দারুল হিকমাহ - darul hikmah

দারুল হিকমাহ - darul hikmah

Share

এটি একটি ইসলামিক দাওয়াহ বিষয়ক পেইজ।

07/10/2024

সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স‌ম্মেল‌নে এমন বক্তারাই আম‌ন্ত্রিত হওয়া উচিত, যা‌দের জীব‌নের পর‌তে পর‌তে সীরা‌তে রাসূ‌লের নূ‌র জ্বলজ্বল কর‌ছে! যা‌দের জীব‌নের নানা অঙ্গন ও প্রাঙ্গন সুন্না‌তে রাসূ‌ল দ্বারা সুস‌জ্জিত। যা‌দের আচার-আচরণ, আমল-আখলা‌ক সী‌রা‌তের খুশবু‌ সুর‌ভিত ক‌রে! এমন হলে তা হত এক‌টি বাস্তব সীরাত স‌ম্মেলন, যেখা‌নে নববী সীরা‌তের প্রদর্শনী হত। মানুষ দে‌খে, শু‌নে বু‌ঝে হা‌তে কল‌মে সীরা‌তে তা'লীম গ্রহণ কর‌তো! দুর্ভাগ‌্যক্রমে উম্মাহর মা‌ঝে এমন 'জীবন্ত সীরাত' পাওয়া শুধু ক‌ঠিনই নয়, ব‌রং সুক‌ঠিন ব‌্যাপার!

য‌দি এমন 'নমুনা‌য়ে রাসূল' পাওয়া না-‌যায়, তা হ‌লে যারা স‌ম্মেল‌নে বয়ান-বক্তৃতা কর‌বেন, তারা ম‌ঞ্চে থাকাকালীন এবং বয়ানচলাকালীন কাজগু‌লি অন্তত নবী‌জির সীরা‌তের আলো‌কে কর‌া উচিত ম‌নে ক‌রি। যেন শ্রোতা-দর্শকেরা তার আলাপ-আলোচনায়, আমল-আচর‌ণে কিছুটা হ‌লেও সীরাতের ঝলক দেখ‌তে পায়! অন্তত নবীজীব‌নের কো‌নো একটা দিক তার আচর‌ণে প্রতিফ‌লিত হওয়া উচিত। এতটুকুও না-হ‌লে এসব সীরাত স‌ম্মেল‌নের স্বার্থকতা কী?

সীরাত স‌ম্মেল‌নের ম‌ঞ্চে 'কানা ব‌গির ছা...ওই ব‌গি তুই খাস‌ কি...' জাতীয় কৌতুকআব‌ৃ‌ত্তি, বিপক্ষের মুস‌লিম ভাইবন্ধু‌দের নি‌য়ে তুচ্ছ-তা‌চ্ছিল‌্য ও অভ‌দ্রো‌চিত আচার-আচরণ করা, লোক হাসা‌নোর জন‌্য আজগু‌বি ও বা‌নোয়াট কথাবার্তা বলা নবী‌জির অনুপম আদ‌র্শের প্রতি‌নি‌ধিত্ব ক‌রে না! এতে প্রিয় নবী‌জি সা.- কষ্ট পান এবং তাঁর উসওয়া‌কে খাট করা হয়। আল্লাহ আমা‌দের ক্ষমা করুন!
আমা‌দের জীব‌নে ও আমা‌দের দাঈদের জীব‌নে সীর‌তে রাসূ‌ল যতবে‌শি জীবন্ত হ‌য়ে ওঠ‌বে, ততই ইসলা‌মের বিজয় তর‌ন্বিত হ‌বে! এর আগে সবই ম‌রিচীকা ও আকাশকুসুম কল্পনা!

10/07/2024

ফিতনার যু‌গে ফিতনা থে‌কে বাঁচার কতেক উপায় ও নববী আমল

এখন ফিতনার যুগ। কিয়ামত যত ঘনায়মান হ‌বে, ততই ফিতনা বৃ‌দ্ধি পা‌বে। বৃ‌ষ্টির মত টপটপ ক‌রে ফিতনা ঝর‌তে থাক‌বে। ফিতনার কার‌ণে ঈমা‌নের ওপর টি‌কে থাকা ক‌ঠিন হ‌য়ে পড়‌বে। সকা‌লের মু‌মিন সন্ধায় কা‌ফির হ‌য়ে যা‌বে। সন্ধার মু‌মিন সকা‌লে কা‌ফির হ‌য়ে যা‌বে। মানু‌ষের কা‌ছে দীন ও ঈমা‌নের গুরুত্ব ক‌মে যা‌বে। যেকার‌ণে সামান‌্য তুচ্ছ দু‌নিয়ার জন‌্য দীন বি‌ক্রি ক‌রে দি‌বে।

কিন্তু ফিতনা থে‌কে বাঁচার উপায় কি?
নবী‌জি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাত‌কে তা ব‌লে গে‌ছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামকে সতর্ক করেছেন। ফিতনা থেকে আত্মরক্ষার বিভিন্ন আমল তি‌নি বাত‌লে দিয়েছেন। হাদীসের ভাণ্ডার থেকে এখানে কয়েকটি আমল উল্লেখ করা হলো।

১. নি‌জে‌কে যথাসম্ভব গু‌টি‌য়ে রাখা। ‌অহেতুক ব‌হিঃর্মুখী স‌ক্রিয়তা বর্জন করা। ‘‌দে‌খি কি হ‌চ্ছে’, এমন উৎসুকভাব ও চঞ্চলতা প‌রিহার করা। নবী‌জি সা. ব‌লে‌ছেন :

" سَتَكُونُ فِتَنٌ الْقَاعِدُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْقَائِمِ، وَالْقَائِمُ فِيهَا خَيْرٌ مِنَ الْمَاشِي، وَالْمَاشِي فِيهَا خَيْرٌ مِنَ السَّاعِي ، وَمَنْ يُشْرِفْ لَهَا تَسْتَشْرِفْهُ، وَمَنْ وَجَدَ مَلْجَأً أَوْ مَعَاذًا فَلْيَعُذْ بِهِ ".
শীঘ্রই ফিতনারাশি আসতে থাকবে। ঐ সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম (নিরাপদ), দাঁড়ানো ব্যক্তি চলমান ব্যক্তি হতে অধিক রক্ষিত আর চলমান ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে অধিক বিপদমুক্ত। যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে চোখ তুলে তাকাবে ফিতনা তাকে গ্রাস করবে। তখন যদি কোন ব্যক্তি তার দ্বীন রক্ষার জন্য কোন ঠিকানা অথবা নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করাই উচিৎ হবে। (বুখারী : ৩৬০১)

এজন‌্য কোথাও ফিতনা সংঘ‌টিত হ‌তে দেখ‌লে সে‌দি‌কে চোখ তু‌লেও তাকা‌বে না। বি‌শেষক‌রে সাধারণ মানুষ। যারা ফেতনার আশঙ্কা ক‌রেন, তারা ফেসবুক, টুইটার ইউটিউব তথা অনলাইন এক্টিভিটি পরিহার করা উচিত।

২. যথাসম্ভব নি‌জে‌কে গৃহে আবদ্ধ রাখ‌া। জরু‌রি সংসা‌রিক প্রয়োজ‌ন এবং দী‌নি প্রয়োজ‌ন ছাড়া ঘর থে‌কে বের হ‌বে না। ‌যেমন হা‌লাল রু‌জি সংগ্রহ, ব‌্যবসা, কৃ‌ষি, চাকু‌রি, মস‌জি‌দে জামাআতে নামায পড়া, ইলম শেখা ও শিক্ষাদান করা ও দীন প্রচার করার কা‌জে বের হ‌তে পার‌বে। অ‌হেতুক বাজা‌রে বা রাস্ত‌াঘা‌টে ঘুর ঘুর কর‌বে না। দোকা‌নেপা‌টে আড্ডাবা‌জি কর‌বে না। যে যতবেশি বাইরের ঘুরাঘুরি বর্জন করে ঘরে আবদ্ধ থাকবে, সে ততবেশি ফিতনামুক্ত থাকবে।

৩. যথাসম্ভব মুখবন্ধ রাখ‌া, তথা চুপ থাকা। কো‌নো বিষ‌য়ে অ‌হেতুক মন্তব‌্য কর‌া থেকে বিরত থাকা। মুখের গুনাহই মানুষকে সবচে বেশি ফিতনায় ফেলে। ‌বি‌শেষক‌রে বিবাদমান বিষ‌য়ে অনর্থক মন্তব‌্য কর‌‌তে যাবে না। যেবিষয় তার নয়, সে বিষয়ে কমেন্ট করবে না।

৪. নি‌জের গুনাহর ওপর তাওবা ইস্তিগফার ও কান্নাকা‌টি কর‌‌তে থাকা। অ‌ন্যের দোষত্রু‌টি খোঁজার চাইতে নি‌জের কৃত পাপ নি‌য়ে অ‌ধিক চি‌ন্তা করা। অন‌্যকে কা‌ফির মুশ‌রিক বলার আগে নি‌জের ঈমানের ওপর শ‌ঙ্কিত থাকা।

হযরত উকবা ইব‌নে আমের রা‌যি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাস ক‌রে‌ছি‌লেন, ফিতনার যু‌গে আত্মরক্ষ‌ার উপায় কি? তখন নবী‌জি সা. ইরশাদ ক‌রে‌ছেন :
امْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ ". هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ.
তোমার যবান বন্ধ রাখ, তোমার ঘ‌রে নি‌জে‌কে আবদ্ধ রাখ, তোমার গুনাহর ওপর কান্না কর। (তির‌মিযী : ২৪০৬)

৫. প্রত্যেহ রা‌তের বেলা ঘুমা‌নে‌ার পূ‌র্বে সুরা ইখলাস ৩বার, সূরা ফালাক ৩বার, সূরা নাস ৩বার পড়‌বে। সম্ভব হ‌লে তা প‌ড়ে হা‌তে দম ক‌রে সারা শরীর মু‌ছে নি‌য়ে গা বন করা। (মুসনা‌দে আহমাদ : ১৭৩৩৪)
সূরা ফালা‌কে জাগ‌তিক ফিতনা থে‌কে বাঁচার তা‌বিজ আছে। “সূরা নাস’ ঈমা‌নি ফিতনা থে‌কে বাঁচার তা‌বিজ।

৬. ফিতনা নি‌য়ে অ‌গ্রিম অ‌ধিক চিন্তা না ক‌রে বরং তার আগে বে‌শি বে‌শি নেক আমলে মাশগুল থাক‌া। কারণ, ফিতনায় আক্রান্ত হওয়ার পর আমল করার সু‌যোগ হাতছাড়া হ‌য়ে যে‌তে পা‌রে। আমলে ব্যস্ত লোককে ফিতনা আক্রমণ করার সুযোগ পায় না।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : " بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا، وَيُمْسِي كَافِرًا - أَوْ : يُمْسِي مُؤْمِنًا، وَيُصْبِحُ كَافِرًا - يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا ".

“নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব‌লে‌ছেন, অন্ধকা‌র রা‌তের মত ফিতনা দেখা দেওয়ার আগে দ্রুত আমল ক‌রে নাও! যখন মানুষ সকা‌লে মু‌মিন থাক‌বে, কিন্তু বিকা‌লে কা‌ফির হ‌য়ে যা‌বে। ‌অথবা সন্ধা কর‌বে ঈমা‌নের সা‌থে, কিন্তু রাত পোহা‌তেই সে কা‌ফির হ‌য়ে যা‌বে। তখন তুচ্ছ দু‌নিয়ার জন‌্য এরা দীন বি‌ক্রি ক‌রে দি‌বে। (সহীহ মুস‌লিম : ১১৮)

৭. সর্বদা অযুর হাল‌তে থাকা। কষ্ট হওয়া স‌ত্ত্বেও ভা‌লোভা‌বে অযু করা।
৮. মস‌জি‌দকে‌ন্দ্রিক জীবনযাপন করা। এবং মস‌জি‌দে বে‌শি বে‌শি গমন করা।
৯. একনামায শেষ ক‌রে আরেক নামা‌যের অ‌পেক্ষায় থাকা।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : " أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا يَمْحُو اللَّهُ بِهِ الْخَطَايَا وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ ؛ إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ ".
হযরত আবু হুরাইরা রা‌যি. ব‌লেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক‌দিন আমা‌দের জিজ্ঞাস কর‌লেন, আমি কি এমন আমল তোমা‌দের ব‌লে দিব, যা তোমা‌দের পাপরা‌শি মু‌ছে দি‌বে এবং তোমা‌দের মর্যাদা বৃ‌দ্ধি কর‌বে? লে‌া‌কেরা বলল, অবশ‌্যই। তখন নবী‌জি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব‌লেন, তা হ‌লো ভা‌লোভা‌বে অযু করা, মস‌জি‌দে অ‌ধিক গমন করা, নামায শে‌ষে আরেক নামা‌যের অ‌পেক্ষা করা। এটাই সীমান্ত প্রহরা, এটাই সীমান্ত প্রহরা, এটাই সীমান্ত প্রহরা। (সুনান নাসাঈ : ১৪৩)
মুহাক্কিকগণ হাদীসটি দুটি অর্থ করেছেন। এক. এই আমলগু‌লো দ্বারা সীমান্ত প্রহরার মত সওয়াব পাওয়া যা‌বে।
দুই, এর দ্বারা নি‌জের দী‌নের হেফাজত হ‌বে, যেভা‌বে রিবাত দ্বারা মুস‌লিম দে‌শের সীমানা হেফাজত হ‌য়।

১০. নিয়‌মিত সূরা কাহফ তেলাওয়াত কর‌বে, অন্তত জুমুআর দিন। সূরা কাহ‌ফের প্রথম বা শেষ ১০আয়াত মুখস্ত রাখ‌বে। (সহীহ মুস‌লিমসূ‌ত্রে তারগীব : ২১৭৫, ২১৭৬)

১১. কুরআন ও সুন্নাহ‌কে মজবুতভা‌বে আঁক‌ড়ে ধর‌া এবং বিদআত‌কে বর্জন করা। জ্ঞান অর্জনে ও জীবনযাপ‌নে এ দুই জি‌নিস‌কে সর্বদা প্রাধান‌্য দেওয়া। সুন্নাহর বাইরে যে‌কোন বিদআত ও ভিন্ন লাইফস্টাইল পূর্ণ প‌রিহার করা। কারণ, তা ঝুঁ‌কিপূর্ণ, য‌দিও সেটা জা‌য়িয হোক। (তা‌রগীব ওয়াততারহীব : ৬৩)

১২. বিদ্যমান ইমাম ও জামাআত‌বদ্ধতাকে আঁক‌ড়ে থাক‌া, য‌দি মুসলমা‌ন‌দের একক ইমাম ও অ‌ভিন্ন খেলাফত থা‌কে। (আবু দাঊদ : ৪৬০৭, তারগীব : ৫৮)

১৩. য‌দি সেরূপ ইমাম ও খেলাফত না থা‌কে, বরং মুসলমানেরা বি‌ভিন্ন দ‌লে বিভক্ত হ‌য়ে প‌ড়ে, তা হ‌লে অপেক্ষাকৃত কো‌নো হক জামাআতের সাথে যুক্ত থাক‌বে, যতক্ষণ না তারা পরস্পর দলাদ‌লি‌তে লিপ্ত হয়। কারণ, জামাআতবদ্ধতা একা‌কিত্ব থে‌কে অ‌নেক বে‌শি নিরাপদ।
عَلَيْكُمْ بِالجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الِاثْنَيْنِ أَبْعَدُ، مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الجَنَّةِ فَلْيَلْزَمُ الجَمَاعَةَ،
তোমরা জামাআতকে আঁকড়ে ধরবে এবং বিচ্ছিন্নতা হতে বেঁচে থাকবে। কারণو শয়তানেএকাকী লোককে পিছু নেয়। এবং দুজন থেকে দূরে থাকে। যে ব্যক্তি জান্নাতে সুপ্রশস্ত জীবন প্রত্যাশীو সে যেন জামাআকে আঁকড়ে ধরে। (তিরমিযী : ২১৬৫)

১৪. য‌দি কো‌নো হক জামাআত না পায়, কিংবা দলাদ‌লির কার‌ণে চিন‌তে না পা‌রে, তা হ‌লে ব‌্যক্তিগত জীব‌নে সুন্নাহমুতা‌বেক জীবযাপনকারী এবং সত‌্যপন্থী কো‌নো বিজ্ঞ আলিম বা কো‌নো নেক বান্দার সুহব‌তে থাক‌বে, এবং তার পরামর্শ মত চল‌বে, এবং লোকালয়েই অবস্থান কর‌বে।

য‌দি নিজ এলাকায় উপ‌রিউক্ত বিষয়গু‌লো পাল‌নে অক্ষম হয়, নি‌জের দুর্বলতার কার‌ণে অথবা প‌া‌রিপা‌শ্বিকতার কার‌ণে, এবং সেখা‌নে সে নি‌জে‌কে ফিতনা থে‌কে নিরাপদ ম‌নে না ক‌রে, তা হ‌লে সে সক্ষম হ‌লে দুই জায়গায় কো‌নো একজায়গায় হিজরত কর‌বে-
১৫. এক. কোথাও য‌দি ইসলামী ইমারাহ থাকে, অথবা যেখা‌নে নিজ অঞ্চলের তুলনায় দীন পালনের অ‌ধিক সু‌যোগ-সু‌বিধা থা‌কে এবং নি‌জের দীন ও জীবন‌কে সেখা‌নে অ‌ধিক নিরাপদ ম‌নে ক‌রে। এটা যেমন নিজ দে‌শের ভিন্ন অঞ্চল হ‌তে পা‌রে, তেম‌নি পৃ‌থিবীর অন‌্যকোথাও হ‌তে পা‌রে, যেখা‌নে কুফ‌রের তা‌পের চাইতে দী‌নের শীতল ছায়া বে‌শি। চাই সেখা‌নে পূর্ণ ইসলামী ইমা]রাহ থাকুক বা নাই থাকুক।

১৬. দুই. য‌দি হানাহানিপূর্ণ নাগ‌রিকসভ‌্যতার জীবন ক‌ঠিন হ‌য়ে যায়, এবং একাকী জীবন‌কে ‌নি‌জের জন‌্য অ‌ধিক নিরাপদ ম‌নে করে, তা হ‌লে কিছু মেষ-ছাগল ও অন্য কোনো জীব‌নোপকরণ নি‌য়ে একেবা‌রে পাহা‌ড়ে বা কো‌নো উপত‌্যকায় চ‌লে যা‌বে। সেখা‌নে আজীবন ইবাদত ব‌ন্দেগী‌তে কা‌টি‌য়ে দি‌বে যতক্ষণ না তার মৃত‌্যু আসে। এভা‌বেই সে নি‌জে‌কেও ‌নিরাপদ কর‌বে এবং অন‌্যদেরকে নিজের কষ্ট থে‌কে মু‌ক্তি দি‌বে। (সহীহ মুসলিম : ২৮৮৭)
أَلَا، فَإِذَا نَزَلَتْ أَوْ وَقَعَتْ، فَمَنْ كَانَ لَهُ إِبِلٌ فَلْيَلْحَقْ بِإِبِلِهِ، وَمَنْ كَانَتْ لَهُ غَنَمٌ فَلْيَلْحَقْ بِغَنَمِهِ، وَمَنْ كَانَتْ لَهُ أَرْضٌ فَلْيَلْحَقْ بِأَرْضِهِ "

ত‌বে হিজর‌তে পদ‌ক্ষেপ নেওয়ার আগে যথাসম্ভব কো‌নো‌ বিজ্ঞ রাব্বানী আলি‌মের পরামর্শ নি‌বে।

১৭. এগু‌লোর কোন‌টিই য‌দি ক‌ার্যকর করা সম্ভব না হয়, এবং আমর বিল মারূফ ও না‌হি আনিল মুনকার তথা দাওয়াহব‌্যবস্থা পু‌রোপু‌রি অকার্যকর হ‌য়ে প‌ড়ে, এবং সমা‌জে দুষ্ট‌লোক‌দের প্রভাবপ্রতিপ‌ত্তি নিরঙ্কুষভা‌বে প্রতি‌ষ্ঠিত হ‌য়ে যায়, তা হ‌লে নি‌জ নিজ এলাকায় একাকী জীবনযাপন কর‌বে। অ‌ন্যের সা‌থে লড়াই ঝগড়া পূর্ণ ত‌্যাগ করবে। লড়াইয়ে যেন উদ্রেক না হয়, তজ্জ‌ন্যে তলোয়ার ভে‌ঙে ফেল‌বেو এবং নিরীহ নির্বিবাদ জীবনযাপন করতে চেষ্টা করবে। এভাবে মুসলিমদের পরস্পর যুদ্ধবিগ্রহের ফিতনা থেকে বাঁচতে চেষ্টা করবে। (সহীহ মুসলিম : ২৮৮৭)
قَالَ فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ أَرَأَيْتَ مَنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ إِبِلٌ وَلَا غَنَمٌ وَلَا أَرْضٌ؟ قَالَ: «يَعْمِدُ إِلَى سَيْفِهِ فَيَدُقُّ عَلَى حَدِّهِ بِحَجَرٍ، ثُمَّ لِيَنْجُ إِنِ اسْتَطَاعَ النَّجَاءَ،
ত‌বে এখ‌নো সেই ফিতনাসংকুল যুগ আসে‌নি। আল্লাহ তাআলা এমন যুগ থে‌কে আমা‌দের হেফাজত করুন। আমীন!

নোট : এটি এ সংক্রান্ত অধ‌মের ব‌্যক্তিগত অধ‌্যয়‌নের সার‌নির্যাস। য‌দি কো‌নো অসংগ‌তি সু‌ধী পাঠ‌কের নজ‌রে প‌ড়ে, তা হ‌লে জানা‌লে কৃতজ্ঞ থাক‌বো।

মুহাম্মাদ সাইফুদ্দীন গাজী
দারুল হিকমাহ, চৌমুহনী, নোয়াখালী
০৬,০৭,২৪

27/06/2024

“ইলম অন্বেষণের অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধাপ। এটি সম্পন্ন হয় উসতাদদের তত্ত¡াবধানে। তবে এ স্তরকে ভিত্তি ছাড়া কিছুই বলা যায় না। মনে করুন, একজন লোক একটি সুউচ্চ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করে মনে মনে একটি ম্যাপ তৈরী করল। ম্যাপ অনুযায়ী ভিত্তি স্থাপন করে সেগুলো সমতল ভূমি থেকে কিছুটা উঁচু করল। এতটুকু পরিশ্রমের পর যদি সে ভেবে বসে যে, আমার তো ভবন নির্মাণ সমাপ্ত হয়ে গেছে; তা হলে এ লোকের বুঝা উচিত ভবনের যতটুকু নির্মিত হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির কারণে সে ভিত্তিগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং চিরকাল নির্মাণকারীর ভীরুতা ও হীনমন্যতার শিক্ষাপ্রদ নিদর্শন হয়ে থাকবে।

ঠিক একই অবস্থা ওইসকল সম্ভাবনাময় তালিবে ইলমের, যে মাদরাসার-শিক্ষা সমাপ্ত করার পর মনে করে, আমি তো আলিম হয়ে গেছি। এসব ছাত্ররা মূলত নিজেদের প্রোজ্জ্বল সম্ভাবনাকে গলাটিপে হত্যা করে স্বীয় শিক্ষকমÐলী ও আপনজনদের অন্তরে আক্ষেপের কঠিন দাগ টেনে দিল।”

মাওলানা হাবীবুর রহমান শেরওয়ানী রহ.
উলামায়ে সালাফ ও দৃষ্টিহীনদের ইলমচর্চা, পৃষ্ঠা-১৩

28/03/2024

মা, মা, মা, বাবা

: তোমার ঘর পুড়ে গেছে, তারপরেও দেখি তুমি হাসছ?
: ঘুর পুড়লে কী হয়েছে, আমার মা’ তো এখনো জীবিত আছে...।

কী অসাধারণ অনুভূতি! কী অনন্য অভিব্যক্তি!! ভালোবাসার কী গভীর প্রকাশ!!!
এ জায়গায় দাাঁড়িয়ে মায়ের প্রতি এই অনুভূতি আমরা ক’জন প্রকাশ করতে পারবো, যা এই ছোট্ট মেয়েটি প্রকাশ করেছে?
এমন স্নিগ্ধ নির্মল হাসি কী আমরা কজন হাসতে পারবো, যা ছোট্ট শিশুটি হেসেছে?
কংক্রিটসভ্যতার আলীশান ভবনে বসবাসকারী মানুষগুলো কি পারবে, যা পেরেছে বস্তির কুড়েঘরে বসবাসকারী এই মেয়েটি? পারবে দেশবিদেশে উচ্চশিক্ষা বড়াইকারী মানুষেগুলো, যা পেরেছে এই নিরক্ষর ‘মুর্খ’ মেয়েটি?

করোনার দুযোর্গকালে শহরের আধুনিক মানুষগুলো কী পেরেছে? পারলে কী আর মা-বাবাকে লোকদিয়ে টেনে হেঁচড়ে ঘর থেকে বের করে শুধু হুযুর দিয়ে দাফন করাতো?
যদি পারতো, তা হলে কি আর বৃদ্ধ মা-বাবাকে জীবনের শেষকালে সভ্যতার অভিশাপ বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসতে, আর নিজের বৌ নিয়ে আরামসে ঘুর ঘুর করতে? যেখানে মা ও বাবার কলিজার টুকরা সন্তানের পথপানে চেয়ে থাকে, আমার বাবা যদি একটু আসে! কিন্তু তাদের অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না, যদিও তার জীবন শেষ হয়ে যায়। অথচ এই সন্তানকে তিলে তিলে গড়ে তুলতে মা ও বাবার জীবনটাই না নিঃশেষ হয়ে গেছে। সন্তানের আরামের জন্যই তো তাদের জীবনপ্রদীপের সলতে শুকিয়ে গেছে।

বস্তুত, আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতা বড় নিষ্ঠুর, নির্মম। কথিত উচ্চশিক্ষা জ্ঞানবিজ্ঞান আমাদের চরম স্বার্থবাদী অর্থবাদী বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের মানবিক সুকুমার কেড়ে নিয়ে গেছে। আমাদের আবেগ ভালোবাসা অনুভূতি ও সুস্থচিন্তাকে নষ্ট করে দিয়েছে। একাডেমিক শিক্ষা আমাদের চরম যুক্তিবাদী স্বার্থবাদী বানিয়ে দিয়েছে, যেখানে আমাদের মা-বাবা ও আপনজনদের প্রতি যথাসময়ে যথাযথ অনুভূতি প্রকাশ করতে দেয় না। যেকারণে নানা হিসাবের মারপেঁচে পরজন হয়ে আছে আপন; আর নিখাদ আপনজন হয়ে পড়েছে পর। মা-বাবা হয়ে গেছে বোঝা।

মানুষের প্রাকৃতিক ও মানবিক অনুভূতি যদি এখনো ঠিক থাকে, অথবা কিছুটা অক্ষুণ্য থাকে, সেটা আছে গ্রামের সহজসরল মানুষগুলোর মধ্যে।
আছে নিরক্ষর নিম্নশ্রেণীর লোকদের মাঝে, যাদেরকে আধুনিক শিক্ষা কলুষিত করতে পারেনি।
আছে আল্লাহভীরু দীনদার মানুষের মধ্যে; যাদেরকে আধুনিক স্বার্থসভ্যতা কাবু করতে পারেনি।
পূর্ণমাত্রায় আছে চুনসুরকির সভ্যতা থেকে দূরে বসবাসকারী এই নিষ্পাপ শিশুদের মধ্যে। শিশুরাই পারে সব হারিয়েই মায়ের জন্য এমন নির্মল হাসি উপহার দিতে। তারাই পারে মায়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে। তারাই বোঝে মায়ের ওজন ও কদর। তারাই বোঝে মা হারানো বেদনা, যেভাবে বুঝে মা বেঁচে থাকার গুরুত্ব। আমরা বুড়োরা হয়ত সেটি যথাযথ অনুধাবন করতে পারি না। যারা পেরেছে, তারা ভাগ্যবান ও মহান।
আল্লাহ তাআলা মেয়েটির মা-কে বাঁচিয়ে রাখুন। বাঁচিয়ে রাখুন আমাদের মা’দেরকেও। আমাদের মা-বাবা যেখানেই থাকুন, তাদেরকে আল্লাহ সুখে রাখুন। বেঁচে থাকে তো সুস্থ ও সুন্দর রাখুন। মরে গিয়ে থাকলে আল্লাহ তাঁর আশ্রয়ে সুখী রাখুন। রাব্বিরহাম হুমা কামা রাব্বায়ানী সাগীরা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমাদের মা-বাবার জন্য চক্ষুশীতলকারী বানিয়ে দিন, আমাদের সন্তানদেরকেও আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন। সেসাথে আল্লাহ তাআলা মেয়েটিকে সর্বপ্রকার অনিষ্টতা ও ফিতনা থেকে রক্ষা করুন, যার ছোট্ট অভিব্যক্তি হাজারো মানুষের জ্ঞান চক্ষু খুলে দিয়েছে, সহস্র সন্তানের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে।

বেঁচে থাক হে মেয়ে, ভালো থেকো!

16/11/2023

নোয়াখালীর সোনালী অতীত, অধঃমুখি বর্তমান এবং কিছু কথা

[নোয়াখালীর প্রাচীনতম দেওটি হেমায়াতুল ইসলাম কাওমী মাদরাসা শতবার্ষিকী সম্মেলন স্মারকে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ স্মারকটি সংগ্রহ করতে পারেন। আজ ও কাল মাদরাসার শতবার্ষিকী মহাসম্মেলন। দারুল উলূম দেওবন্দ ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম তাশরীফ আনছেন।]

দীন ইসলামের প্রচার-প্রসারে এবং দীনী শিক্ষা বিস্তারে জেলা হিসাবে নোয়াখালীর যে সুনাম-সুখ্যাতি, ঐতিহ্য ও অবদান রয়েছে, তা বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলার নেই। নোয়াখালী বলতে বর্তমান লক্ষীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও সন্দীপকে বুঝানো হয়েছে; যা একসময় অভিন্ন ছিল। এ অঞ্চলের দাঈ মুবাল্লিগ, আলিম মুআল্লিম ও পীর মাশায়েখের কীর্তি ও অবদান সর্বজন স্বীকৃত। আপনি যে অঞ্চলেই যাবেন, সেখানেই নোয়াখালীর আলিমদের কোনো-না-কোনো অবদান-স্মারক খুঁজে পাবেন। এমন বহুলোকের সাক্ষাত পাবেন, যারা আপনাকে বলবে- আমাদের শিক্ষক ছিলেন নোয়াখালীর...। আমাদের এই মকতব মাদরাসা বা মসজিদ পরিচালনা করতেন নোয়াখালীর হুযুর...। আমি কুরআন পড়েছি, নামায শিখেছি নোয়াখালীর হুযুরের কাছে...। আমার বাপ-দাদাদের উস্তাদ ছিলেন নোয়াখালীর মৌলভী সাব...ইত্যাদি।” উভয় বাংলা, আসাম, ত্রিপুরার তৃণমূল মুসলিম সমাজে দীন ও ইলম চর্চায় নোয়াখালীর উলামায়ে কেরাম ও দীনদারদের শ্রমসাধনা, ত্যাগ ও কুরবানী অবিস্মরণীয়।
শুধু তৃণমূল পর্যায়ে নয়, বরং দীনী দাওয়াহ ও ইসলাহ, ইলম ও তা’লীম এবং সিয়াসত ও রাজনীতির জাতীয় পর্যায়েও কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন নোয়াখালীর আলিমগণ। তারা এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইতিহাসের মহানায়ক রূপে বরিত হয়েছেন।

আপনি জানেন কি-
ইংরেজ ও শিখবিরোধী জিহাদের মহান সিপাহসালার সাইয়েদ আহমাদ বেরলভী রহ.’র খাস খলীফা ও সহযোদ্ধা ছিলেন নোয়াখালীর মাওলানা গাজী ইমামুদ্দীন রহ.। গাজীয়ে বালাকোট ইমামুদ্দীন রহ.-এর মাধ্যমে সেই পবিত্র জিহাদে নোয়াখালীর সামান্য হলেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে গাজী ইমামুদ্দীন সাহেব নিজ দেশে নোয়াখালীতে ফিরে আসেন এবং দাওয়াহ, ইসলাহ ও সংস্কারের মহান সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিশুদ্ধ দাওয়াহ ও ইসলাহী তৎপরতায় নোয়াখালীতে বিশুদ্ধ তাওহীদ প্রসার লাভ করেছিল এবং শিরক-বিদআতমুক্ত দীনের পবিত্র আবহ ও পরিবেশ গড়ে ওঠেছিল। নোয়াখালী সদর থেকে মেঘনার তীর পর্যন্ত মধ্য ও পশ্চিম নোয়াখালী ছিল তাঁর প্রধান মেহনতের ময়দান।
সাইয়েদ সাহেবের আরেক খলীফা, গাজী ইমামুদ্দীন রহ.-এর পীরভাই হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী রহ.-এর দাওয়াহ ও ইসলাহের অন্যতম ময়দান ছিল এই বৃহত্তর নোয়াখালী। তিনিও নোয়াখালীবাসীকে এতটা আপন করে নিয়েছিলেন যে, এখানেই তিনি বিয়ে করেন এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তাজদীদ ও সংস্কারের কার্য পরিচালনা করেছিলেন। স্মরণাতীতকালের মধ্যে নোয়াখালীর বিশুদ্ধ দীনী পরিবেশ কায়েমে এই মহান দুই মুজাহিদ মুজাদ্দিদের অবদান সবচেয়ে বেশি মনে করা হয়। তাঁদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার বদৌলতে নোয়াখালীতে শিরকের আখড়া গড়ে ওঠতে পারেনি এবং মাজারপূজা পীরপূজা মাথাছাড়া দিতে পারেনি।
উজানীর ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক ও ইলমী খান্দানের পিতৃপুরুষ কারী ইবরাহীম রহ.-এর মূল বাড়িও নোয়াখালীতে। চাঁদপুরের উজানীতে হিজরত করার আগে তাঁর মূলবাড়ি ছিল চাটখিলের দৌলতপুরে। বাংলাদেশে ইলমে কেরাতকে তিনি নতুন প্রাণ দান করেছিলেন এবং তাজবীদ চর্চায় নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার নতুন শোনিতধারা সৃষ্টি হয়, যারা বর্তমানে ইলম ও ইসলাহের আকাশে ধ্রæবতারা হয়ে চারিদিকে আলো ছড়াচ্ছে। বিখ্যাত চরমোনাইয়ের আধ্যাত্মিক ধারাও উজানী সিলসিলার উপশাখা। বড় কারী সাহেব রহ.-এর বংশে বর্তমানে কত সংখ্যক আলিম, কারী, মুফতী, মুআল্লিম, দাঈ, মুবাল্লিগ, মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ, পীর ও মুসলিহ রয়েছেন, তা গননা করা কঠিন। তিনি ছিলেন কুতবে আলম হযরত রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহ. এর আজাল্ল খলীফা ছিলেন। মাত্র সতের দিনেই তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার নির্দিষ্ট মাকাম অতিক্রম করেন এবং শাইখের ইজাযত ও খেলাফত লাভ করেন।

হাকীমুল উম্মাহ মুজাদ্দিদুল মিল্লাহ আশরাফ আলী থানভী রহ. এর কয়েকজন খাস খলীফার বাড়ি এই নোয়াখালীতে। ফেনী শর্শদি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা নুর বখস সাহেব রহ. ছিলেন হযরত থানভী রহ.-এর ‘খুলাফায়ে আহাদা আশারা কাওকাবের’ তা ‘একাদশ নক্ষত্র’র অন্যতম। ফেনী অঞ্চল ও দক্ষীণ-পূর্ব কুমিল্লায় দীনী শিক্ষা বিস্তারে হযরত নূর বখশ রহ. ও তাঁর শাগরিদদের অবদান অনস্বীকার্য।
নোয়াখালীর দমদমার মাওলানা কোব্বাদ রহ. ছিলেন হযরত থানভীর অন্যতম খলীফা। তিনি যেমন ছিলেন বিজ্ঞ আলিম, তেমনি ছিলেন আশিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবীজির সা.-এর শানে তিনি ‘আহমাদুল আরব’ নামে বিখ্যাত আরবী কাসীদা লিখে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন। নোয়াখালীতে বহু মাদরাাসা মসজিদের তিনি প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তবে তাঁর প্রধান দাওয়াহ ও ইসলাহী কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে তাঁর হাজার হাজার ভক্ত অনুসারী রয়েছে। সেখানে তিনি বহু মসজিদ-মাদরাসা-মকতব প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেখানেই তিনি সমাহিত হন।
লক্ষীপুর বটতলীর মাওলানা আবদুল আজীজ জনাবওয়ালা রহ. ছিলেন হযরত থানভী রহ.-এর খাস খলীফা। পশ্চিম নোয়াখালীতে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজকে বিদআত-শিরক মুক্ত করণে হযরত জনাবওয়ালা ও তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা অনন্য। তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন রায়পুরের মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ রহ., যিনি উজানীর বড় কারী সাহেবের জামাতা।

বাংলাদেশের প্রথম ‘শাইখুল হাদীস’ উপাধি ধারণ করেন এবং হাদীসের মসনদে বরিত হন যিনি, তিনি ছিলেন নোয়াখালীর? স›দ্বীপ নিবাসী হযরতুল আল্লামা মাওলানা সাঈদ আহমাদ রাহ. ছিলেন বাংলার প্রথম শাইখুল হাদীস। তাঁর মাধ্যমেই বাংলাদেশে দাওরায়ে হাদীসের দরস আরম্ভ হয়। তিনি দীর্ঘকাল যাবত দারুল উলূম হাটহাজারীর হাদীসের মসনদ অলঙ্কৃত করে রাখেন। পরে তিনি হাটহাজারীস্থ চারিয়া মাদরাসায় হিজরত করেন এবং সেখানে হাদীসের দরস কায়েম করেন।
শুধু তাই নয়, দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন আমাদের বড় মুহাদ্দিস সাহেব হুযুর রহ.। তিনিই প্রথম বাঙ্গালী আলিম, যিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য হওয়ার সম্মান ও সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম বাঙ্গালী শিক্ষকও ছিলেন নোয়াখালীর এক কৃতি সন্তান। বেগমগঞ্জের মিরালীপুর গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা নুরুল্লাহ রহ. ছিলেন সেই মহান ব্যক্তি। তিনি দারুল উলূমে পড়ালেখা করেন এবং দারুল উলূমে আদব ও বালাগাতে শিক্ষকতা করেন। বিশেষকরে আরব ও আফ্রিকার ছাত্রদের তিনি আরবী সাহিত্য পড়াতেন। আরবী উর্দূ ও ফার্সী ভাষায় তিনি আদিব পর্যায়ের আলিম ছিলেন। আরবী গদ্য ও পদ্যে তাঁর সমান সক্ষমতা ছিল।

জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের খতীব ছিলেন নোয়াখালীর মুফতী আবদুল মুইজ্জ রহ.। দীর্ঘকাল তিনি এ আসন অলঙ্কৃত করে রাখেন। তিনি ছিলেন হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর খলীফা লক্ষীপুর বটতলীর ‘জনাবওয়ালা’ হযরতের সুযোগ্য পুত্র।
দাওয়াত ও তাবলীগের মুরুব্বীদের অন্যতম ছিলেন মাওলানা লুৎফুর রহমান রহ. এবং মাওলানা মুনির রহ.। প্রথমজনের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে, আর দ্বিতীয়জনের বাড়ি বেগমগঞ্জের আমানতপুরে। বর্তমানেও তাবলীগের অধিকাংশ শীর্ষ মুরুব্বীও নোয়াখালী অঞ্চলের। হাফিজ মাওলানা যুবাইর সাহেব, মাওলানা রবিউল হক সাহেব, মাওলানা নূরুর রহমান সাহেব, মাওলানা জাফর সাহেব- এঁরা সকলেই নোয়াখালীর অধিবাসী।

বাংলার ইসলামী রাজনীতির আকাশে ধুমকেতু হয়ে যিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং উজ্জ্বল আলোকপ্রভায় রাজনীতির আকাশকে উদ্ভাসিত করেছিলেন, তিনি হলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইসলামী রাজনীতির উত্থান ও জাগরণ ঘটে, ইতিপূর্বে যা ছিল অঘোষিত নিষিদ্ধ। তিনি ছিলেন ইসলামী রাজনীতির পথিকৃৎ, তাঁর নির্মিত পথ ধরে এবং দেখানো নির্দেশনা অনুসারে বর্তমানে ইসলামী রাজনীতি একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ এবং আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের বাড়ি নোয়াখালী লক্ষীপুরের রায়পুর থানার লুধুয়া গ্রামে।

বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের কুরআন তাফসীরের প্রাণপুরুষ ছিলেন খতীবে আজম হাবীবুল্লাহ মিসবাহ রহ.। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কুরআনের সহীহ তাফসীর ও জীবনঘনিষ্ঠ ব্যাখ্যা পেশ করা ধারা চালু করেন তিনি। তিনি মসজিদে ও মাঠে সপ্তাহ মাসব্যাপী তিনি তাফসীরের ধারা জারি করেন। নোয়াখালীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মসজিদে মসজিদে তাফসীর মাহফিলকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাফসীর মাহফিলকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে হযরত মিসবাহ রহ. এর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন হযরত মাওলানা মুস্তাফা আল হুসাইনী রহ., যিনি কুমিল্লা’র বাসিন্দা হলেও নোয়াখালীতেই জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে গেছেন। ‘তাজুল ওয়ায়েজীন’ মাওলানা কাসেম হাজিপুরী রহ.-এর তিনি ছাত্র ও জামাতা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থেকেই তিনি ওয়াজ করা শিখে ছিলেন।

মাওলানা কাসেম হাজিপুরী রহ. ছিলেন বিখ্যাত ওয়ায়েজ ও বক্তা। নোয়াখালী কুমিল্লার পরে তিনি সবচেয়ে বেশি বয়ান করেছিলেন সিলেট অঞ্চলে। এখনো ওদিকে তাঁর বহু ভক্ত-অনুরক্ত রয়েছে। ফেনীর কোনো এক মাহফিলে তাঁকে ‘তাজুল ওয়ায়েজীন’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ‘হাদীসের তত্ত¡ ও ইতিহাস’ গ্রন্থে মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আজমী রহ. এ তথ্য লিখেছেন।
মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আজমী রহ. ছিলেন একজন ইসলামিক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, গবেষক, অনুবাদক ও সাহিত্যিক। তিনি মিশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ করাসহ বহু গ্রহন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁর রচিত ‘হাদীসের তত্ত¡ ও ইতিহাস’ গ্রন্থটি হাদীসের ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় এক অনন্য সংযোজন। ফেনী সিলোনিয়া ‘বেকের বাজারে’র পাশেই এই মহান সাধক সমাহিত আছেন।

এগুলো কয়েকটি উদারহণ মাত্র। ইলম, ইসলাহ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নোয়াখালীর উলামায়ে কেরামে নেতৃত্বদানের কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। অন্যথা বাংলাদেশে ইসলামের প্রচারপ্রসার ও বিকাশে এবং দীনী অঙ্গনে নেতৃত্বদানে নোয়াখালীর উলামায়ে কেরামের কীর্তি অবদান ও কুরবানী লিখে শেষ করার মত নয়। এটি এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা ও ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য। নোয়াখালী একদিকে আরব ও আজমের দাঈ ও বুযুর্গদের শ্রমসুধার বরকত ও নেকদৃষ্টি লাভ করে সমৃদ্ধিশালী হয়েছিল, অপরদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশানুসারে দীনের শিক্ষা ও দাওয়াত সারা জমীনে ছড়িয়ে দেওয়ার নিমিত্ত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ভারতবর্ষে আরব বণিক দাঈদের প্রথম মনযিলগুলোর একটি এ ‘সানী আরব’ নোয়াখালী। মধ্য এশিয়ার আরবী ফারসী দাঈদের সাথে সাথে বহু ‘সাইয়েদ’ তথা আহলে বাইতের দাঈগণ এখানে আগমন করেছিলেন এবং এখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন। হায়দারগঞ্জের সাইয়েদ পরিবার তাদের মধ্যে অন্যতম। বাদশা শরীফ হোসাইনের যুগে হাফিয তহা মক্কী রহ. এখানে তাশরীফ এনেছিলেন এবং এখানেই থিতু হয়েছিলেন। রায়পুরের মাওলানা আবদুল্লাহ রহ.-এর বাড়ির সম্মুখে তাঁর কবর রয়েছে। তাঁর বিদুষী কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.। ফুরফুরা ও জৈনপুরের বুযুর্গগণ এখানে বহুকাল ধরে দাওয়াতের কাজ করে গেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। আকাবিরে হিন্দ ও দারুল উলূম দেওবন্দের সাথে নোয়াখালীর সম্পর্ক ছিল সরাসরি। ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদরাসা দারুল উলূম দেওবন্দের সরাসরি তত্ত¡াবধানে পরিচালিত হতো। দেওবন্দ থেকেই এখানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হত। দারুল উলূমে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র ছিলেন রায়পুরের মাওলানা আবদুল্লাহ রহ.। তিনি শাইখুল হিন্দের খাস শাগরিদ ছিলেন। এভাবেই ইলম ও আধ্যাত্মিকতার, দাওয়াত ও আযীমতের শোনিতধারা নোয়াখালীতে প্রবেশ করেছিল। নোয়াখালীবাসীও সেই আমানত সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ করা গেছে, দীনী ও ইলমী ক্ষেত্রে নোয়াখালীবাসী সেই আগের মত আবদান রাখতে পারছে না। দানী ময়দানে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বদানে সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে না, যেভাবে রেখেছিল তাদের পূর্বপুরুষগণ। যেখানে একসময় তারা অন্যদের পথের দিশারী ছিল, বর্তমানে তারা নিজেরাই যেন পথের ভিখারী। শুধু তাই নয়, দীন পরিপালনে এবং ধর্মীয় অনুশাসনে নোয়াখালীবাসীর যে সুনাম-সুখ্যাতি ছিল, তা বর্তমানে অনেকটাই ¤্রয়িমান। নামাযে অলসতা, পর্দা-পুশিদায় শিথিলতা ব্যাপকহারে দেখা দিয়েছে। একসময় যেখানে দিনের বেলা নারীদের রাস্তায় দেখা বিরল ছিল, এখন মেয়েরা অহরহ পর্দালঙ্ঘন করে পথে ও বাজারে বের হচ্ছে। সালাম-কালাম, সামাজিক আদব-কায়দা ও ভদ্রতা-সভ্যতায় যেখানে নোয়াখালীবাসী অনিন্দ্য উপমা ছিল, সেখানে উঠতি তরুণদের অভদ্র আচরণ চোখে পড়ার মত। তরুণদের প্রকাশ্যে ধুমপান, গানবজনা বাজানো এখন সাধারণ দৃশ্য। যেখানে নোয়াখালীর সাধারণ দীনমজুরও অন্যদের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা রাখতো, সেখানে বহু মাদরাসাপড়–য়া (এক্ষেত্রে কাওমীর চাইতে আলিয়ার অবস্থা গুরুতর) এমন আছে, যাদের পেছনে নামায পড়া কঠিন। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, মুআমালা মুআশারার নীতি-নৈতিকায়ও নোয়াখালীবাসী অনেক পিছিয়ে পড়েছে। একসময় সারাদেশে নোয়াখালীর হুযুররাই যেখানে ঘুরে ঘুরে বয়ান করে বেড়াতেন এবং মানুষদের হেদায়েত করতেন; আজ বাইরের বক্তা না-আনলে নোয়াখালীর মাহফিল জমে না। নোয়াখালীর মাহফিল-দাঈদের সংখ্যা বহুলাংশে কমে গেছে। এককথায়, দীন পরিপালন ও দীনী দাওয়াহ ও শিক্ষাপ্রদানে নোয়াখালীবাসীর যে সোনালী ইতিহাস ও গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল; তা এখন সে পর্যায়ে নেই। যদিও বহু অঞ্চল থেকে নোয়াখালীবাসী এখনো অনেক ভালো রয়েছে। ব্যক্তিগত পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে দীন পালনে যেমন নোয়াখালীবাসী পিছিয়ে পড়েছে, তেমনি দীনী শিক্ষা, দাওয়াহ ও রাজনীতির ময়দানে নেতৃত্বদানে ব্যর্থ হচ্ছে; যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এর কারণ কি? এই অধঃমুখিতার হেতু কি? নোয়াখালীর বর্তমান নেতৃত্ব এবং তরুণ প্রজন্মকে এ প্রশ্নের জবাব বের করতে হবে এবং তদানুযায়ী সংশোধনী ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্মিলিত ও ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা সময়ের একান্ত দাবী।

একথা চিরসত্য- আল্লাহ তাআলাই জাতির মধ্যে উত্থান ও পতন ঘটান এবং তিনিই সকল পরিবর্তনের অধিপতি। তিনিই জাতিসমূহের মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে অদল-বদল করেন, জাতির জয়-পরাজয়ের মধ্যে আবর্তন করেন। ইরশাদ করেন :
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ.
“আর আমি দিনগুলোকে মানুষের মাঝে পালাক্রমে আবর্তিত করতে থাকি।” (সূরা আলে ইমরান : ১৪০)

কিন্তু আল্লাহর কোনো কাজই হিকমতহীন নয় এবং কোনো পরিবর্তনই অকারণে নয়। মানুষর কর্মগুণ বা কর্মদোষেই মানুষের জীবনে উত্থান-পতন ঘটে এবং মানুষের ইতিহাসে পরিবর্তন আসে। ইরশাদ করেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَالٍ.
“নিশ্চয় আল্লাহ কোনও জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে...।” (সূরা রা’দ : ১১)
সুদিন থেকে দুর্দিনে পতিত হওয়ার কারণ নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন। সেই দুর্দিন থেকে সুদিনে ফিরতে চাইলে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সুদিনকে যদি তার যথাযথ কদর ও মূল্যায়ন করা না-হয় এবং তার কৃতজ্ঞতা ও কর্তব্য পূরণ করা না-হয়, তখনই দুর্দিন আসতে আরম্ভ করে। আবার যখন দুর্দিনে পতিত হয়, তারপর যদি আত্মোপলব্ধি ফিরে আসে এবং তাওবা, সংশোধনী গ্রহণ করে, তখন আবার আল্লাহর ইচ্ছায় সুদিন আসতে আরম্ভ করে। বনী ইসরাইলসহ পূর্বেকার বহু জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী ও কার্যকারণ কুরআন মাজীদে বিধৃত হয়েছে। নিজেদের বদ-আমলের কারণেই বনী ইসরাইল ফেরাউনের কবলে পড়েছিল। আবার মূসা আ.-এর তরবিয়ত ও সংশোধনী গ্রহণের পর ফেরাউন থেকে মুক্তি পেয়েছিল এবং তাদের সম্মান মর্যাদা, খেলাফত ও কর্তৃত্ব ফিরে এসেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ .
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অজ্ঞতাবশত মন্দকাজ করে ফেলে, তারপর তাওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়; তবে আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সূরা আনআম : ৪৮)
একথায়, নিজেদের মধ্যে সামগ্রিক পরিবর্তন এবং সংশোধনীগ্রহণের মাধ্যমে নোয়াখালীবাসী আবার নিজেদের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারে। ফিরে আসতে পারে ইলম ও ইসলামের নেতৃত্বের আসনে। এর আগে এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনুভব-উপলব্ধি, আলাপ-আলোচনা বাড়াতে হবে। অধঃমুখিতার কারণ নির্ণয় করতে হবে এবং তদনুযায়ী সুনিদিষ্ট কর্মসূচি ও কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে।
তবে এ অধঃমুখিতার কারণগুলো কী কী, তার সমাধান কী, পরবর্তীতে কী কী সংস্কার ও সংশোধনী কীভাবে গ্রহণ করতে হবে, তা আমাদের বিজ্ঞ আকাবির ও দূরদর্শী মুরুব্বীগণ ভালো বলতে পারবেন। অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণকে তাঁদের শরণাপন্ন হয়ে জেনে নেওয়া মুনাসিব মনে করি। একজন তালিবে ইলম হিসাবে অধমও বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আকাবির ও মুরুব্বীদের মতামতগুলো একত্র করে পরবর্তীতে সংকলন তৈরি করার আশা রাখি, ইনশা আল্লাহ। ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।

মুহাম্মাদ সাইফুদ্দীন গাজী
দারুল হিকমাহ
চৌমুহনী, নোয়াখালী
১৮/১০/২৩

15/11/2023

চুড়ান্ত নিরাশার প‌রেই আল্লাহর নুসরত আসে!

ফি‌লি‌স্তি‌নে গণহা‌রে মুস‌লিম ভাইবোন ও টুনটুনে শিশুরা শহীদ হ‌চ্ছে। এ নির্মমতার ধারা বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যা‌চ্ছে না। প্রকা‌শ্যে কো‌নো মুস‌লিম রাষ্ট্র এগি‌য়ে আস‌ছে না। ও‌দের খাবার নেই, পা‌নি নেই। ওষুধ নেই। হাসপাতাল নেই। থাকার জন‌্য নিরাপদ কো‌নো জায়গা নেই। নেই নেই যেন কিছু নেই। এদি‌কে আবার প্রাকৃ‌তিক দু‌র্যোগ দেখা দেওয়ার সংবাদ বে‌রি‌য়ে‌ছে। প্রবল বর্ষণে ঘরবা‌ড়ি ধ‌সে যা‌চ্ছে। অস্থায়ী তাবু‌তে ওরা মান‌বেতর জীবনযাপন কর‌ছে। ‌জমীনবাসীর মত যেন আসমানবাসী বিরূপ আচরণ করছে। এ এক চরম নৈরা‌শ‌্যমুহূর্ত। হতাশায় মন ভে‌ঙে যাওয়ার সময়। চা‌রি‌দিক যেন অন্ধকার আর অন্ধকার।
না, নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। হতাশায় ভে‌ঙে পড়ার সু‌যোগ নেই। এখনই সময় শক্ত হওয়ার। আপন মিশ‌নে অটল অ‌বিচল থাকার। এখনই সময় আল্লাহর দি‌কে পূর্ণ ম‌নোযোগী হওয়ার। তার সাহায‌্য চে‌য়ে অ‌পেক্ষা করার।
কারণ, চরম নৈরা‌শ্যের প‌রেই আল্লাহর নুসরত আস‌তে আরম্ভ ক‌রে। ঘন আধা‌ঁরের প‌রেই আলো ফুট‌তে শুরু ক‌রে। হার‌তে হার‌তেই চুড়ান্ত বিজয় দেখা দিতে শুরু ক‌রে। এটাই আল্লাহর সুন্নাত। তাঁর অ‌মোঘ নী‌তি। হকবা‌তি‌লের চুড়ান্ত লড়াইয়ে তি‌নি একাই বিজয়ী কর‌তে চান, বা‌হ্যিক কারও সাহায‌্য ছাড়া। আমরা সে মুহূ‌র্তে আছি, ইনশাআল্লাহ।
পড়ুন পষ্ট কুরআনের ভাষায়-

اَمۡ حَسِبۡتُمۡ اَنۡ تَدۡخُلُوا الۡجَنَّۃَ وَ لَمَّا یَاۡتِکُمۡ مَّثَلُ الَّذِیۡنَ خَلَوۡا مِنۡ قَبۡلِکُمۡ ؕ مَسَّتۡہُمُ الۡبَاۡسَآءُ وَ الضَّرَّآءُ وَ زُلۡزِلُوۡا حَتّٰی یَقُوۡلَ الرَّسُوۡلُ وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مَعَہٗ مَتٰی نَصۡرُ اللّٰہِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ نَصۡرَ اللّٰہِ قَرِیۡبٌ ﴿۲۱۴﴾

"তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনও তোমাদের কাছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের মত অবস্থা আসেনি ? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত-কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সংগী-সাথী ঈমানদারগণ বলে উঠেছিল, ‘আল্লাহ্‌র সাহায্য কখন আসবে’? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্‌র সাহায্য অতি নিকটে।" [সূরা বাকারাহ : ২১৪]

হাঁ, সাহায‌্য আল্লাহর অ‌তি নিক‌টে। এতে এক‌বিন্দু স‌ন্দেহ নেই। তার প্রতিশ্রু‌তি চিরসত‌্য।
কা‌জেই আগের চে বে‌শি দুআ কর‌তে থাকুন। তা‌দের কাতা‌রে শরীক হওয়ার, কিংবা সাহায‌্য পাঠা‌নোর চেষ্টা করুন। পরস্পর ঝগড়া‌বিবাদ ছে‌ড়ে ফি‌লি‌ন্তি‌নি ভাইদের প্রতি ম‌নোযোগী হোন। চিন্তার কিবলা এখন তৃতীয় কিবলা‌র দিকে করুন। মু‌মি‌নের ‌ফিকর ও তাওয়াজ্জু‌হতেও অ‌নেক শ‌ক্তি র‌য়ে‌ছে। ইনশাআল্লাহ, বিজয় মুসলমান‌দেরই হ‌বে। ভাই আবু উবায়দাহ বার্তা পা‌ঠি‌য়ে‌ছেন- সমগ্র উম্মাহ‌কে জা‌নি‌য়ে দাও, ময়দান আমা‌দের হা‌তে।

নাসরুম মিনাল্লা‌হি ওয়াফাতহুন কারীব! ওয়াবাশশি‌রিল মু‌মিনীন!

Want your school to be the top-listed School/college in Chittagong?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Category

Telephone

Address

স্টেশন রোড, চৌমুহনী, নোয়াখালী
Chittagong