18/01/2025
[এক]
সিরাজ শিকদারকে জুতা মারা নিয়ে অনেকেই ক্ষুদ্ধ। বিভিন্ন দলে থাকা সিরাজ শিকদার ভক্ত রাজনীতিক এবং বুদ্ধিজীবীরা এটা নিয়ে সমালোচনা করছেন। কেন পোলাপাইন সিরাজ শিকদারের গ্রাফিতিতে জুতা মারসে, রঙ মারসে।
বিষয়টা পরিস্কার— মেঘমল্লার বসু বলসে ‘লাল সন্ত্রাস’ করবে। আর তারা লাল সন্ত্রাসের প্রতীক হিসেবে একেই হাজির করে।
ফলে— সন্ত্রাসবিরোধিতার অংশ হিসেবেই এই কাজ করসে। এজন্য পোলাপাইন যতটা না দায়ী, তারচে বেশি দায়ী মেঘমল্লার, যা সে নিজের লাইভেও স্বীকার করছে।
[দুই]
সিরাজ শিকদারের নিজস্ব বয়ান এবং ইতিহাস মতে, সে মুজিব, ইন্ডিয়া, সোভিয়েত এন্ড আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ— ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।
এই লড়াই ছিল সন্ত্রাসবাদী হওয়ায়, এর ফলাফল মোটেও ভাল ছিল না। ৭৩-এর এপ্রিলে শুরু করা মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে ডিরেক্ট যুদ্ধ শুরু করে। তবে এদের টার্গেট কিলিং শুরু হয় ৭২ থেকেই।
৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত সিরাজ শিকদারসহ অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী বামপন্থীদের হাতে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সিভিলিয়ান— যাদেরকেই এরা ‘সাম্যবাদী সমাজ’ প্রতিষ্ঠার বিরোধী মনে করত, তাদেরকেই এরা হত্যা করত।
এদের হাতে ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত কতজন মারা গেছে জানেন? ৫ হাজারেরও বেশি লোক।
[তিন]
অনেকেই বলবেন— এরা মারসে মাত্র ৫ হাজার, মুজিবের রক্ষীবাহিনী মারসে ৩০ হাজার। তবুও আপনাদের কাছে সিরাজ শিকদার খারাপ?
সিরাজ শিকদারকে মূল্যায়ন করবার বিভিন্ন দিক আছে। একদিকে যেমন আমরা তাকে উল্লেখ করতে পারি— মুজিববাদ, সোভিয়েত, আমেরিকা এবং ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে বামপন্থী সশস্ত্র সংগ্রাম, অন্যদিকে সিভিলিয়ান ক্যাজুয়াল্টিজ, হত্যাকাণ্ড এবং খুন-খারাবির বিষয়টা একেবারেই এড়িয়ে যাবার নয়।
সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতি বেছে নেওয়া এজন্যই ক্ষতিকর। আপনি মানুষের মুক্তির নামে অস্ত্র তুলে নেনই শুধু, অপরপক্ষকে আরও ব্রুটাল এবং নির্যাতক হতে সাহায্য করেন। সিরাজ শিকদারই একমাত্র কেইস নয়, যার কারণে মুজিব মানুষ খুনের অজুহাত পেয়ে যায়।
এমন না যে মুজিব মানুষ খুন থেক্ব বিরত থাকত, সে তো বহু আগে থেকেই খুনি। সংসদে মানুষ পিটায়ে মারসে সে, সেই সংসদ সদস্য তো আর সন্ত্রাসবাদী ছিল না।
আমার এই লেখার মূল পয়েন্ট হল— সন্ত্রাসবাদী পদ্ধতি আপনার প্রতিপক্ষকে মানুষ খুনের অজুহাত তুলে দেয়। মুজিব তার সকল রাজনৈতিক বিরোধী, যারা বাকশালে আসে নাই— সবাইকে নকশালী বলে ঘায়েল করত। রক্ষীবাহিনী দিয়ে খুন করাতো। এর শিকার সাধারণ নারী-পুরুষ, শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ— সকলেই হয়েছে।
আমরা সিরাজ শিকদারের সন্ত্রাসী বাহিনীসহ যারাই মুজিবের বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে, তার নিন্দা জানাই। সিরাজ শিকদারকে বিনা ট্রায়ালে হত্যা করা অপরাধ। উই কনডেম ইট!
[চার]
আমাদের সমালোচনার জায়গা সশস্ত্র পন্থা। আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট— জঙ্গীবাদ যে নামেই হোক, বামপন্থী, জাতিবাদী কিংবা ইসলামী— এসবের বিরুদ্ধে আমাদের থাকতে হবে।
এমন কোনো ব্যক্তিকে আইকন হিসেবে সমাজে পরিচিত করানো যাবেনা, যে নিজে ৫ হাজার মানুষ মারসে, সাথে নিজের ৩০ হাজার নিয়ে মরসে।
সিভিলিয়ানদের উপরে, কোনো অপরাধীর উপরেও— যে নামেই হামলা হোক, সেটা বিচারবহির্ভূত এবং এসব কর্মকাণ্ড সর্বতোভাবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। নাগরিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, যেটা সিরাজ শিকদার ও তার বাহিনির মাধ্যমে হয়েছে।
[পাঁচ]
যারা মুজিববাদ বিরোধী ফিগার হিসেবে সিরাজ শিকদারকে হাজির করেন, তাদেরকে বুঝতে হবে— মুজিববাদকে তরান্বিত করায় তার সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের ভূমিকা ছিল।
সে মুজিববাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করসে ঠিক, কিন্তু মুজিবকে সে এম্পাওয়ার করসে তার হাতে কাইন্ড অফ ‘ওয়ার অন টেরর'-এর হাতিয়ার তুলে দিয়ে।
তার লক্ষ্যকে ক্রিটিসাইজ যদি না-ও করি, তার পদ্ধতি— খুন-খারাবি, গুপ্ত হামলা, সিভিলিয়ান লাইভস এন্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস— এসবের সাথে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে চাওয়া ব্যক্তি একমত হতে পারেনা।
[ছয়]
চব্বিশের ৫-ই আগস্টের পরে পুরো বাংলাদেশ চায় একটা ডেমোক্রেটিক প্রক্রিয়া। যেখানে হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, গোলাগুলি থাকবেনা।
সিরাজ শিকদারকে নাহয় পাঠ করলাম মুজিবের অত্যাচার বিরোধী ফিগার হিসেবে। কিন্তু কয়েকদিন আগে, ২০১৯ সালেও এদের অস্তিত্ব কিভাবে গ্রহণ করা যায়?
এমনকি পাঁচই আগস্টের পরে কিভাবে সিরাজ শিকদারকে একজন কী-ফিগার হিসেবে প্রাসঙ্গিক করা যায়, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সকলেই গুরুত্ব দিচ্ছে?
মানলাম— মুজিব অনেক খারাপ ছিল। বর্তমান কন্টেক্সটে সিরাজ শিকদারের বামপন্থী অনুসারী কিভাবে ‘রেড টেরর’ আহবান করে?
এমন সন্ত্রাসবাদের আহবান যখন করা হয়, যখন কয় বছর আগেও এদের অস্তিত্ব ট্রেইস করা গেছে এবং মেঘমল্লার বসু যেখানে বলেছে— যারা রেড টেরর করবার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদেরকে সে চেনে-জানে, সেখানে সিরাজ শিকদারের গ্রাফিতি এই সন্ত্রাসবাদীদের উজ্জীবিত করছে।
[সাত]
সিরাজ শিকদারের গ্রাফিতি দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল ও পাহাড়ে প্রশিক্ষণরত সন্ত্রাসীদের উজ্জীবিত করবে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাঁচই আগস্টের পরে যে অবস্থায় আছে, সেটা মুজিবের বাকশালের চেয়ে ভালো কীনা? যদি তা-ই থাকে, তাহলে সিরাজ শিকদারকে প্রাসঙ্গিক করবার চেষ্টা, রেড টেররের আহবান, মেঘমল্লার কর্তৃক রেড টেরোরিস্টদের হদিস জানা— ইত্যাদি বিষয় কিভাবে মূল্যায়ন করা উচিত?
রেড টেররের আহবান, পাহাড়ে ও দুর্গম অঞ্চলে চলমান সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ— এসব বিষয় পর্যালোচনা করলে একটা সিদ্ধান্তেই আসা যেতে পারে— সিরাজ শিকদারের গ্রাফিতি যতোটা না মুজিবপ্রেমীদের কষ্ট দেবে, তার চেয়েও উজ্জীবিত করবে বামপন্থী সন্ত্রাসবাদীদের।
ঠিক এই দিকটা লক্ষ রেখেই আমাদের সিরাজপ্রেমের বাতির উজ্জ্বলতার লেভেল ঠিক করা উচিত। মনে রাখতে হবে, কন্টেক্সট সেইম নাই, তবুও বামপন্থীরা জঙ্গিবাদের ডাক দিচ্ছে। প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
~ খালিদ মাহমুদ