29/06/2020
#ইসলামী_শারীয়ায়_তালাকঃ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
ইসলামী শরীয়তের অনন্য উপহার বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পারিবারিক জীবন। এ অটুট বন্ধন ছিন্ন করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে। অধিকার প্রতিষ্ঠা, সাবলম্বী করা ইত্যাদি স্লোগানে।
Islam is the complete code of life ইসলাম যেভাবে বিবাহ বন্ধনের স্বীকৃতি দিয়েছে তেমনি প্রয়োজনে বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ ও রেখেছে। নিম্নে তালাক সম্পর্কে আলোচনা করা হবে
إن شاء الله و بإذن الله.
#তালাকের_শারয়ী_দৃষ্টিভঙ্গিঃ
শারীয়াতে ইসলামী তালাককে অবৈধ বা একেবারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি, আবার এ জন্য কোন কারণও নির্ধারণ করে দেয় নি যে, সে অবস্থায় তালাক বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, তালাক আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক অপছন্দনীয় বৈধ কর্ম।
# স্বামী স্ত্রীকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যেগুলো অনুসরণের মাধ্যমে তালাকের মতো জটিল পরিস্থিতি খুব কমই সৃষ্টি হয়।
# আর তালাকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার এমন পন্থা বাতলে দিয়েছেন, যাতে ক্ষতির পরিমাণ নগণ্য।
বর্তমান সময়ে মানুষ সেসব অনুশাসনের অনুসরণে সুখময় দাম্পত্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে।
#কুরআন_সুন্নাহতে_তালাকঃ
তালাকের যথেচ্ছা ব্যবহার রুখতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার অন্যতম হল,
* স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোন অমিল দেখা দিলে পরস্পরের ভালো গুণের প্রতি দৃষ্টিপাত করা। হয়তো সেগুলো সহজে সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। বরং কুরআন কারীম আরও অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করেছে:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ فَإِن كَرِهۡتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰۤ أَن تَكۡرَهُوا۟ شَیۡـࣰٔا وَیَجۡعَلَ ٱللَّهُ فِیهِ خَیۡرࣰا .
অর্থাৎ নারীদের সাথে ন্যায়সঙ্গত ও সদ্ভাবে জীবন যাপন করো। অতঃপর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ করে, তবে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিস কে অপছন্দ করছো রাতে আল্লাহ তাআলা প্রচুর কল্যাণ রেখেছেন।_সূরা নিসা, ১৯।
পরবর্তী ধাপে কুরআন কারীম একথা বলে যে, নরম-গরম সব পন্থা অবলম্বন করে ও স্বামী স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-কলহ নিজেরা সমাধা করতে না পারে। তবে তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত না নিয়ে উভয় পক্ষ সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা সমাধানের চেষ্টা করবে। উপরন্তু আল্লাহ তাআলা একথাও বলেছেন,
إِن یُرِیدَاۤ إِصۡلَـٰحࣰا یُوَفِّقِ ٱللَّهُ بَیۡنَهُمَاۤۗ .
অর্থাৎ যদি এরা উভয়ে সৎ নিয়তে সংশোধনের চেষ্টা করে তবে আল্লাহ তাআলা এদের মধ্যে সু-সম্পর্ক সৃষ্টি করে দিবেন। সূরা নিসা-৩৫।
#তালাকের_প্রকারভেদঃ
প্রয়োগের পদ্ধতিগত দৃষ্টিতে তিন প্রকার। যথাঃ
১। 'আহসান' বা তালাকের সর্বোত্তম পন্থা। অর্থাৎ মাসিক ঋতুস্রাব হতে মুক্ত এমন পবিত্রতা যে পবিত্রতায় স্বামী স্ত্রী একান্তে মিলিত হয়নি। এমন পবিত্রতার সময়ে স্ত্রীকে এক তালাক প্রদান করা। ইদ্দত শেষে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
২। 'হাসান তালাক' যাকে সুন্নাহ তালাক ও বলে, অর্থাৎ তিন 'তুহরে' বা পবিত্রতায় তিন তালাক প্রদান করা।
৩। 'তালাকে বিদআত তথা নাযায়েজ তালাক: যা সুন্নাহ বহির্ভূত পন্থায় প্রদান করা হয়। যথা: *মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক প্রদান, *তেমনি যে পবিত্রতায় স্বামী স্ত্রী একান্তে মিলিত হয়েছে।
* একসাথে তিন তালাক প্রদান করা।
* এক তুহরে বা পবিত্রতায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দে তিন তালাক দেয়া। এ সকল অবস্থাতেই তালাক প্রদান নাযায়েজ। কবিরা গুনাহ। কিন্তু দিয়ে দিলে কার্যকর হয়ে যায়।
#শরীয়া_পরিপালনের_উপকারিতা:
সুন্নাহ সম্মত পন্থায় বহুবিধ কল্যাণ নিহিত। যথা: ১। সাময়িক মনমালিন্য বা ঝগড়ার কারণে তালাক হবে না।
২। স্বামীকে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা এজন্য করতে বলা হয়েছে যেন সে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৩। প্রতীক্ষার কারণে উভয়ের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রবল সম্ভাবনা থাকে। ফলে তা আর তালাক পর্যন্ত পৌঁছে না।
৪। তথাপি উপযুক্ত সময় আসার পরেও তালাকের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকলে স্বামী এক তালাকেক রযয়ী প্রদান করবে। ফলে ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর বৈবাহিক সম্পর্ক বিলুপ্ত হবে এবং উভয়ে নিজ ভবিষ্যতের ব্যাপারে স্বাধীন ভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
৫। ইদ্দত চলাকালীন স্বামী স্বীয় ভুল বুঝতে পারে এবং ভবিষ্যতে কল্যাণের ধারণায় স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৬। ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় সংসার করতে চায় তাহলে স্বাভাবিক নিয়মে পারস্পরিক সম্মতিতে নতুনভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে।
৭। এরপরে আবারও কলহ দেখা দিলে দ্বিতীয় বার ও তাড়াহুড়ো না করে শরয়ী নির্দেশনা মেনে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। অর্থাৎ এক তালাক প্রদান করবে।
৮। এরপরে ও বিষয়টি স্বামী স্ত্রীর আয়ত্বাধীন থাকে। অর্থাৎ ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর ইদ্দত অতিবাহিত হলেও তৃতীয়বার বিবাহের বৈধতা বিদ্যমান।
কুরআন-সুন্নাহর বর্ণীত পদ্ধতির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে পরিস্কার বুঝা যায় যে বিবাহ বন্ধন অটুট রাখতে এবং ভাঙ্গন রোধে পর্যাক্রমে কতটা গুরুত্ব প্রদান করেছে।
বি:দ্র: তৃতীয় তালাকের পর আর বিবাহ পুণর্বহাল করা যাবে না স্বামী স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। পারস্পরিক সম্মতিতে ও নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। বাধ্যতামূলক উভয়কে পৃথক হতেই হবে।
#তালাক_সংক্রান্ত_কিছু_বিভ্রান্তি:
দ্বীনি শিক্ষার অভাবে অনেকেই তিন তালাকের কমকে তালাক ই মনে করে না। এক বা দুই তালাক লেখা হলে তালাকই হয় না। এজন্য তালাকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে শুরুতেই তিন বা তার অধিক তালাক দিয়ে থাকে।
*অনেকে লাখ থেকে কোটি পর্যন্ত সংখায় তালাক দিয়ে থাকে। অথচ এক তালাকের দ্বারাই উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে যায়।
*অনেকে সকালে তালাক দিয়ে বিকেলে প্রত্যাহার করে নেয়। অর্থাৎ বিষয়টি তুচ্ছ মনে করে।
* রাগান্বিত অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয় না।
* নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয় না।
* স্বাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া তালাক হয় না।
* তালাক নামা স্ত্রী গ্রহণ না করলে তালাক হয় না।
অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস অনুযায়ী যেকোন অবস্থায় তালাক দিলে তা কার্যকর হয়ে যায়।
* একসাথে তিন তালাক প্রদান শারীয়ার দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ ও মারাত্মক অপরাধ। যার প্রাথমিক শাস্তি হলোঃ পারস্পরিক সম্পর্ক পুণর্বহালের সুযোগ শেষ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের ঐক্যমত্য রয়েছে। এজন্য তিন তালাকের পর অনেকেই মারাত্মক পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে থাকে। বিধায় তালাকের এ ভ্রান্ত ধারণা দূর করা প্রয়োজন।
#অনিচ্ছাকৃত_তালাকঃ
[عن أبي هريرة:] ثَلاثٌ جِدُّهنَّ جِدٌّ، وهَزْلُهنَّ جِدٌّ؛ النِّكاحُ، والطَّلاقُ، والرَّجْعةُ. سنن أبي داود ٢١٩٤.
হযরত আবু হুরায়রা রা হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: তিনটি বিষয় এমন রয়েছে যেগুলো ইচ্ছাকৃত বলা আর হাসি তামাচ্ছলে বলা সমানভাবে কার্যকর (তা হলো) বিবাহ, তালাক, রাযআত বা তালাক প্রত্যাহার।
#অনুরোধ:
* ভদ্রলোকেরা স্ত্রীদের প্রহার করে না। এ জন্যই কোন নবী থেকে ও তা প্রমানিত নয়। আমরা কি এহেন আচরণে লজ্জিত হবো না?
*তালাকের উত্তম পন্থা যা উম্মাহর সর্বসম্মত মতামত, তা জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসা।
*মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
সর্বোপরি উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে স্ববিশেষ দৃষ্টি দিবেন বলে আশা প্রকাশ করি।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه .
(الألوكة.نيت.
বিয়ে ও তালাকের শরয়ী রূপরেখা এর সহযোগিতায় )