23/05/2026
বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের নামাজ শিক্ষার প্রস্তুতি।
Education for Islam
23/05/2026
বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের নামাজ শিক্ষার প্রস্তুতি।
খোরাসানের এক ছোট্ট গ্রামে তিন বছর ধরে বৃষ্টি নেই। মাটি ফেটে গেছে। ফসল নেই। কূপের পানি শুকিয়ে আসছে। গরু-ছাগল মরছে। মানুষ শহরে চলে যাচ্ছে একে একে। যারা থেকেছে — তারা থেকেছে কারণ যাওয়ার মতো শক্তি নেই অথবা এই মাটি ছাড়তে পারছে না।গ্রামের মসজিদে একজন বৃদ্ধ ইমাম ছিলেন — নাম শায়খ নূরুদ্দিন। বয়স সত্তরের উপরে। চলতে কষ্ট হয়, কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানো কখনো বাদ দেননি। গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবাসত। কিন্তু এই তিন বছরে কেউ কেউ অভিযোগ করতে শুরু করেছিল — “শায়খ এত দুআ করেন, কিন্তু বৃষ্টি আসে না। কী লাভ?” কেউ কেউ বলত — “হয়তো গ্রামে বড় কোনো পাপ আছে, তাই আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।”
এই কথাগুলো শায়খের কানে যেত। তিনি কিছু বলতেন না। শুধু মাথা নিচু করে হাঁটতেন। কিন্তু রাতে একা ঘরে বসে তিনি ভাবতেন — মানুষ ঠিকই বলছে। হয়তো তাঁর দুআতেই কোনো ঘাটতি আছে। হয়তো তাঁর হৃদয় পরিষ্কার নয়। হয়তো আল্লাহ তাঁর ডাক শুনছেন না। এই ভাবনাগুলো তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
একদিন গ্রামে একজন মুসাফির এলো। নাম তার তাহির। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। পরনে সাধারণ কাপড়, কাঁধে একটি থলে। সে মসজিদে এসে বিশ্রাম নিল। শায়খের সাথে পরিচয় হলো। তাহির জিজ্ঞেস করল — “শায়খ, এই গ্রামে এত শুষ্কতা কেন?” শায়খ বললেন — “তিন বছর ধরে বৃষ্টি নেই।” তাহির বলল — “ইস্তিসকার নামাজ পড়েছেন?” শায়খ বললেন — “অনেকবার।” তাহির বলল — “তাহলে?” শায়খ একটু চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন — “আল্লাহর ইচ্ছা।”
তাহির সেই রাতে মসজিদেই রইল। শায়খ লক্ষ্য করলেন — রাত গভীর হলে তাহির উঠে নামাজ পড়তে শুরু করল। দীর্ঘ নামাজ। তারপর দুআ। শায়খ কাছে যাননি — দূর থেকে দেখেছেন। তাহির এমনভাবে দুআ করছিল — যেন সে কারো সাথে কথা বলছে। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই। কোনো মুখস্থ শব্দের মতো পড়া নেই। একেবারে নিজের ভাষায় — “হে আল্লাহ, এই গ্রামের মানুষগুলো তোমার বান্দা। তারা কষ্টে আছে। তুমি দেখছ। তুমি যদি না দিতে চাও — তোমার অধিকার আছে। কিন্তু তুমি যদি দাও — তোমার রহমত প্রকাশ পাবে। আর তোমার রহমত প্রকাশ পাওয়াই সবচেয়ে সুন্দর।”
শায়খ এই দুআ শুনে থমকে গেলেন। তিনি এতদিন দুআ করেছেন — কিন্তু এভাবে করেননি। তিনি দুআ করেছেন “দাও, দাও, দাও” বলে। কিন্তু তাহির দুআ করল — “তুমি যদি দাও, তোমার রহমত প্রকাশ পাবে।” এই দুটো দুআর মধ্যে একটা বিশাল পার্থক্য আছে। একটা দুআ নিজের জন্য — আরেকটা দুআ আল্লাহর মহিমার জন্য।
পরদিন সকালে শায়খ তাহিরকে জিজ্ঞেস করলেন — “তুমি রাতে এভাবে দুআ করলে কেন? ‘তোমার রহমত প্রকাশ পাবে’ — এই কথাটা কোথা থেকে শিখেছ?” তাহির বলল — “শায়খ, আমরা যখন শুধু নিজের জন্য চাই — তখন দুআটা একটু ছোট হয়ে যায়। কিন্তু যখন বলি — হে আল্লাহ, তুমি দিলে তোমার রহমত প্রকাশ পাবে — তখন দুআটা আর শুধু আমার থাকে না। সেটা আল্লাহর মহিমার সাথে জড়িত হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাঁর মহিমা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন।” শায়খ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। এত বছর ইমামতি করেছেন — কিন্তু এই সহজ কথাটা কেউ কোনোদিন বলেনি।
সেই দিন শায়খ গ্রামের সবাইকে ডাকলেন। মাঠে গেলেন সবাই মিলে। শায়খ বললেন — “আজ আমরা ইস্তিসকার নামাজ পড়ব। কিন্তু আগে আমাদের একটা কাজ করতে হবে।” সবাই জিজ্ঞেস করল — “কী কাজ?” শায়খ বললেন — “যদি কারো সাথে কারো বিরোধ থাকে — এখনই মিটিয়ে নাও। যদি কারো কাছে কারো পাওনা থাকে — এখনই দিয়ে দাও। যদি কেউ কারো উপর অন্যায় করে থাকো — এখনই ক্ষমা চাও।” গ্রামের মানুষ অবাক হলো। এটা তারা আশা করেনি।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর একজন বৃদ্ধ উঠলেন। বললেন — “আমি আমার ভাইয়ের সাথে বিশ বছর ধরে কথা বলি না। জমির বিরোধ নিয়ে।” তিনি ভাইয়ের দিকে হাঁটলেন। দুই ভাই কুড়ি বছর পর একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আরেকজন উঠল — “আমি আমার প্রতিবেশীর সাথে অন্যায় করেছি। তার ফসলের পানি আমি সরিয়ে নিয়েছিলাম।” একে একে মানুষ উঠতে লাগল। পুরনো অভিযোগ, পুরনো রাগ, পুরনো ক্ষত — একে একে বলা হলো, ক্ষমা চাওয়া হলো।
শায়খ দেখলেন — এই মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে তাঁর চোখের সামনে। তিন বছরের খরা শুধু মাটিতে নয় — হৃদয়েও ছিল। মানুষে মানুষে দূরত্ব, অবিশ্বাস, পুরনো রাগ — এগুলোই ছিল আসল খরা। তারপর সবাই মিলে নামাজ পড়ল। শায়খ দুআ করলেন — এবার ভিন্নভাবে। বললেন — “হে আল্লাহ, আমরা তোমার বান্দা। আমরা পাপী। আমরা একে অপরের সাথে অন্যায় করেছি। কিন্তু আজ আমরা ক্ষমা করেছি এবং ক্ষমা চেয়েছি। তুমি দেখেছ। এখন তোমার রহমত আসুক। কারণ তোমার রহমত আসলে তোমার মহিমাই প্রকাশ পায়।”
সেই বিকেলে আকাশ মেঘলা হলো। রাতে বৃষ্টি এলো। প্রথমে আস্তে আস্তে। তারপর জোরে। গ্রামের মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ সিজদায় পড়ে গেল মাটিতে। শায়খ মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলেন। তাহির পাশে এসে দাঁড়াল। শায়খ বললেন — “বৃষ্টি এলো।” তাহির বলল — “বৃষ্টি আগেই আসত। শুধু পথটা বন্ধ ছিল।” শায়খ জিজ্ঞেস করলেন — “কোন পথ?” তাহির বলল — “হৃদয়ের পথ। মানুষে মানুষে যখন দেওয়াল থাকে — আল্লাহর রহমতও যেন আটকে যায়। আজ দেওয়ালগুলো ভাঙল। বৃষ্টি এলো।”
পরদিন সকালে তাহির চলে গেল। শায়খ তাকে থাকতে বললেন। তাহির বলল — “আমার যাওয়ার আছে। আরো গ্রাম আছে। আরো মানুষ আছে।” শায়খ বললেন — “তুমি কে?” তাহির হাসল। বলল — “একজন মুসাফির। যে শিখতে শিখতে চলে।” শায়খ বললেন — “তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে গেলে।” তাহির বলল — “আপনি জানতেন শায়খ। শুধু মনে ছিল না।” শায়খ জিজ্ঞেস করলেন — “কী জানতাম?” তাহির বলল — “যে আল্লাহর রহমত পেতে হলে আগে মানুষের সাথে সম্পর্ক ঠিক করতে হয়। উপরে হাত তোলার আগে পাশের মানুষের হাত ধরতে হয়।”
শায়খ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন তাহিরের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে। বৃষ্টিতে ভেজা মাটির গন্ধ আসছে। দূরে মাঠে সবুজের একটু আভাস দেখা যাচ্ছে। শায়খ মনে মনে বললেন — “আল্লাহ, তুমি কত উপায়ে শেখাও। কখনো কিতাবে, কখনো কষ্টে, কখনো একজন মুসাফিরের মুখ দিয়ে।” তারপর ঘুরে মসজিদের দিকে হাঁটলেন। ফজরের আজান হয়ে গেছে। মানুষ আসছে। আজ তাদের মুখে হাসি আছে। তিন বছর পর।
“আল্লাহর রহমত পেতে হলে আগে নিজের হৃদয় পরিষ্কার করো। মানুষের সাথে সম্পর্ক ঠিক করো। কারণ যে হৃদয়ে অভিযোগ আছে — সেই হৃদয় দিয়ে দুআ করলে দুআ ভারী হয়ে যায়। আর হালকা হৃদয়ের দুআ সরাসরি আরশে পৌঁছায়।”
— ইমাম ইবনুল জাওযি রহ., আল-লাতাইফ
“তোমরা একে অপরকে ক্ষমা করো। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?”
— সূরা আন-নূর, ২৪:২২
“রহমান যারা, তাদেরকে রহমান আল্লাহ ভালোবাসেন। তোমরা পৃথিবীর মানুষদের প্রতি দয়া করো — আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।”
— সুনানে তিরমিযি, হাদিস: ১৯২৪ — সনদ সহিহ
সূত্র: আল-লাতাইফ ফিল ওয়াআজ, ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ (৫০৮–৫৯৭ হি.)
সংকলিত গল্প
কপি:ইসলামের সরল পথ©️
14/05/2026