09/02/2026
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। বসন্তের বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। রাঙামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকায় চিংড়ি খালের তীরে পাহারায় রত একদল তরুণ। পাহাড়ি অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেবল বয়ে চলছে খালের জল। ল্যান্স নায়েক আবদুর রউফ তাঁর চোখ জোড়া নিবদ্ধ রেখেছেন দূর দিগন্তে। মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর এই তরুণের মনে তখন কোনো ভয় নেই, আছে কেবল অতন্দ্র প্রহরীর সতর্কতা।
৮ই এপ্রিলের সকাল। হঠাৎ খালের বুক চিরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডো ব্যাটালিয়নের ছয়টি মটর লঞ্চ আর দুটি গানবোট। কামানের গর্জনে কেঁপে উঠল শান্ত বুড়িঘাট। আবদুর রউফ তাঁর সহযোদ্ধা কামালকে ইশারা করলেন। শুরু হলো এক অসম লড়াই। একপাশে আধুনিক মরণাস্ত্রে সজ্জিত এক বিশাল বাহিনী, অন্যপাশে মুষ্টিমেয় কিছু দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা।
শত্রুর ভারী গোলার আঘাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মরটার শেল আর মেশিনগানের গুলিতে মাটি ও জল একাকার হয়ে যাচ্ছে। আবদুর রউফ বুঝলেন, এখনই কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে সবাইকে মরতে হবে। তাঁর সামনে দুটি পথ—হয় পশ্চাদপসরণ করা, নয়তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে অন্যদের বাঁচানো।
রউফ চিৎকার করে উঠলেন, "তোমরা পিছু হটে যাও! পাহাড়ের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ে যাও! আমি এদের ঠেকিয়ে রাখছি।" কামাল তাঁর হাত চেপে ধরে বললেন, "রউফ ভাই, একলা ফেলে যাব না।" কিন্তু রউফ অনড়। তিনি জানতেন, ১৫০ জন সহযোদ্ধার জীবন আজ তাঁর ওপর নির্ভর করছে। তিনি কামালকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আবার মেশিনগানের ট্রিগারে হাত রাখলেন।
সহযোদ্ধারা যখন পাহাড়ের বন্ধুর পথ বেয়ে নিরাপদ দূরত্বের দিকে ছুটছিল, আবদুর রউফ তখন একা দাঁড়িয়ে এক অগ্নিপ্রাচীর হয়ে। তাঁর মেশিনগান থেকে ছুটে যাওয়া একেকটি গুলি যেন ইতিহাসের একেকটি শব্দ। তিনি জানতেন, তাঁর প্রতিটি সেকেন্ডের লড়াই মানেই ১৫০টি প্রাণের বেঁচে থাকা। চিংড়ি খালের জল আজ রক্তিম হওয়ার অপেক্ষায়, কিন্তু রউফ হার মানতে নারাজ।
বীর বিক্রমে লড়ছিলেন রউফ। তাঁর নির্ভুল নিশানায় শত্রুর একটি লঞ্চ ডুবে গেল, আরেকটি গানবোট বিকল হয়ে মাঝনদীতে থমকে দাঁড়াল। পাকিস্তানি সেনারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তারা ভাবতেও পারেনি যে একজন মানুষ এভাবে যমের মতো পথ আগলে দাঁড়াতে পারে। রউফের বীরত্বে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল বিশাল এক শত্রু বাহিনী।
কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। হঠাৎ একটি মটর শেলের গোলা সরাসরি এসে পড়ল রউফের পরিখার ওপর। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এক বিকট শব্দ। এক নিমিষেই থেমে গেল মেশিনগানের গর্জন। বুড়িঘাটের নিস্তব্ধতা ফিরে এল এক বুক ভাঙা বেদনা নিয়ে। বাংলার এক শ্রেষ্ঠ সন্তান তাঁর বুকের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিলেন চিংড়ি খালের মাটি।
পাহাড়ের নিরাপদ চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কামাল আর তাঁর ১৪৯ জন সহযোদ্ধা স্তব্ধ হয়ে দেখলেন সেই দৃশ্য। তাদের চোখে তখন অশ্রুর ধারা। যে মানুষটি নিজের জীবন তুচ্ছ করে তাদের বাঁচিয়ে দিলেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। তারা কেবল পেলেন এক মহান মুক্তির আস্বাদ, যার মূল্য ছিল আবদুর রউফের অমূল্য প্রাণ।
স্বাধীনতার পর বহু বছর কেটে গেছে। চিংড়ি খালের পাড়ে সেই অকুতোভয় বীরের রক্তভেজা মাটি ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়েছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় দয়াল মোহন চাকমার সহায়তায় খুঁজে পাওয়া যায় সেই বীরশ্রেষ্ঠের সমাধি। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর জাতি খুঁজে পায় তাঁর হারানো অভিভাবককে। নানিয়ারচরের নির্জন পাহাড়ের কোল থেকে বেরিয়ে এল এক অমর বীরত্বের কাহিনী।
আজ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ কেবল একটি নাম নয়, তিনি আমাদের সার্বভৌমত্বের এক জীবন্ত স্বাক্ষর। চিংড়ি খালের কলতান আজও তাঁর বীরত্বগাথা শুনিয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এক আলোকবর্তিকা, যিনি শিখিয়ে গেছেন—দেশপ্রেমের কাছে মৃত্যুই চিরন্তন জীবন। তাঁর স্মৃতিতে গড়া স্মৃতিস্তম্ভটি আজ কোটি মানুষের শ্রদ্ধায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।