগেন্দ্রলাল রায় তখনো জীবিত। বালিকা বিদ্যালয়ের মাটিতে প্রণাম করে উচ্ছসিত কন্ঠে তিনি বলেছিলেন “তোমাদের যদি আমি যৌবনে পেতাম, তাহলে রামকৃষ্ণপুর একটা কলেজ পেত। তোমরা একটা কলেজ করলে মরলে আমার হাড় পঁচবে।” হাজী হাসেমকেও তিনি সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমরা এ মানুষটির আশা তাঁর জীবদ্দশায় পূরণ করতে পারিনি।আমাদের (দবিরউদ্দিন, হবি,আমি) প্রতি অনেকেরই বিশ্বাস ছিল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিন দিন বাড়তে লাগল। ১৯৭৪ সনে এমদাদুল হক মাইঝচরে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নিলে হাজী হাসেম দশ হাজার টাকা প্রদানের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু কলেজের নাম করন এবং নেতৃত্ব নিজের নাম রাখার প্রস্তাবে অনমনীয় থাকায় এমদাদুল হকের উদ্যোগ আতুঁর ঘরেই মারা গেল। তারপর কেটে গেল অনেক বছর। কিন্তু, আমাদের মন থেকে কলেজ মুছলো না।
১৯৮৩ সনের চান্দেরচর ইউনিয়নের কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী ছিল মোশারফ হোসেন (হবি) মোল্লা এবং আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল কলেজ প্রতিষ্ঠা। নির্বাচনে ফেল করলেও আমরা সে ওয়াদা ভুলিনি। বিভিন্ন সময় সে প্রচেষ্ঠা চলতে লাগল।
১৯৮৬ সনের জুনে ডাঃ ভানুমোহন ভট্রাচার্য্যের বেঠক ঘরে রামকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক বাবু ননী গোপাল সাহা,হারাধন চন্দ্র রায়,এনায়েতুল্লাহ্ ফারুকী,সৈয়দ মোঃ জহিরুল হক,মোকবুল হোসেন(মানিক) ভূঞা, হবি মোল্লা, রেজাউল করিম এবং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কলেজ প্রতিষ্ঠাকল্পে একটা সাধারন সভা করব। প্রস্তুতি কমিটির জন্য পরবর্তী সপ্তাহে সভা করার জন্য সৈয়দ মোঃ জহিরুল হক আমাকে একশত টাকা দিলেন। বস্তুত কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য এটাই প্রথম দান।
পরবর্তী সভা হল আমাদের মতিহার লঞ্চে। ঈদুল ফিতরের দিন এ সভায় অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। বালিকা বিদ্যালয়ের অন্যতম সংগঠক রামচন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব খলিলুর রহমান ১৯৮৬ সনে কলেজ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব বলে পরবর্তীতে মহিলা কলেজের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। তবে সৈয়দ সাহেব, শফিউদ্দিন আহমেদ বিশেষ করে হবি মোল্লার বক্তব্য ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। হবি মোল্লার জ্বালময়ী ভাষণে সবাই উদ্বুদ্ধ হল। তাই হবি মোল্লাকে রামকৃষ্ণাপুর কলেজের মূল প্রস্তাবক বলা যেতে পারে।
আমি, হবি এবং শফিউদ্দিন প্রায় দুমাস বিভিন্ন নেতৃবর্গের সাথে যোগাযোগ করি। অনেকে উৎসাহিত করলেন আবার অনেকে নিরুৎসাহিত। এভাবে আশা নিরাশার দোলনায় দোলে ২০-০৮-১৯৮৬, বুধবার রামকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রঙ্গনে বিকেল ৩টায় হাজী আঃ মোমেনের সভাপতিত্বে কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম পূর্ণাঙ্গ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ননী বাবুর প্রচেষ্ঠায় জয়নাল আবেদীন(জাহাঙ্গীর) তার আব্বা হাজী কাজেম আলী এর নামে ২৫,০০০(পচিঁশ হাজার) টাকা দানের ঘোষণা দিল। আমরা কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য খুঁজে পেলাম। এটিই প্রথম সভার সার্থকতা। সভায় অনেকে বক্তৃতা করলেও সৈয়দ মোঃ জহিরুল হকের বক্তৃতা ছিল উজ্জীবিত। দৈনিক এক কাপ চা-এর খরচ বাঁচিয়ে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে শিক্ষক কর্মচারীর বেতন সংগ্রহে তার দেওয়া প্রস্তাব হয়ে গেল একটা যুগান্তকারী শ্লোগান। ২০-০৮-১৯৮৬ তারিখের সভা করে ক্লান্ত সাথীরা উজ্জীবিত হলাম ২১-০৮-১৯৮৬ সন্ধ্যায় হাজী হাসেমকে আমাদের মাঝে পেয়ে। তিনি কোম্পানিগঞ্জ বদিউল আলম কলেজের অধ্যক্ষ মনিরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে এলেন। সেদিন সারা রাত আমার বাড়িতে কলেজ প্রতিষ্ঠার খুটিনাটি বিষয় আলোচিত হল। প্রকৃত পক্ষে সেদিন এই দুই শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব-সৈয়দ মোঃ জহিরুল হক , হবি, শফিউদ্দিন, সেলিম রেজা ও আমাকে নিয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করে রামকৃষ্ণপুরের মাটিতে কলেজের বীজ বপন করলেন। হাজী হাসেমকে আহবায়ক, আমাকে নির্বাহী দায়িত্ব ও শফিউদ্দিন এবং সেলিম রেজাকে প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হল। বিপুল উৎসাহে আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে অর্থ সংগ্রহ,প্রচার ও অন্যান্য কাজ করতে লাগলাম। ১৭-০৯-১৯৮৬ তারিখে কুমিল্লা বোর্ডে রামকৃষ্ণপুর কলেজের অনুমোদন ফি ১৫০০/- টাকা চালান দেয়া হয়। মরহুম বড় হুজুর মনিরুল ইসলামকে অধ্যক্ষ হিসেবে দেখান হল।
এরপর এল সেই ঐতিহাসিক লগ্ন।১৯-০৯-১৯৮৬ তারিখে হাজী সাহেবের ঢাকাস্থ ৬/৪, সেগুন বাগিচার বাসায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য অধ্যাপক ডঃ আমিনুল ইসলমের নেতৃত্বে রামকৃষ্ণপুর কলেজের প্রভাষক বাছাই করা হল। এ বিষয়ে শফিউদ্দিন,আলমগীর,হাজী সাহেবের বড় ছেলে শামীম ও ছোট মেয়ে মনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। তাদের সেদিনকার সহায়তার কথা ভূলবার নয়। মোঃ মনিরুল ইসলামকে অধ্যক্ষ এবং সেলিম রেজা, আঃ জব্বর, শাহ মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ, আবু নাঈম ভূঞাকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হল। রামকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ননীবাবু কলেজের জন্য প্রথম ছাত্র ভর্তি করলেন। আমার বড় মেয়ে মাহবুবা রহমান হচ্ছে সেই ছাত্রী। তারপর বহু প্রতিক্ষীত ২৫-০৯-১৯৮৬ তারিখে রামকৃষ্ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনে মরহুম বড় হুজুর কলেজে প্রথম পাঠ দান করলেন। শুরু হল রামকৃষ্ণপুর কলেজের পথ চলা।
সূচনাঃ প্রথমিক পর্যায়ে আমাদের কিছুই ছিল না। না ঘর-না শিক্ষাদানের উপকরণ, না প্রয়োজন শিক্ষক, শুধু ছিল প্রচন্ড মনোবল। তবে রামকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় কতৃপক্ষ যদি সেদিন তাদের স্বল্পতাসত্বেও আমাদেরকে ঘর, বেঞ্চ, প্রয়োজনীয় উপকরন দিয়ে সাহায্য না করতেন তাহলে আমাদের পক্ষে ১৯৮৬ সন থেকে কলেজের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হত না। এ আমরা তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। ২৫-০৯-১৯৮৬ তারিখের আগে থেকেই অবশ্য আমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রঙ্গণে কলেজের ঘর তোলা শুরু করেছিলাম। এ জন্য আমরা প্রথমেই বাঁধার সম্মুখীন হই তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আঃ মতিন এর কাছ থেকে। তিনি ছিলেন পদাধিকার বলে উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি। তিনি কিছুতেই বিদ্যালয় প্রঙ্গণে কলেজের ঘর তোলার অনুমতি দেবেন না। সেদিন রামকৃষ্ণপুর ভূঞা বাড়ির মানুষজন, বিশেষ করে, হাজী হাফেজ শাহআলম ভূঞা, ছিদ্দিকুর রহমান ভূঞা, এমদাদুল হক ভূঞা প্রমুখ যদি উদ্যোগী ভূমিকা না নিতেন তাহলে হয়তো আমরা ঘর তোলার অনুমতি পেতাম না। যাহোক, তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় মতিন সাহেব ঘর তোলার অনুমতি দিলেন। উপরন্তু উপজেলা পরিষদের পক্ষথেকে একটি কাঠের আলমারী এবং পরবর্তীতে নিজ তহবিল থেকে দশ হাজার টাকা দান করলেন। হাজী হাসেমের প্রচেষ্ঠায় ২৯-০৯-১৯৮৬ তারিখে তৎকালিন জেলা প্রশাসক আশিকুর রহমান কলেজ পরিদর্শনে এলেন। ডাইরেক্টর অব র্স্পোটস আজিজুল হক এলেন ১৪-০৯-১৯৮৭ তারিখে। তাঁর বদান্যতায় সরকারীভাবে কলেজ কিছু ক্রিয়া সামগ্রী পেল। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটল ০২-০৯-১৯৮৭ তারিখে। ডাঃ সিদ্দিকুর রহমানের ওষুধের দোকানে মরহুম বড় হুজুরের ভাষায়-“মুখলেস, তোমার কলেজ আজ সম্পূর্ণ হল। ইনশা-আল্লাহ্ এ কলেজ টিকবেই।” ঘটনাটি হল আঃওয়াহেদ সওদাগরের প্রচেষ্টায় সেদিন কলেজের জন্য প্রথম জমি সংগৃহীত হয়। বর্তমান কলেজ ভবনের কিছু অংশ ও সামনের বাগানটি হচ্ছে সেই জায়গা। আল্লাহর অশেষ রহমতে ০৬-১১-১৯৮৭ তারিখে রামকৃষ্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলেজ নিজস্ব জমিতে স্থানান্তরিত হল। এরপর আশা নিরাশার দোলায় চেপে ১৯৮৮ সনে আমাদের প্রথম পরীক্ষার্থীগণ হোমনা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিল। এ বছর কুমিল্লা বোর্ডে পাশের হার ছিল ৫১.৭০; হোমনা কেন্দ্রের ৫৫% এবং আমাদের ছিল ৬৫.৯৮%। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ আমাদের চলার এ দীর্ঘ পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। উৎকন্ঠায় কেটে যেত সময় এই বুঝি শেষ হয়ে গেল যাবতীয় প্রচেষ্টা। যাদের সহায়তায়,প্রেরণায় ও প্ররিশ্রমে আজকে আমাদের এই অবস্থান তাঁদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
এলাকাবাসীঃ প্রাথমিক পর্যায়ে কলেজ ছিল শুধু নামেমাত্র। অর্থাভাব ও সময়ের স্বল্পতার দরুণ আমাদের তখন কিছুই ছিল না। প্রথমাবস্থায় আমাদেরকে বিশ্বাস করে যারা ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করিয়েছেন; নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রামকৃষ্ণপুর বাজার এবং লঞ্চ ঘাটের ডাক কলেজের নামে পাইয়ে দিয়েছেন; চা খরচ বাঁচিয়ে প্রতি সপ্তাহে ৭ টাকা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তাঁদের ঋণ
শোধবার নয়। তাঁরা কলেজে বিন্দু বিন্দু রক্তের ফোঁটা যোগান দিয়েছেন। মরহুম শাকির হোসেন মোল্লা ও ইদ্রীস মোল্লা এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিশ্রম ও সহযোগিতা করেছেন আমাদেরকে। আজ তার কথা খুব বেশি করে মনে পড়ছে। আল্লাহ্ তাদের আতœাকে শান্তি দান করুন। কলেজের ঘর তোলার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে বাঁশ সংগ্রহে ছাত্ররা, বিশেষ করে আখন্দপাড়া নিবাসী খলিল আহমেদ খন্দকারের প্রচেষ্টা ছিল উৎসাহব্যঞ্জক।
শিক্ষকবৃন্দঃ মরহুম বড় হুজুর মনিরুল ইসলাম ছিলেন এ কলেজের প্রাণ। তিনি অধ্যক্ষের দায়িত¦ পালন করলেও ১৯৯১ সন পর্য্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করেছেন। কি ঝড়, কি বৃষ্টি কোন কিছুই তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। চান্দেরচর থেকে রামকৃষ্ণপুর দৈনিক ৭ মাইল তিনি হেঁটেছেন, আল্লাহর এই নেক্ বান্দার ঋণ আমরা শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে শোধ করার চেষ্টা করে যাব আজীবন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হাজী কাজেম আলী ও ননীবাবু ছাত্র-ছাত্রীদের ইংরেজী প্রভাষকের অভাব বুঝতে দেননি। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সেলিম রেজা এবং ওয়ালিউল ইসলাম, আঃ জব্বার, আবু নঈম ভূঞা, রৌশন আহমদ, শফিকুল ইসলাম, গৌরাঙ্গ চন্দ্র সরকার, নুরুল হক প্রমুখ প্রভাষকবৃন্দ নিঃস্বার্থভাবে ছাত্র - ছাত্রীদের মুখের দিকে চেয়ে যে পরিশ্রম করেছেন তার মূল্য কি কলেজ কোনদিন দিতে পারবে? সেলিম রেজার হাতে লেখা সাইনবোর্ডটি আজো কলেজের প্রতি তার আন্তরিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের বর্তমান সুযোগ্য অধ্যক্ষ শফিউল আলম দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত নঈম সাহেব অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে কলেজকে যাবতীয় ঝড় ও ঝঞ্জার হাত থেকে আগলে রেখেছেন। আমার পরম সৌভাগ্য এ সমস্ত মহৎ প্রাণ বিজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলী আমার পর্ণ কুটিরে রেখে কিছুদিন রেখে সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।
আলহাজ্ব আবুল হাসেমঃ কাশিপুর হাসমিয়া হাই স্কুল এবং রামকৃষ্ণপুর কামাল স্মৃতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। হাজী হাসেমের বাড়ি মুরাদনগর। রামকৃষ্ণপুর কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনিই ছিলেন আমাদের মূল প্রেরণা। অর্থ সংগ্রহ এবং প্রতিষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে বিভিন্নভাবে এই বৃদ্ধ বয়সেও প্রচুর সময় তিনি দিয়েছেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য অস্থানীয় হয়েও নানা রকম গঞ্জনা ও উপেক্ষ সহ্য করেছেন। সমস্ত এলাকার মানুষ দানবীর হিসেবে হাজী হাসেমকে চিরদিন তাদের হৃদয়ের মণিকোঠরে স্থান দেবে।
সিরাজুল ইসলামঃ আসাদপুর নিবাসী সিরাজুল ইসলাম যদি কলেজের পৃষ্ঠপোষক না হতেন তাহলে আমরা হয়তো কলেজই করতে পারতাম না। যখনই অর্থের প্রয়োজন হয়েছে তাঁর কাছে হাত পেতে বিমুখ হতে হয়নি। হাজী হাসেম কলেজের নামকরণ করতে চেয়েছেন সিরাজুল ইসলামের নামে। বাঁধ সেধেছেন এই প্রচার বিমুখ নিঃস্বার্থ এবং একনিষ্ঠ সমাজসেবক মানুষটি নিজেই। তাঁর স্ত্রী আমাকে এবং হবি মোল্লাকে বিভিন্ন সময় যে আতিথেয়তা করেছেন আমরা চিরকৃতজ্ঞ।
আলহাজ্ব আঃ মোমেন ঃ দৌলতপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং হোমনা কলেজের সত্যিকারের প্রতিষ্ঠাতা জনাব মোমেন সাহেব রামকৃষ্ণপুর প্রতিষ্ঠার প্রথম সভার সভাপতি। তাঁর মাধ্যমেই আমরা পরিচিত হই সিরাজুল ইসলামের সাথে। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় রামকৃষ্ণপুর কলেজে অনেকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছেন। আমরা কলেজের বিভিন্ন কাজে তাঁর বাসায় থেকে তাঁর স্ত্রীকে জ্বালতন করেছি। মতৃসমা এ মহীয়সী নারী আমাদেরকে তাঁর ¯েœহ থেকে কোনদিন বঞ্চিত করেননি।
এম,কে,আনোয়ার ঃ “ তুমি আমাদের পরশমনি, তোমার হাতের ছোঁয়ায় হোমনার ধূলিকণা পরিণত হয়েছে সোনায়।” পঙক্তির জলজ্যান্ত প্রমাণ রামকৃষ্ণপুর কলেজ। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যে কলেজটি রক্তশূন্য অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে মরছিল, তাকে তিনিই সঞ্জীবনী সুধা পান করিয়ে পুনঃজন্ম দিয়েছেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় ০১-০৭-১৯৯০ তারিখে কলেজটি সরকারি শিক্ষক-কর্মচারী বেতন ভাতার সরকারি অংশের মঞ্জুরী পায়। শুধু তাই নয়, প্রথম সরকারী দান দশ হাজার এবং পরবর্তীতে আড়াই লক্ষ টাকা অনুদান না পেলে তখন ঘরের অভাবে শিক্ষাদানই সম্ভব হত না। এক কথায় কলেজের সার্বিক উন্নয়নে তার ভূমিকা অবিস্বরণীয়। এই মহান ব্যক্তির সাথে ১৯৮৮ সনের বন্যায় যদি রামকৃষ্ণপুর পরিচিত না হত তা হলে কলেজের স্বপ্ন হয়ত স্বপ্নই থেকে যেত। আজকের এই আধুনিক কলেজের সত্যিকার রূপকার হচ্ছেন এম,কে,আনোয়ার।
এই দীর্ঘ সময়ে অনেকের কথাই মনে পড়ে। মরহুম দবিরউদ্দিন আহম্মদের স্বপ্ন ছিল কলেজ প্রতিষ্ঠার, মরহুম সিরাজুল করীম কি পরিশ্রই না করেছেন। আমার বন্ধুবর অনীল চন্দ্র সাহা, হারাধন চন্দ্র রায় ছিলেন নিত্যসঙ্গী। শ্রদ্ধাভাজন আঃ কুদ্দুস সরকার, আঃ ওয়াহেদ সওদাগর, আঃ মজিদ সওদাগর, ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন আমাদের প্রেরণা ও সহায়ক শক্তি। তাদের উৎসাহ ও সহযোগিতা না পেলে আমি কোন কাজই করতে পারতাম না। কলেজের বৈজ্ঞানিক যন্দ্রপাতি রাখব আলমারী কেনার টাকা নেই। ওয়াহেদ সাহেব দোকান থেকে বড় একটা আলমারী দিয়ে সাহায্য করেছেন, কোন পয়সা নিলেন না। কলেজের জন্য বাজার ডাকবো,টাকা পাই কই? কুদ্দুস সরকার টাকা ধারদিয়ে সাহায্য করেছেন। একবার ঈদের আগে টাকা নেই কি করি? পরম ¯েœহাস্পদ শাফায়াত উল্লাহ একদল ছাত্র নিয়ে রোজার মধ্যে সারাটা দিন রামচন্দ্রপুর বাজার থেকে প্রায় সাত হাজার টাকা সাহায্য সংগ্রহ করে আনল। আমার একান্ত অনুগত ছাত্র শফিউদ্দিন, এমদাদ,মোস্তফা-এরা ছিল আমার নিত্যসঙ্গী। আর রামনগর নিবাসী আঃ মতিন আমাদের বিশ্বাস করে কলেজের জন্য প্রয়োজনীয় জমি দিয়ে যে সাহায্য করেছেন তার তুলনা হয়না। আমরা আজ পর্যন্ত সে ঋণ শোধ করতে পারিনি। আরেক জনের কাছেও আমরা আজ পর্যন্ত ঋণী। তিনি হচ্ছেন বাবু অরুন কুমার রায়। কলেজের ঘর তুলতে পারছিনা। ননীবাবু তার এই ছাত্রটির কাছ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা ঋণ সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
এভাবে গড়ে উঠেছে এলাকাবাসীর প্রাণের দাবী রামকৃষ্ণপুর কলেজ। সবাই সাধ্যাতীত পরিশ্রম করেছেন, অনেকের কথা হয়ত আমার মনে নেই, তাই তাদের কথা উল্লেখ না করে ঋণী হয়ে রইলাম। আমার পরম সৌভাগ্য আমার বেকার জীবনের অনেক গুলো বছর কলেজ এবং বিজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলীর সাহচর্য্যে সমৃদ্ধ হওয়ার প্রয়াস পেয়েছি। আমার পরিবারবর্গ বিশেষ করে আমার সহধর্মিনী লুৎফা রহমান আমাকে এ বিষয়ে সাহায্য করতে কার্পণ্য করেননি। আজ কলেজটিকে দেখলে মনে হয় রাতের চেয়ে স্বপ্ন বড়। নতুন প্রজন্ম কলেজটির শ্রী ও মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে আমাদের স্বপ্নকে বাস্তব করবে, এ আশা রেখে আমার ভূমিকা শেষ করছি।