01/05/2018
১ লা মে শ্রমিক দিবস
ইসলামের শিক্ষা
[১]
আধুনিক সভ্য দুনিয়ার রাজপথ যখন শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল এবং তারই রক্তিম স্মৃতিচারণে ১লা মে শ্রমিক দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি অর্জন করল; তার দেড় হাজার বছর পূর্বেই ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা ও তার অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট মূলনীতি ঘোষণা করেছে। শুধু বর্ণনা দান ও ঘোষণার মধ্যেই এটা সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মহানবী (সা.), খুলাফায়ে রাশিদীন এবং অন্যান্য ইসলামি শাসকবর্গ তাদের শাসনামলে ইনসাফপূর্ণ ইসলামি শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করে আজ তাবৎ পৃথিবীর জন্য একটি নমুনা ও আদর্শ স্থাপন করে গেছেন; যার নজির ইতিহাসে বিরল। মদীনা থেকে সুদূর বায়তুল মাকদিস যাত্রার পথে দীর্ঘ ভ্রমণের প্রাক্কালে ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) যেভাবে পালাবদল করে তার ভৃত্যের সাথে সওয়ারিতে উঠানামার ব্যাপারটি সমানভাবে শেয়ার করে নিয়েছিলেন তার উদাহরণ মানব-ইতিহাসের পক্ষে উপস্থাপন করা কি সম্ভব? তাই তো স্যার চার্লস এ্যডওয়ার্ড আর্চিবেল্ড স্বীকার করেন যে, হায় মানুষ যদি জানতো যে ইসলামই তো একমাত্র ধর্ম যেটি মানুষের সকল সামাজিক সমস্যার ন্যায়সংগত ও সঠিক সমাধান পেশ করে এবং এ ধর্মে প্রতাপশালী ক্ষমতাবান শ্রেণি থেকে শুরু করে অনাথ ও অসহায় লোকদেরও অধিকার সংরক্ষিত আছে।
শ্রম একটি অতি-মর্যাদাপূর্ণ বিষয়, এটি কোনো সৌজন্যমূলক কথা নয়, বরং ইসলামের একটি সুস্পষ্ট মতবাদ। হুযুর (সা.) ইরশাদ করেন,
‘তোমাদের কেউ পিঠে কাঠ বহন করে তা বিক্রি করা অধিক উত্তম, অন্যের কাছে ভিক্ষা চাওয়া থেকে।’
তিনি আরও বলেন যে,
‘নিজের উপার্জনের মাধ্যমে যে অন্ন গ্রহণ করেছে তার চেয়ে উত্তম খাবার কেউ খায়নি এবং আল¬াহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের মাধ্যমে কাজ করেই খেতেন।’
তিনি আরও ইরশাদ করেন, হযরত যাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। আর পবিত্র কুরআনে হযরত মুসা (আ.) কর্তৃক হযরত শুয়াইব (আ.)-এর নিকট দীর্ঘ বছর শ্রম বিনিয়োগের কথা বিবৃত হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থ-ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণি চরমভাবে নিগৃহিত। খ্যাতিমান ইসলামি অর্থনীতিবিদ আল¬ামা হিফযুর রহমান (রহ.) বলেন, শ্রমিকদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফাঁদে ফেলার প্রথম গ্রন্থিটি হচ্ছে কম মজুরি..., দ্বিতীয় গ্রন্থি হচ্ছে নূন্যতম মজুরি দ্বারা সর্বাধিক কাজ আদায় করা... তৃতীয় গ্রন্থি হচ্ছে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট না করা... চতুর্থ গ্রন্থি হচ্ছে শ্রমের মজুরির পরিমাণ ঠিকই নির্ধারণ করা কিন্তু দেওয়ার সময় মনগড়া প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ..., পঞ্চম গ্রন্থি হচ্ছে ছলে-বলে-কৌশলে শ্রমিকের পাওনা আত্মসাৎ করা।
এর বিপরীত ক্ষেত্রে ইসলাম যে সাম্যের নীতি প্রবর্তন করেছে তা মহানবী (সা.)-এর হাদীসে এভাবে হয়েছে,
‘তারা তোমাদের ভাই, আল¬াহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। আল¬াহ কারো ভাইকে তার অধীনস্থ করলে সে যা খাবে তাকে তা থেকে খাওয়াবে এবং সে যা পরিধান করবে তাকে তা পরিধান করতে দেবে। আর যে কাজ তার জন্য কষ্টকর ও সাধ্যাতীত তা করার জন্য তাকে বাধ্য করবে না। আর সে কাজ যদি তাকে করতে হয় তবে সে তাকে সাহায্য করবে।’
[২]
মূলত শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার পশ্চাতে যেসব কারণসমূহ প্রচ্ছন্নভাবে কার্যকর তা হল:
১.
উপার্জনের অসৎ উপায়গুলোকে সামাজিকভাবে উৎখাতের পথ সুগম করা। যেমনÑ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দুর্নীতি, ঘুষ, সুদ, জুয়া, জবরদখল, বাণিজ্যিক প্রতারণা প্রভৃতি। পৃথিবীর সনাতন ও আধুনিক ইতিহাসেও সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অনাচারের অন্যতম কারণটি ছিল অর্থনৈতিক। মানুষ তার অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে যেকোনো অন্যায় পথ বেছে নিতে দ্বিধাবোধ করতো না। ইসলাম শ্রমকে মর্যাদাপূর্ণ আয়ের উৎস আখ্যা দেওয়ায় নৈতিকতা বিবর্জিত উপার্জনের মাধ্যমগুলো রুদ্ধ হলো। যা সমাজের শৃঙ্খলা বিধানে বড় ধরনের সহায়ক হয়েছে।
২.
ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি নিরুৎসাহিত করা। কেননা এটি সুন্দর সমাজের জন্য কালিমা-স্বরূপ মানবীয় মূল্যবোধের পরিপন্থীও বটে। একজন সাহাবী ভিক্ষার জন্য মহানবী (সা.)-এর দরবারে আসলে তাঁকে তাঁর স্বীয় কম্বল ও পানির বাটি যা তার একমাত্র সম্বল ছিল সেগুলো মহানবী (সা.) নিজেই ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করিয়ে দেন এবং প্রাপ্য অর্থের অর্ধেক দিয়ে পরিবারের সেদিনের আহারের ব্যবস্থা এবং বাকি অর্ধেক দ্বারা কুড়াল কেনার জন্য বলেন। পরে সে কুড়ালে নবী (সা.) নিজেই হাতল লাগিয়ে জঙ্গলে কাঠ কেটে তা প্রতিদিন বাজারে বিক্রি করার জন্য নির্দেশ করে তাঁকে শ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে উৎসাহিত করেছেন। অতঃপর কয়েকদিন পর উক্ত ব্যক্তি স্বীয় শ্রম দ্বারা উপার্জিত ১০ দিরহাম নিয়ে মহানবী (সা.)-এর খেদমতে আসলে হুযুর ইরশাদ করেন,
‘অপরের নিকট ভিক্ষার দরুন কিয়ামতের দিন তোমার চেহারায় দাগ নিয়ে আসা অপেক্ষা জীবিকা অর্জনের এটা অনেক বেশি উত্তম পন্থা।’
৩.
শ্রেণিবৈষম্য দূরীকরণ: শ্রমকে ইসলামি শরীয়তে মর্যাদায় আসীন করা হয়েছে যেন তার প্রতি লোকদের মানবিক ঘৃণাবোধ বা লজ্জাবোধ না থাকে এবং সহজেই এটি যেন সার্বিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। ফলশ্র“তিতে মালিক-শ্রমিকের মাঝে বিরাজমান শ্রেণিবৈষম্য বাকী থাকবে না।
৪.
দারিদ্র বিমোচন: সর্বোপরি দারিদ্র বিমোচন ইসলাম কর্তৃক শ্রমের মর্যাদা ঘোষণা ও বাস্তবায়নের আরেকটি অন্যতম কারণ। দারিদ্র-পীড়ায় বিবৃত আক্রান্ত সমাজ ইসলামের মোটেও কাম্য নয়। অধিক ভোগ-বিলাস ইসলাম যেমন নিষিদ্ধ করেছে তদ্রƒপ দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হওয়াকেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। অসংখ্য হাদীসে তার প্রমাণ রয়েছে। মহানবী (সা.) সকাল-বিকাল যে মাসনুন দুআসমূহ শিক্ষা দিয়েছেন তার একটিতে কুফরী ও দারিদ্র উভয় থেকে মুক্তির প্রার্থনা করা হয়েছে।
মোটকথা শ্রমকে মানুষ যখন স্বাভাবিক মর্যাদা সম্পন্ন বিষয় মনে করবে তখন আলস্য ও লজ্জাবোধ তাকে উপার্জনের পথ থেকে বিরত রাখতে পারবে না। এভাবে শ্রমের মাধ্যমে একটি দারিদ্রমুক্ত সমাজ গঠনের পথ হবে খুবই নিষ্কণ্টক ও সুগম।
৫.
অক্ষম ও নির্জীব জনশক্তিকে দক্ষ ও কর্মমুখর করে তোলা। ইসলাম বৈরাগ্যকে হারাম করেছে। জীবন-বিমুখ মানসিকতা সমর্থন দেয়নি। হাজার হাজার সাহাবীর জীবনী তারই প্রতিচ্ছবি বহন করে। ব্যক্তিগত দীনী আমল ও দাওয়াতী তৎপরতার পাশাপাশি তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষ, উট-ভেড়া পালন, জিহাদ প্রভৃতি কাজের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সন্ন্যাসমুক্ত কর্ম-সজীব রেখেছিলেন। শ্রমের মাধ্যমে হালাল উপার্জনের মহত্ব ঘোষণা হওয়ায় কেউ মসজিদের কোণায় বসে জীবন-বিমুখ হয়ে শুধু ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত হয়ে যাওয়াকে দীন মনে করেননি। খোদার ভয় ও আখেরাতের চিন্তা সত্ত্বেও সবার মধ্যে ছিল জীবন প্রাণচাঞ্চল্য। মহানবী (সা.)ইরশাদ করেন,
‘সবল-সক্ষম মুমিন দুর্বল মুমিন অপেক্ষা উত্তম।’
সংগৃহীত