08/07/2024
একটি স্মরণীয় সাক্ষাত্কার _____
প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলা অনার্সের একটি ছাত্র এক রাশ দ্বিধা ও প্রত্যাশা নিয়ে এক সূর্যকরোজ্জ্বল সকালবেলা বি টি রোড ধরে এগিয়ে চলেছে বরানগরের দিকে। মার্ক্সবাদী সাহিত্য-নীতি বিষয়ে তরুণদের একটি পাঠচক্রে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানাতে এক প্রখ্যাত লেখকের কাছে চলেছে সে , বন্ধুদের কাছে দায়িত্ব পেয়ে । সে ছাড়া আর কারো সাহস হয় নি এই দায়িত্ব নেবার । আদৌ কি তিনি আসবেন নিতান্ত তরুণ কবিদের এই অকিঞ্চিত্কর পাঠচক্রে ?
বাস থেকে নেমে ছেলেটি একে তাকে জিজ্ঞেস করে অবশেষে একটি সাদাসিধে ছোটোখাটো বাড়ির দরজায় এসে কড়া নাড়ল । দরজা খুলে দিলেন এক মহিলা , নীরব ।
____ উনি কি আছেন?
____ বাজারে গেছেন ।
রোমান্টিক তরুণ কবির কল্পনায় তখন ‘লেখক’ ও ‘বাজারের’ মধ্যে কোনও স্বাভাবিক সংযোগের অবকাশ ছিল না । সে মনে মনে ভাবে , লেখক কি সাধারণ কোনও মানুষ নাকি ? তাঁকে কেন বাজারে যেতে হবে ? ভাবতে ভাবতে সামনের খোলা মাঠে পায়চারি করতে থাকে সে ।
আধ ঘণ্টা পরে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরা দীর্ঘদেহী সুঠাম এক শ্যামবর্ণ মানুষ দু-হাতে দুটি থলে নিয়ে ওই বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন । ছেলেটির বুকের রক্তে কাঁপন লাগলো । বাজার যখন হাতে , তাহলে উনিই তো সেই লেখক ! পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সে । আড়চোখে তার দিকে চেয়ে মানুষটি বললেন :
____ আপনি কি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ?
____ হ্যাঁ ।
____ আসুন , ভিতরে বসুন । বাজারটা রেখে দিয়ে আমি আসছি ।
লেখক পর্দা সরিয়ে ভিতরে গেলেন । তরুণটি বিমূঢ় ভাবে বসে বসে দেখতে থাকে লেখকের লেখার ঘরটিকে । উপকরণহীন একটি চৌকি , একটি ছোটো টেবিল , একটি চেয়ার । টেবিলে কোনও বই নেই , শূন্য । পুতুলনাচের ইতিকথা, পদ্মানদীর মাঝি, দিবারাত্রির কাব্য , কয়েকদিন আগে পড়া চতুষ্কোণ ___ মাথার মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছে তার চরিত্রেরা ।
রাজকুমার সরসী , কুবের , কপিলা, হোসেন মিয়া, শশী, কুসুম , হেরম্ব ... । ________________ এই রকম নিরাভরণ তাদের স্রষ্টার ঘর ? এই সেই বিতর্কিত ও সুপরিচিত লেখক ?
ফিরে এসে লেখক বসলেন বিমূঢ় তরুণটির মুখোমুখি । কী বলবে সে , কী বলা উচিত ? সব ঝাপসা হয়ে গেছে । তার অপ্রস্তুত নীরবতা দেখে সরাসরি তরুণটির চোখের দিকে তাকিয়ে লেখক বললেন :
____ কী ভাবছেন ? ভাবছেন যে , একজন লেখকের ঘর এমন ফাঁকা কেন ? নাকি ভাবছেন যে , লেখক নিজের হাতে বাজার করেন কেন ? ..... না করে আর উপায় কী বলুন ? ঝি-চাকর রাখার মতো টাকা কে দেবে আমাকে ? দেন কি আপনারা ? পড়েন কি কেউ আমার লেখা ? আপনি কি আমার কোনও লেখা পড়েছেন ?
_____ হ্যাঁ , অনেক .....
_____ কিনে পড়েছেন ?
_____ আজ্ঞে না , লাইব্রেরি থেকে , চেয়ে-চিন্তে ....
______ তাতে কী সুবিধে হলো আমার ? আপনার বন্ধুরা কেউ কিনেছেন ? .... কেনেন নি তো ? তবে ? পাঠকরা কেউ বই কিনবেন না , প্রকাশক বলবেন বই বিক্রি হয় না , টাকাটা তবে আসবে কোথা থেকে ? লেখকের ঘরটাও তাই এ-রকমই থাকবে ।
লাঞ্ছনার এই সত্য জেনে তরুণ কবিটি মাথা নীচু করে বসে রইল । একটু পরেই দরাজ গলায় প্রশ্ন এলো :
_____ বলুন এবার , কী জন্য এসেছেন । গল্প চাই একটা ?
ছেলেটি আত্মপরিচয় দিয়ে জানালো তার আগমনের উদ্দেশ্য , তাদের পাঠচক্রে কিছু বলার জন্য অনুরোধ । সব শুনে লেখক বললেন :
_____ ঠিক আছে, যাব । কোথায় কবে কখন , লিখে দিয়ে যান একটা চিরকুটে ।
বিহ্বল তরুণটি বিস্ময়-মুগ্ধ তখন । কোনও মতে আবেগ দমিত করে সে বলল :
____ নিয়ে যাব আমরা এসে ।
_____ কিছু দরকার নেই । আপনারা পয়সা পাবেন কোথায় ? চলে যেতে পারব একাই। পথনির্দেশটা শুধু রেখে যান ।
আরও দু-চারটে কথা বলে ছেলেটি পথে নেমে আসে । যে প্রত্যাশা নিয়ে সে এসেছিল , ফিরে যাচ্ছে তার বহুগুণ উপার্জন নিয়ে । বরানগর থেকে কলেজ স্ট্রিট , সেখান থেকে বৌবাজার পেরিয়ে বন্ধু প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের বাড়িতে উড়তে উড়তে পৌঁছে গেল সে , জয়ের বার্তা নিয়ে ।
*সেদিনের সেই প্রখ্যাত লেখক : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ।
*আর সেই তরুণ কবি হলেন : আজকের শঙ্খ ঘোষ ( যাঁর প্রকৃত নাম : চিত্তপ্রিয় ঘোষ )
( সূত্র : সময়ের জলছবি : শঙ্খ ঘোষ )
উত্তম দত্ত