Roar Of Bengal

Roar Of Bengal যে ইতিহাস বইয়ে নেই—সে ইতিহাসই বলি আমরা।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। বসন্তের বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। রাঙামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকায় চিংড়ি খালের তীরে পাহার...
09/02/2026

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। বসন্তের বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। রাঙামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকায় চিংড়ি খালের তীরে পাহারায় রত একদল তরুণ। পাহাড়ি অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কেবল বয়ে চলছে খালের জল। ল্যান্স নায়েক আবদুর রউফ তাঁর চোখ জোড়া নিবদ্ধ রেখেছেন দূর দিগন্তে। মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর এই তরুণের মনে তখন কোনো ভয় নেই, আছে কেবল অতন্দ্র প্রহরীর সতর্কতা।
৮ই এপ্রিলের সকাল। হঠাৎ খালের বুক চিরে এগিয়ে আসতে দেখা গেল পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডো ব্যাটালিয়নের ছয়টি মটর লঞ্চ আর দুটি গানবোট। কামানের গর্জনে কেঁপে উঠল শান্ত বুড়িঘাট। আবদুর রউফ তাঁর সহযোদ্ধা কামালকে ইশারা করলেন। শুরু হলো এক অসম লড়াই। একপাশে আধুনিক মরণাস্ত্রে সজ্জিত এক বিশাল বাহিনী, অন্যপাশে মুষ্টিমেয় কিছু দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা।
শত্রুর ভারী গোলার আঘাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। মরটার শেল আর মেশিনগানের গুলিতে মাটি ও জল একাকার হয়ে যাচ্ছে। আবদুর রউফ বুঝলেন, এখনই কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে সবাইকে মরতে হবে। তাঁর সামনে দুটি পথ—হয় পশ্চাদপসরণ করা, নয়তো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে অন্যদের বাঁচানো।
রউফ চিৎকার করে উঠলেন, "তোমরা পিছু হটে যাও! পাহাড়ের আড়ালে নিরাপদ আশ্রয়ে যাও! আমি এদের ঠেকিয়ে রাখছি।" কামাল তাঁর হাত চেপে ধরে বললেন, "রউফ ভাই, একলা ফেলে যাব না।" কিন্তু রউফ অনড়। তিনি জানতেন, ১৫০ জন সহযোদ্ধার জীবন আজ তাঁর ওপর নির্ভর করছে। তিনি কামালকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে আবার মেশিনগানের ট্রিগারে হাত রাখলেন।
সহযোদ্ধারা যখন পাহাড়ের বন্ধুর পথ বেয়ে নিরাপদ দূরত্বের দিকে ছুটছিল, আবদুর রউফ তখন একা দাঁড়িয়ে এক অগ্নিপ্রাচীর হয়ে। তাঁর মেশিনগান থেকে ছুটে যাওয়া একেকটি গুলি যেন ইতিহাসের একেকটি শব্দ। তিনি জানতেন, তাঁর প্রতিটি সেকেন্ডের লড়াই মানেই ১৫০টি প্রাণের বেঁচে থাকা। চিংড়ি খালের জল আজ রক্তিম হওয়ার অপেক্ষায়, কিন্তু রউফ হার মানতে নারাজ।
বীর বিক্রমে লড়ছিলেন রউফ। তাঁর নির্ভুল নিশানায় শত্রুর একটি লঞ্চ ডুবে গেল, আরেকটি গানবোট বিকল হয়ে মাঝনদীতে থমকে দাঁড়াল। পাকিস্তানি সেনারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তারা ভাবতেও পারেনি যে একজন মানুষ এভাবে যমের মতো পথ আগলে দাঁড়াতে পারে। রউফের বীরত্বে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল বিশাল এক শত্রু বাহিনী।
কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। হঠাৎ একটি মটর শেলের গোলা সরাসরি এসে পড়ল রউফের পরিখার ওপর। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এক বিকট শব্দ। এক নিমিষেই থেমে গেল মেশিনগানের গর্জন। বুড়িঘাটের নিস্তব্ধতা ফিরে এল এক বুক ভাঙা বেদনা নিয়ে। বাংলার এক শ্রেষ্ঠ সন্তান তাঁর বুকের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিলেন চিংড়ি খালের মাটি।
পাহাড়ের নিরাপদ চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা কামাল আর তাঁর ১৪৯ জন সহযোদ্ধা স্তব্ধ হয়ে দেখলেন সেই দৃশ্য। তাদের চোখে তখন অশ্রুর ধারা। যে মানুষটি নিজের জীবন তুচ্ছ করে তাদের বাঁচিয়ে দিলেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। তারা কেবল পেলেন এক মহান মুক্তির আস্বাদ, যার মূল্য ছিল আবদুর রউফের অমূল্য প্রাণ।
স্বাধীনতার পর বহু বছর কেটে গেছে। চিংড়ি খালের পাড়ে সেই অকুতোভয় বীরের রক্তভেজা মাটি ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়েছিল। অবশেষে ১৯৯৬ সালে স্থানীয় দয়াল মোহন চাকমার সহায়তায় খুঁজে পাওয়া যায় সেই বীরশ্রেষ্ঠের সমাধি। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর জাতি খুঁজে পায় তাঁর হারানো অভিভাবককে। নানিয়ারচরের নির্জন পাহাড়ের কোল থেকে বেরিয়ে এল এক অমর বীরত্বের কাহিনী।
আজ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ কেবল একটি নাম নয়, তিনি আমাদের সার্বভৌমত্বের এক জীবন্ত স্বাক্ষর। চিংড়ি খালের কলতান আজও তাঁর বীরত্বগাথা শুনিয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি এক আলোকবর্তিকা, যিনি শিখিয়ে গেছেন—দেশপ্রেমের কাছে মৃত্যুই চিরন্তন জীবন। তাঁর স্মৃতিতে গড়া স্মৃতিস্তম্ভটি আজ কোটি মানুষের শ্রদ্ধায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

হঠাৎ চারদিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল। পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে নূর মোহাম্মদদের ঘিরে ফেলেছে। সংখ্যায় তারা অনেক বেশি,...
09/02/2026

হঠাৎ চারদিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল। পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে নূর মোহাম্মদদের ঘিরে ফেলেছে। সংখ্যায় তারা অনেক বেশি, আর সাথে আছে ভারী অস্ত্রশস্ত্র। নূর মোহাম্মদ বুঝতে পারলেন, আজ এক কঠিন পরীক্ষা। তিনি তাঁর দলের সবাইকে দ্রুত পজিশন নিতে বললেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে লাগল। হঠাৎ একটি বুলেট এসে লাগল নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা নিলনের গায়ে। নিলন যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বৃষ্টির মতো গুলি ধেয়ে আসছে চারিদিক থেকে। নূর মোহাম্মদ এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে নিলনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
নূর মোহাম্মদ জানতেন, সবাইকে বাঁচাতে হলে কাউকে তো কভারিং ফায়ার দিতেই হবে। তিনি মোস্তফাকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বললেন, "তোমরা নিলনকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যাও! আমি ওদের আটকে রাখছি।" মোস্তফা প্রথমে রাজি হতে চাননি, কিন্তু নূর মোহাম্মদের আদেশ ছিল অটল।
প্রচণ্ড গুলির মাঝেই নূর মোহাম্মদ কাঁধে তুলে নিলেন আহত নিলনকে। এক হাতে বন্ধুকে ধরে রাখা আর অন্য হাতে রাইফেল চালানো—এ যেন এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। তিনি নিরাপদ একটি গর্তের মধ্যে নিলনকে শুইয়ে দিলেন যাতে অন্য সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে পিছিয়ে যেতে পারে।
এবার নূর মোহাম্মদ একা। তাঁর সামনে শত্রু সৈন্যের বিশাল বাহিনী। তিনি একটি এলএমজি হাতে নিয়ে অবিরাম গুলি চালাতে শুরু করলেন। তাঁর লক্ষ্য একটাই—সহযোদ্ধারা যেন নিরাপদে ফিরতে পারে। তাঁর গর্জনে যেন কেঁপে উঠল গোয়ালহাটির আকাশ।
হঠাৎ বিকট শব্দে একটি মর্টার শেল বিস্ফোরিত হলো নূর মোহাম্মদের ঠিক কাছেই। তাঁর একটি পা মারাত্মকভাবে জখম হলো। অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। কিন্তু তাঁর মনোবল ভাঙেনি। তিনি জানতেন, তাঁর লড়াই এখনো শেষ হয়নি।
যখম পা নিয়ে নূর মোহাম্মদ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হামাগুড়ি দিয়ে সরতে লাগলেন। তিনি চাচ্ছিলেন শত্রুরা মনে করুক সেখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে। তাঁর প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল কৌশলী এবং সাহসিকতায় পূর্ণ। রক্তে ভেজা মাটিও যেন তাঁর বীরত্বের সাক্ষী দিচ্ছিল।
নূর মোহাম্মদ দেখতে পেলেন তাঁর সহযোদ্ধারা নিরাপদে বনের আড়ালে চলে গেছেন। তাঁর মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ট্রিগার চেপে রাখলেন। একা নূর মোহাম্মদের বীরত্বের কাছে হার মানল বিশাল শত্রু বাহিনী।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ সেদিন শহীদ হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সহযোদ্ধাদের। তাঁর এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়। আজও গোয়ালহাটির মাটি তাঁর বীরত্বের কথা বলে। দেশের জন্য তাঁর এই ভালোবাসা কিশোরদের হৃদয়ে চিরদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর। বিজয়ের সুবাস চারদিকে, কিন্তু রূপসা নদীর লোনা বাতাসে তখনো বারুদের গন্ধ। গানবোট ‘পলাশ’-এর ইঞ্জিন ...
08/02/2026

১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর। বিজয়ের সুবাস চারদিকে, কিন্তু রূপসা নদীর লোনা বাতাসে তখনো বারুদের গন্ধ। গানবোট ‘পলাশ’-এর ইঞ্জিন রুমে ঘাম আর তেলের গন্ধে নিবিষ্ট হয়ে কাজ করছিলেন ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তাঁর চোখে আজ এক বিশেষ দ্যুতি; খুলনা শত্রুুমুক্ত করার চূড়ান্ত অভিযানে তিনি অগ্রসেনানী। ইঞ্জিনের অবিরাম গর্জন যেন তাঁর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানির সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছিল।
ডেক থেকে আফজাল চিৎকার করে উঠল, “আমরা পৌঁছে গেছি, রুহুল ভাই! ওই তো দেখা যায় খুলনার তটরেখা।” রুহুল আমিন একটু সময়ের জন্য ডেকে উঠে এলেন। কুয়াশাভেজা দিগন্তে রূপসার পাড় দেখা যাচ্ছে। তিনি এবং আফজাল সমুদ্রের নোনা বাতাসের স্বাদ নিলেন। স্বাধীনতার সূর্য ওঠার ঠিক আগমুহূর্তে এক অদ্ভুত প্রশান্তি তাঁদের ঘিরে ধরল।
হঠাৎ আকাশের বুক চিরে গর্জন শোনা গেল। তিনটি যুদ্ধবিমান মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। আফজাল হাত তুলে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, “বন্ধু বিমান! ওগুলো আমাদের সাহায্য করতে এসেছে!” সে ডেক থেকে আনন্দের সাথে বিমানের দিকে হাত নাড়তে লাগল। রুহুল আমিনের চোখেও ছিল আশার ঝিলিক, কিন্তু সেই আশা স্থায়ী হলো না।
হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এল অগ্নিবৃষ্টি। ভুলবশত মিত্রবাহিনীর বিমানগুলো ‘পলাশ’-কে লক্ষ্য করে বোমা ছুড়ল। এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল পুরো গানবোট। আগুনের গোল্লা এসে আছড়ে পড়ল ডেকে। রুহুল আমিন ছিটকে পড়লেন ডেকের এক কোণে। চারদিকে আর্তনাদ আর কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেল চারপাশ।
কিন্তু রুহুল আমিন হার মানার পাত্র নন। আহত শরীর নিয়েও তিনি টলতে টলতে ইঞ্জিন রুমে ফিরে গেলেন। আগুনের লেলিহান শিখা তখন ইঞ্জিন রুম গ্রাস করতে শুরু করেছে। তপ্ত বাষ্প আর ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছিল, তবুও তিনি চেষ্টা করছিলেন ইঞ্জিন সচল রেখে গানবোটটিকে কোনোভাবে রক্ষা করতে। তাঁর হাতের তালু তপ্ত লোহায় পুড়ে যাচ্ছিল।
গানবোটটি যখন ডুবতে শুরু করেছে, তখন অধিনায়ক নির্দেশ দিলেন জাহাজ ত্যাগ করার। রুহুল আমিন দেখলেন তাঁর এক তরুণ সহযোদ্ধা সুমন আহত হয়ে পড়ে আছে। তিনি সুমনকে কাঁধে তুলে নিলেন। “হাল ছেড়ো না সুমন, আমাদের বাঁচতে হবে,” তিনি ফিসফিস করে বললেন। জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে তিনি সুমনকে নিয়ে ডেকের প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেলেন।
রূপসার শীতল জলে ঝাঁপ দিলেন রুহুল আমিন। যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসছিল তাঁর শরীর, কিন্তু বাঁচার তাগিদে তিনি সাঁতরে তীরের দিকে এগোতে লাগলেন। নদীর ঢেউগুলো যেন আজ অনেক বেশি ভারী। প্রতিটি টানে মনে হচ্ছিল শরীর ছিঁড়ে যাচ্ছে, তবুও তিনি রূপসার বুক চিরে পূর্ব তীরের দিকে এগিয়ে চললেন।
অবশেষে তীরের কাদামাখা মাটিতে হাত রাখলেন তিনি। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে ডাঙায় উঠে এলেন। কাদা আর ঘাসে মাখামাখি হয়ে তিনি যখন একটু নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখনই দেখলেন সামনে একদল সশস্ত্র মানুষ। তিনি ভেবেছিলেন তাঁরা বুঝি মুক্তিপাগল জনতা, যারা তাঁকে উদ্ধার করতে এসেছে।
কিন্তু না, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাতক রাজাকারের দল। তাদের চোখে কোনো করুণা ছিল না। রুহুল আমিন যখন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জল চাইছিলেন, তখন এক ঘাতক বেয়নেট উঁচিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে এল। বীর এই সৈনিকের রক্তে রূপসার পাড় লাল হয়ে উঠল। স্বাধীনতার ঠিক দ্বারে দাঁড়িয়ে তিনি চিরতরে চোখ বুজলেন।

বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন আর নেই, কিন্তু তাঁর ত্যাগ বৃথা যায়নি। রূপসা নদীর স্রোত আজও বয়ে চলে তাঁর বীরত্বগাথা শুনিয়ে। ঘাসের ওপর পড়ে থাকা তাঁর শান্ত মুখমণ্ডল যেন বলছিল, দেশ স্বাধীন হয়েছে, এটাই তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। বাংলার আকাশ-বাতাস আজও তাঁকে সশ্রদ্ধ সালাম জানায়।

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরুইন গ্রাম তখন এক রণক্ষেত্র। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, যেন প্রকৃতিও আসন্ন এক শোকের জ...
08/02/2026

১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দরুইন গ্রাম তখন এক রণক্ষেত্র। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, যেন প্রকৃতিও আসন্ন এক শোকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল সাহসী যোদ্ধা মাটি কামড়ে পড়ে আছেন তাঁদের ট্রেঞ্চে। তাঁদের নেতৃত্বে তরুণ ল্যান্স নায়েক মোস্তফা কামাল। তাঁর চোখে তখন কেবল একটাই স্বপ্ন—দেশের স্বাধীনতা।
হঠাৎই পাকিস্তানি বাহিনীর গোলার শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কামানের গোলায় দরুইনের মাটি কেঁপে উঠছে বারবার। মোস্তফার পাশে থাকা তাঁর সহযোদ্ধা আরশাদ কাঁপা হাতে রাইফেলটা শক্ত করে ধরলেন। শত্রুরা তিন দিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে তাঁদের। মোস্তফা বুঝতে পারলেন, অবস্থান ধরে রাখা এখন অসম্ভব।
মোস্তফা আরশাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থীরে বললেন, "আমাদের পেছনের দিকে সরে যেতে হবে, আরশাদ। এখানে থাকলে সবাই মারা পড়ব। তোমরা এখনই নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে রওনা হও।" আরশাদ বিস্ময়ে থমকে গেলেন। তিনি জানেন, সবাই একসঙ্গে সরতে গেলে শত্রুরা সহজেই তাঁদের পিছু নেবে।"কিন্তু আপনি?" আরশাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। মোস্তফা হাসলেন, এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি। "আমি এলএমজি নিয়ে এখানে থাকব। আমি ওদের ঠেকিয়ে রাখছি, তোমরা ওই জঙ্গলটা পার না হওয়া পর্যন্ত আমি সরব না। এটা আমার আদেশ।" আরশাদ এবং আরেকজন সৈনিক সেলিম একে অপরের দিকে তাকালেন, কিন্তু মোস্তফার সংকল্প টলানোর সাধ্য কারো ছিল না।সহযোদ্ধারা যখন কর্দমাক্ত পথ ধরে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন, মোস্তফা তখন একা। তাঁর সামনে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিশাল শত্রু বাহিনী। তিনি জানেন, এই যাত্রা তাঁর শেষ যাত্রা হতে পারে। তিনি এলএমজিটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর আঙুল তখন ট্রিগারের অপেক্ষায় অস্থির।আরশাদ আর সেলিম বনের আড়াল থেকে শেষবারের মতো তাঁদের নেতার দিকে ফিরে তাকালেন। মোস্তফা তখন একাই যুদ্ধক্ষেত্রে যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বৃষ্টির ঝাপটায় তাঁদের চোখের জল মিশে যাচ্ছিল, কিন্তু থামার অবকাশ নেই। তাঁদের বাঁচতে হবে দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য।

শত্রুরা যখনই এগোতে চেষ্টা করছিল, মোস্তফার এলএমজি গর্জে উঠছিল। ব্রাশ ফায়ারে একের পর এক শত্রুসেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। মোস্তফা একাই বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছেন। তাঁর লক্ষ্য একটাই—শত্রুদের কোনোভাবেই এগোতে দেওয়া যাবে না যতক্ষণ না তাঁর ভাইয়েরা নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছান।

যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। হঠাৎ একটি বুলেট মোস্তফার শরীরে বিঁধে গেল। যন্ত্রণায় তাঁর কপাল কুঁচকে উঠল, কিন্তু তিনি থামলেন না। রক্তে তাঁর সবুজ ইউনিফর্ম লাল হয়ে যাচ্ছে, তবু তিনি ট্রিগার ছাড়লেন না। প্রতিটি সেকেন্ড তিনি কিনছেন তাঁর সহযোদ্ধাদের জীবনের বিনিময়ে।ধীরে ধীরে মোস্তফার গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছিল। চারপাশটা যেন হঠাতই শান্ত হয়ে এল। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। মোস্তফা বুঝতে পারলেন, তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। তিনি আকাশের দিকে একবার তাকালেন। মুখভর্তি এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে তিনি ঢলে পড়লেন দরুইনের পবিত্র মাটিতে।আজ অনেক বছর কেটে গেছে। দরুইনের সেই মাটি আজ শান্ত, সেখানে সবুজ ঘাস জন্মেছে। আরশাদ আজ বৃদ্ধ, কিন্তু প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল তিনি এখানে ফিরে আসেন। তিনি জানেন, মোস্তফা সেদিন একা লড়েছিলেন বলেই আজ হাজারো মোস্তফা স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। মোস্তফা কামাল মরেননি, তিনি মিশে আছেন এই বাংলার প্রতিটি ধূলিকণায়।

বহু বছর আগের কথা। পশ্চিম পাকিস্তানের এক সেনা ছাউনিতে বসে এক তরুণ বাঙালি অফিসার অস্থির বোধ করছিলেন। তাঁর নাম মহিউদ্দিন জা...
07/02/2026

বহু বছর আগের কথা। পশ্চিম পাকিস্তানের এক সেনা ছাউনিতে বসে এক তরুণ বাঙালি অফিসার অস্থির বোধ করছিলেন। তাঁর নাম মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। চারপাশে পাহাড় আর মরুভূমি, কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে হাজার মাইল দূরে তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। সেখানে তখন স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তিনি স্থির করলেন, বন্দি জীবন ছেড়ে তাঁকে দেশের টানে ফিরতেই হবে
পালানো সহজ ছিল না। জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগ দিলেন আরও তিন সাহসী অফিসার—শাহরিয়ার, এনামুল আর খায়রুল। তাঁরা ঠিক করলেন কারাকোরাম পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছাবেন। রাতের অন্ধকারে তাঁরা ছাউনি থেকে বের হলেন। চারদিকে পাকিস্তানি প্রহরীদের কড়া নজর, কিন্তু বাংলার এই সূর্যসন্তানদের থামানোর সাধ্য কারো নেই।
শুরু হলো এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। মাথার ওপর বিশাল কারাকোরাম পাহাড়, নিচে গভীর খাদ। হাড়কাঁপানো শীত আর পাথুরে পথে তাঁরা হাঁটতে লাগলেন। মাঝে মাঝে বরফে পা পিছলে যাচ্ছিল, কিন্তু জাহাঙ্গীর সাহস হারালেন না। তিনি শাহরিয়ারের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, "আমাদের পৌঁছাতে হবেই, দেশের মানুষ আমাদের পথ চেয়ে আছে।"
দীর্ঘ কয়েক দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে তাঁরা পৌঁছালেন নিরাপদ আশ্রয়ে। সেখান থেকে সোজা নিজের জন্মভূমিতে। বাংলাদেশে পৌঁছেই জাহাঙ্গীর যোগ দিলেন ৭ নম্বর সেক্টরে। তাঁর অসাধারণ সাহসিকতা আর রণকৌশল দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। তিনি হয়ে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রিয় 'ক্যাপ্টেন সাহেব'।চাঁপাইনবাবগঞ্জ তখনো শত্রুমুক্ত হয়নি। পাকিস্তানি সেনারা সেখানে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। জাহাঙ্গীর পরিকল্পনা করলেন এক সাহসী অভিযানের। তিনি তরুণ মুক্তিযোদ্ধা মুকুলকে ডেকে বললেন, "আমাদের মহানন্দা নদী পার হয়ে শত্রুদের চমকে দিতে হবে। অন্ধকার থাকতেই আমরা ওপারে পৌঁছাব।"
ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা রাত। চারদিকে কুয়াশার চাদর। মহানন্দা নদীর শান্ত জলে ছোট ছোট নৌকা নিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চললেন জাহাঙ্গীর আর তাঁর বাহিনী। মুকুল নৌকার বৈঠা বাইছিলেন খুব সাবধানে, যেন টুপ করে একটা শব্দও না হয়। ওপারেই রেহাইচর, যেখানে ওত পেতে আছে শত্রুসেনারা।
নদী পার হয়ে জাহাঙ্গীর বুঝতে পারলেন শত্রুদের বাঙ্কার থেকে অনবরত গুলি আসছে। এই বাঙ্কারগুলো ধ্বংস না করলে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। জাহাঙ্গীর তাঁর সঙ্গীদের বললেন, "তোমরা কভার দাও, আমি ওই বাঙ্কারটা খতম করে আসছি।" তিনি একাই হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চললেন আগুনের হলকার ভেতর দিয়ে।
রেহাইচরের সেই বাঙ্কারটি ছিল কংক্রিটের তৈরি। সেখান থেকে মেশিনগান দিয়ে অনবরত গুলি চালানো হচ্ছিল। জাহাঙ্গীর অসীম সাহসে একদম বাঙ্কারের কাছে পৌঁছে গেলেন। তাঁর মাথার ওপর দিয়ে তপ্ত বুলেট ছুটে যাচ্ছে, কিন্তু তিনি অবিচল। মুকুল দূর থেকে তাঁর সাহসিকতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলেন।
হঠাত্‍ বিদ্যুৎবেগে উঠে দাঁড়ালেন জাহাঙ্গীর। নিখুঁত নিশানায় তিনি বাঙ্কারের ফোকর দিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে দিলেন। প্রচণ্ড শব্দে বাঙ্কারটি ধ্বংস হয়ে গেল। শত্রুদের গোলাবর্ষণ বন্ধ হলো। মুক্তিযোদ্ধারা উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি বুলেট এসে বিঁধল আমাদের প্রিয় বীরের কপালে।
১৪ই ডিসেম্বর। বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহিদ হলেন। তাঁর রক্তে ভিজে গেল বাংলার মাটি। তাঁর এই আত্মত্যাগের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত হলো। মুকুল তাঁর প্রিয় নেতার নিথর দেহের পাশে বসে রইলেন, কিন্তু তাঁর চোখে তখন বিজয়ের দীপ্তি।
স্বাধীনতার পর সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করে। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর বীরত্বের গল্প বাংলার প্রতিটা ঘরে ঘরে বেঁচে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়া এক পরম গৌরব।

অনেকদিন আগের কথা। ১৯৭১ সাল। বাংলার আকাশ-বাতাস তখন যুদ্ধের গর্জনে উত্তাল। সেই সময় আমাদের দেশে এক তেজস্বী তরুণ ছিলেন, যার ...
07/02/2026

অনেকদিন আগের কথা। ১৯৭১ সাল। বাংলার আকাশ-বাতাস তখন যুদ্ধের গর্জনে উত্তাল। সেই সময় আমাদের দেশে এক তেজস্বী তরুণ ছিলেন, যার নাম হামিদুর রহমান। তাঁর বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর। কিশোর বয়সের চপলতা ছেড়ে তাঁর দুচোখে তখন ছিল দেশমাতার মুক্তির স্বপ্ন। তিনি ছিলেন একজন গর্বিত সিপাহী এবং নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা।
অক্টোবর মাসের এক মেঘলা দিন। মৌলভীবাজারের ধলই সীমান্ত চৌকিটি দখল করা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খুব জরুরি। কিন্তু সেখানে পৌঁছানো ছিল ভীষণ কঠিন কাজ। শত্রুসেনারা মাটির নিচে বাংকার বানিয়ে বসে ছিল। তাদের শক্তিশালী এলএমজি (লাইট মেশিনগান) থেকে বৃষ্টির মতো গুলি আসছিল, যা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না।
কমান্ডার চিন্তিত মুখে বললেন, "শত্রুদের ওই এলএমজি পোস্টটি ধ্বংস করতে না পারলে আমাদের অভিযান সফল হবে না।" চারদিকে তখন গোলার শব্দ আর ধোঁয়া। বিপদ জেনেও হামিদুর বিন্দুমাত্র ভয় পেলেন না। তিনি জানতেন, দেশের জন্য তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে।
"আমি যাবো স্যার!" হামিদুরের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর শুনে সবাই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালো। তিনি ছিলেন দলের সবার ছোট, কিন্তু তাঁর মনের জোর ছিল হিমালয়ের মতো অটল। তিনি ঠিক করলেন, হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুসেনাদের ঠিক নাকের ডগায় গিয়ে গ্রেনেড ছুড়ে মারবেন।
রাত নেমে এলো। ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, মাঝে মাঝে শুধু কামানের আগুনের ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল। হামিদুর পেটে ভর দিয়ে কাদার মধ্য দিয়ে এগোতে শুরু করলেন। শত্রুদের নজর এড়াতে তিনি মাটির সাথে মিশে ধীরলয়ে চলতে লাগলেন।
শরীর যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু হামিদুর থামলেন না। একটু দূরেই দেখা যাচ্ছিল শত্রুসেনাদের সেই মরণঘাতি এলএমজি পোস্ট। সেখান থেকে অনবরত আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে। হামিদুর জানতেন, আর কয়েক গজ গেলেই তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছে যাবেন।

হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগল হামিদুরের শরীরে। অসীম যন্ত্রণা তাঁকে কাবু করতে চাইল, কিন্তু তিনি হার মানলেন না। দেশপ্রেমের টানে তিনি সমস্ত কষ্ট ভুলে গেলেন। শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে তিনি আরও কাছে এগিয়ে গেলেন, ঠিক বাংকারটির কয়েক হাত দূরে।"জয় বাংলা!" বলে এক বিকট চিৎকার দিলেন হামিদুর। তারপর পূর্ণ শক্তিতে হাতের গ্রেনেডটি ছুড়ে মারলেন শত্রুসেনাদের এলএমজি পোস্ট লক্ষ্য করে। এক মুহূর্তের নীরবতা, আর তারপরেই এক বিশাল বিস্ফোরণ! শত্রুসেনাদের সেই মরণঘাতি মেশিনগান স্তব্ধ হয়ে গেল চিরতরে।এলএমজি পোস্ট ধ্বংস হয়েছে দেখে মুক্তিযোদ্ধারা বীরবিক্রমে সামনের দিকে এগিয়ে এলেন। ধলই সীমান্ত চৌকি এখন মুক্ত। কিন্তু আমাদের তরুণ বীর হামিদুর তখন নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। তাঁর কনিষ্ঠতম প্রাণটি দেশের মাটির সাথে মিশে গেছে এক মহান আত্মত্যাগের মহিমায়।বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ছিলেন সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে ছোট। কিন্তু তাঁর সাহস ছিল আকাশচুম্বী। আজ যখন আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তখন যেন আমরা এই আঠারো বছরের তরুণের অসীম ত্যাগের কথা ভুলে না যাই। তিনি আমাদের চিরকালের প্রেরণা।

অনেক বছর আগের কথা। করাচির এক বিশাল বিমানঘাঁটিতে কাজ করতেন মতিউর রহমান। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বৈমানিক। কিন্তু তাঁর মন পড়ে ...
06/02/2026

অনেক বছর আগের কথা। করাচির এক বিশাল বিমানঘাঁটিতে কাজ করতেন মতিউর রহমান। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বৈমানিক। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত হাজার মাইল দূরের সোনার বাংলায়। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, মতিউর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি চাইলেন তাঁর দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে নিজের দক্ষতা কাজে লাগাতে। তিনি মনে মনে এক সাহসী পরিকল্পনা করলেন।মতিউরের ছোট একটি সাজানো সংসার ছিল। তাঁর দুই আদরের মেয়ে আর স্ত্রী মিলি তাঁর সঙ্গেই থাকতেন। একদিন বিকেলে তিনি তাঁর বড় মেয়েকে নিয়ে বারান্দায় বসলেন। তিনি জানতেন, দেশের জন্য তিনি যে কঠিন পথে পা বাড়াচ্ছেন, তাতে হয়তো আর কোনোদিন তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে আসা হবে না। তবুও দেশের স্বাধীনতার ডাক তাঁর কাছে সবকিছুর চেয়ে বড় ছিল।২০শে আগস্ট, ১৯৭১। করাচির আকাশ সেদিন ছিল মেঘমুক্ত। মতিউর ঠিক করলেন, আজই তিনি একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে যাবেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেবেন। তিনি জানতেন এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কিন্তু দেশের মুক্তির জন্য তিনি নিজের জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি রানওয়ের দিকে পা বাড়ালেন।রানওয়েতে তখন একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের জন্য তৈরি ছিল। সেই বিমানে ছিলেন তরুণ পাইলট রশিদ মিনহাজ। মতিউর কৌশলে বিমানের কাছে গেলেন। তিনি রশিদের চোখে চোখ রেখে কথা বললেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলেন। মতিউরের উদ্দেশ্য ছিল বিমানটিকে ছিনতাই করে ভারতের সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া।বিমানটি আকাশে ওড়ামাত্রই শুরু হলো এক প্রবল লড়াই। ককপিটের ভেতরে মতিউর চেষ্টা করছিলেন বিমানটিকে ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দিতে, কিন্তু রশিদ তা হতে দিচ্ছিলেন না। তিনি মতিউরকে বাধা দিতে চাইলেন। দুই বৈমানিকের মধ্যে বিমানের নিয়ন্ত্রণের লাঠি বা জয়স্টিক নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু হলো। বিমানটি আকাশে টালমাটাল হয়ে এদিক-ওদিক দুলতে লাগল।
মতিউর জানতেন হাতে সময় খুব কম। নিচে সিন্ধু নদের তপ্ত মরুভূমি। তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন জয়স্টিকটি নিজের দখলে রাখতে। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন তাঁর দেশের মানুষের কথা, যারা মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছে। তাঁর চোখে ভেসে উঠছিল বাংলার সবুজ ধানক্ষেত আর মেঠো পথ। সেই ভালোবাসাই তাঁকে অসীম সাহস দিচ্ছিল।রশিদ বুঝতে পেরেছিলেন মতিউরকে থামানো সম্ভব নয়। তিনি শেষ চেষ্টায় বিমানটির কন্ট্রোল সিস্টেম অকেজো করে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। মতিউর হার মানার পাত্র ছিলেন না। তিনি জানতেন হয়তো তিনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না, কিন্তু শত্রুর হাতে বিমানটি ফেরত যেতে দেবেন না। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন।ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে সিন্ধু মরুভূমির বালির ওপর তীব্র বেগে আছড়ে পড়ল টি-৩৩ বিমানটি। এক বিশাল আগুনের গোল্লা আর ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেল। মতিউর রহমান নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমির জন্য। তিনি চেয়েছিলেন একটি বিমান নিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই এক অমর ইতিহাস হয়ে গেলেন।আজ বাংলাদেশে মতিউর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। তিনি আমাদের 'বীরশ্রেষ্ঠ'। তাঁর সাহসিকতার গল্প এখন প্রতিটি শিশুর মুখে মুখে। তাঁর ত্যাগ আমাদের শেখায় যে, দেশের চেয়ে বড় আর কিছু নেই। তাঁর নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।সায়ান আর অনিকা তাদের স্কুলের বইয়ে মতিউর রহমানের বীরত্বগাথা পড়ছিল। সায়ান বলল, "দেখ অনিকা, মতিউর রহমান কত সাহসী ছিলেন! আমিও বড় হয়ে তাঁর মতো দেশকে ভালোবাসব।" অনিকা মাথা নেড়ে সায় দিল। জানালার বাইরে তখন নীল আকাশে মুক্ত পাখিরা ডানা মেলে উড়ছিল, যেন মতিউরের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন আজ সার্থক হয়েছে।

১৯৭১ সালের বর্ষাকাল। চারদিকে যুদ্ধের দামামা। তরুণ সাগর যোগ দিয়েছে এক গোপন বাহিনীতে। তারা সাধারণ সৈনিক নয়, তারা জলের বাঘ—...
06/02/2026

১৯৭১ সালের বর্ষাকাল। চারদিকে যুদ্ধের দামামা। তরুণ সাগর যোগ দিয়েছে এক গোপন বাহিনীতে। তারা সাধারণ সৈনিক নয়, তারা জলের বাঘ—নৌ-কমান্ডো। ভারতের এক গোপন শিবিরে চলছে তাদের কঠিন প্রশিক্ষণ। তাদের লক্ষ্য একটাই, মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করা
দিন-রাত চলে সাগরের কঠোর পরিশ্রম। পিঠে ভারী পাথর বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলের নিচে দম ধরে সাঁতার কাটা শিখতে হয় তাকে। সাগরের প্রশিক্ষক ধ্রুব তাকে শেখাচ্ছেন কীভাবে নিঃশব্দে শত্রুর জাহাজের কাছে পৌঁছাতে হয়। ধ্রুবর চোখেমুখে কঠোর শাসন কিন্তু হৃদয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা।
একদিন প্রশিক্ষণের সময় ধ্রুব একটি অদ্ভুতদর্শন যন্ত্র বের করলেন। এটিই বিখ্যাত 'লিম্পেট মাইন'। এটি দেখতে অনেকটা গোল থালার মতো, কিন্তু এর শক্তি অসীম। সাগরের দিকে মাইনটি বাড়িয়ে ধ্রুব বললেন, "সাগর, এটাই হবে তোমাদের প্রধান অস্ত্র। এটি জাহাজের গায়ে চুম্বকের মতো লেগে থাকবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর বিস্ফোরিত হবে।"
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আগস্টের মাঝামাঝি। সাগর এবং তার দলের ওপর দায়িত্ব পড়েছে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে আক্রমণ করার। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রওনা হলো। হাতে অস্ত্র বলতে শুধু ওই লিম্পেট মাইন আর অসীম সাহস। গভীর রাতে তারা বনের পথ ধরে বন্দরের কাছাকাছি পৌঁছালো।
কমান্ডোরা জানতেন, আক্রমণের সিগন্যাল আসবে আকাশবাণী রেডিওর গান শুনে। সাগর আর ধ্রুব একটি ছোট ট্রানজিস্টর রেডিও নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে নদীর ধারের ঝোপের ভেতর। আকাশবাণীর প্রতিটি সুরের দিকে তাদের কান খাড়া। কখন বাজবে সেই বিশেষ গান?
১৪ই আগস্ট সকাল। রেডিওতে হঠাৎ বেজে উঠল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া সেই কাঙ্ক্ষিত গান— "আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি"। এটি ছিল প্রথম সংকেত। এর অর্থ হলো, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করতে হবে। সাগরের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, যুদ্ধের প্রস্তুতি চূড়ান্ত।
১৫ই আগস্ট। রাত তখন প্রায় শেষ। রেডিওতে বেজে উঠল দ্বিতীয় সংকেত— সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান, "আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান"। এর মানে হলো 'আক্রমণ এখনই'। ধ্রুব সাগরের কাঁধে হাত রেখে ইশারা করলেন। সময় এসেছে শত্রুর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার।
ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। সাগর আর তার সাথীরা পিঠে লিম্পেট মাইন বেঁধে নিঃশব্দে নদীতে ঝাঁপ দিল। জোয়ারের টানে তারা ভেসে চলল পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজগুলোর দিকে। জলের ওপর শুধু তাদের মাথার কালো অংশটুকু দেখা যাচ্ছে।
অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাগর একটি বিশাল জাহাজের কাছে পৌঁছাল। সে ডুব দিয়ে জাহাজের নিচে গেল এবং লিম্পেট মাইনটি জাহাজের গায়ে লাগিয়ে দিল। কামড় দিয়ে পিন খুলে সে আবার নিঃশব্দে দূরে সরে যেতে লাগল। এমন সময় বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো বন্দর! একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হলো।
সেই রাতে অপারেশন জ্যাকপটে ধ্বংস হলো শত্রুর অসংখ্য জাহাজ। পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল বীর বাঙালিদের এই নৌ-অভিযান। ১৬ই আগস্ট সকালে যখন সূর্য উঠল, তখন সাগর আর ধ্রুব তীরের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাচ্ছে। পাকিস্তান বাহিনীর সাপ্লাই লাইন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল, স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হলো।

Address

Pouro Sova Mor, Touhid Homio Hall Chuadanga
Chuadanga
720

Telephone

+8801717091975

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Roar Of Bengal posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The School

Send a message to Roar Of Bengal:

Shortcuts

Share