20/08/2026
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) মীলাদুন্নবী (সা.) বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমন উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করার বৈধতার পক্ষে একটি চমৎকার শরয়ী দলিল (মূলনীতি) উপস্থাপন করেছেন। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.) তাঁর রচিত ‘হুসনুল মাকসিদ ফী আমালিল মাওলিদ’ কিতাবে ইবনে হাজার আসকালানির এই ফতোয়া ও দলিলটি হুবহু উল্লেখ করেছেন。ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মূল দলিল এবং এর বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:১. মূল দলিল: আশুরার রোজা এবং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়াহাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) মীলাদুন্নবী উদযাপনের মূল ভিত্তি খুঁজে পেয়েছেন সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদিস থেকে। হাদিসটি হলো:রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তখন দেখলেন যে ওখানকার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে (আশুরার দিন) রোজা রাখছে। তিনি তাদের এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, "এটি সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে ফেরআউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরআউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই আমরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য এই দিনে রোজা রাখি।" তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, "মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বেশি।" এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।২. দলিলের যৌক্তিক বিশ্লেষণএই হাদিস থেকে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) যে সিদ্ধান্ত বা ইস্তিম্বাত (উপসংহার) টেনেছেন, তা হলো:নিয়ামতের দিনে শুকরিয়া: বছরের নির্দিষ্ট কোনো দিনে আল্লাহ তাআলা যদি কোনো বড় নেয়ামত বা অনুগ্রহ দান করেন, তবে প্রতি বছর সেই দিনটি ফিরে এলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং আনন্দ প্রকাশ করা শরীয়তসম্মত।সবচেয়ে বড় নেয়ামত: ফেরআউনের কবল থেকে মুসা (আ.)-এর মুক্তি পাওয়ার চেয়ে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই পৃথিবীতে আগমন নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত।শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যম: আল্লাহর এই মহান নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করতে যেকোনো ভালো কাজ করা যেতে পারে—যেমন নফল নামাজ, রোজা, সদকা (দান-খয়রাত) এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শানে দরুদ ও তাঁর জীবনীর আলোচনা।হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর কিছু বিশেষ শর্ত ও সতর্কতাতিনি মীলাদুন্নবী সম্পর্কে তাঁর ফতোয়ায় শুধু বৈধতাই দেননি, বরং এটি কীভাবে পালন করা উচিত সে সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দিয়েছেন:উত্তম কাজের মাধ্যমে উদযাপন: মীলাদুন্নবী উপলক্ষে কেবল সেই কাজগুলোই করা যাবে যা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া হিসেবে গণ্য হয়। যেমন: কুরআন তেলাওয়াত, দরিদ্রদের খাবার খাওয়ানো, দান-সদকা এবং নবীজীর প্রশংসামূলক নাত বা কবিতা পাঠ করা, যা মানুষের অন্তরকে আখেরাতমুখী করে।বিদআত ও হারাম বর্জন: তিনি অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে সতর্ক করেছেন যে, এই দিনকে কেন্দ্র করে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ করা যাবে না। যেমন: গান-বাজনা, নাচ, অনর্থক আমোদ-প্রমোদ বা এমন কোনো প্রথা যা ইসলাম সমর্থন করে না। যদি কোনো মিলাদ মাহফিলে এ ধরনের নিষিদ্ধ কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে তা গুনাহের কারণ হবে।সালাফদের অনুসরণই সেরা: তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রথম তিন যুগের (সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগে) ইসলামে এভাবে আনুষ্ঠানিক জন্মদিন পালনের প্রচলন ছিল না। তাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বোত্তম পথ হলো সুন্নাহর পূর্ণ অনুসরণ করা। তবে কেউ যদি কোনো অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড ছাড়া বিশুদ্ধ নিয়তে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এই দিনটি উদযাপন করে, তবে উপরোক্ত হাদিসের আলোকে তা বৈধ।