16/11/2023
নোয়াখালীর সোনালী অতীত, অধঃমুখি বর্তমান এবং কিছু কথা
[নোয়াখালীর প্রাচীনতম দেওটি হেমায়াতুল ইসলাম কাওমী মাদরাসা শতবার্ষিকী সম্মেলন স্মারকে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ স্মারকটি সংগ্রহ করতে পারেন। আজ ও কাল মাদরাসার শতবার্ষিকী মহাসম্মেলন। দারুল উলূম দেওবন্দ ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম তাশরীফ আনছেন।]
দীন ইসলামের প্রচার-প্রসারে এবং দীনী শিক্ষা বিস্তারে জেলা হিসাবে নোয়াখালীর যে সুনাম-সুখ্যাতি, ঐতিহ্য ও অবদান রয়েছে, তা বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলার নেই। নোয়াখালী বলতে বর্তমান লক্ষীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও সন্দীপকে বুঝানো হয়েছে; যা একসময় অভিন্ন ছিল। এ অঞ্চলের দাঈ মুবাল্লিগ, আলিম মুআল্লিম ও পীর মাশায়েখের কীর্তি ও অবদান সর্বজন স্বীকৃত। আপনি যে অঞ্চলেই যাবেন, সেখানেই নোয়াখালীর আলিমদের কোনো-না-কোনো অবদান-স্মারক খুঁজে পাবেন। এমন বহুলোকের সাক্ষাত পাবেন, যারা আপনাকে বলবে- আমাদের শিক্ষক ছিলেন নোয়াখালীর...। আমাদের এই মকতব মাদরাসা বা মসজিদ পরিচালনা করতেন নোয়াখালীর হুযুর...। আমি কুরআন পড়েছি, নামায শিখেছি নোয়াখালীর হুযুরের কাছে...। আমার বাপ-দাদাদের উস্তাদ ছিলেন নোয়াখালীর মৌলভী সাব...ইত্যাদি।” উভয় বাংলা, আসাম, ত্রিপুরার তৃণমূল মুসলিম সমাজে দীন ও ইলম চর্চায় নোয়াখালীর উলামায়ে কেরাম ও দীনদারদের শ্রমসাধনা, ত্যাগ ও কুরবানী অবিস্মরণীয়।
শুধু তৃণমূল পর্যায়ে নয়, বরং দীনী দাওয়াহ ও ইসলাহ, ইলম ও তা’লীম এবং সিয়াসত ও রাজনীতির জাতীয় পর্যায়েও কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন নোয়াখালীর আলিমগণ। তারা এসব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইতিহাসের মহানায়ক রূপে বরিত হয়েছেন।
আপনি জানেন কি-
ইংরেজ ও শিখবিরোধী জিহাদের মহান সিপাহসালার সাইয়েদ আহমাদ বেরলভী রহ.’র খাস খলীফা ও সহযোদ্ধা ছিলেন নোয়াখালীর মাওলানা গাজী ইমামুদ্দীন রহ.। গাজীয়ে বালাকোট ইমামুদ্দীন রহ.-এর মাধ্যমে সেই পবিত্র জিহাদে নোয়াখালীর সামান্য হলেও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে গাজী ইমামুদ্দীন সাহেব নিজ দেশে নোয়াখালীতে ফিরে আসেন এবং দাওয়াহ, ইসলাহ ও সংস্কারের মহান সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিশুদ্ধ দাওয়াহ ও ইসলাহী তৎপরতায় নোয়াখালীতে বিশুদ্ধ তাওহীদ প্রসার লাভ করেছিল এবং শিরক-বিদআতমুক্ত দীনের পবিত্র আবহ ও পরিবেশ গড়ে ওঠেছিল। নোয়াখালী সদর থেকে মেঘনার তীর পর্যন্ত মধ্য ও পশ্চিম নোয়াখালী ছিল তাঁর প্রধান মেহনতের ময়দান।
সাইয়েদ সাহেবের আরেক খলীফা, গাজী ইমামুদ্দীন রহ.-এর পীরভাই হযরত মাওলানা কারামত আলী জৈনপুরী রহ.-এর দাওয়াহ ও ইসলাহের অন্যতম ময়দান ছিল এই বৃহত্তর নোয়াখালী। তিনিও নোয়াখালীবাসীকে এতটা আপন করে নিয়েছিলেন যে, এখানেই তিনি বিয়ে করেন এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তাজদীদ ও সংস্কারের কার্য পরিচালনা করেছিলেন। স্মরণাতীতকালের মধ্যে নোয়াখালীর বিশুদ্ধ দীনী পরিবেশ কায়েমে এই মহান দুই মুজাহিদ মুজাদ্দিদের অবদান সবচেয়ে বেশি মনে করা হয়। তাঁদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার বদৌলতে নোয়াখালীতে শিরকের আখড়া গড়ে ওঠতে পারেনি এবং মাজারপূজা পীরপূজা মাথাছাড়া দিতে পারেনি।
উজানীর ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক ও ইলমী খান্দানের পিতৃপুরুষ কারী ইবরাহীম রহ.-এর মূল বাড়িও নোয়াখালীতে। চাঁদপুরের উজানীতে হিজরত করার আগে তাঁর মূলবাড়ি ছিল চাটখিলের দৌলতপুরে। বাংলাদেশে ইলমে কেরাতকে তিনি নতুন প্রাণ দান করেছিলেন এবং তাজবীদ চর্চায় নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার নতুন শোনিতধারা সৃষ্টি হয়, যারা বর্তমানে ইলম ও ইসলাহের আকাশে ধ্রæবতারা হয়ে চারিদিকে আলো ছড়াচ্ছে। বিখ্যাত চরমোনাইয়ের আধ্যাত্মিক ধারাও উজানী সিলসিলার উপশাখা। বড় কারী সাহেব রহ.-এর বংশে বর্তমানে কত সংখ্যক আলিম, কারী, মুফতী, মুআল্লিম, দাঈ, মুবাল্লিগ, মুহাদ্দিস, ওয়ায়েজ, পীর ও মুসলিহ রয়েছেন, তা গননা করা কঠিন। তিনি ছিলেন কুতবে আলম হযরত রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহ. এর আজাল্ল খলীফা ছিলেন। মাত্র সতের দিনেই তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার নির্দিষ্ট মাকাম অতিক্রম করেন এবং শাইখের ইজাযত ও খেলাফত লাভ করেন।
হাকীমুল উম্মাহ মুজাদ্দিদুল মিল্লাহ আশরাফ আলী থানভী রহ. এর কয়েকজন খাস খলীফার বাড়ি এই নোয়াখালীতে। ফেনী শর্শদি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা নুর বখস সাহেব রহ. ছিলেন হযরত থানভী রহ.-এর ‘খুলাফায়ে আহাদা আশারা কাওকাবের’ তা ‘একাদশ নক্ষত্র’র অন্যতম। ফেনী অঞ্চল ও দক্ষীণ-পূর্ব কুমিল্লায় দীনী শিক্ষা বিস্তারে হযরত নূর বখশ রহ. ও তাঁর শাগরিদদের অবদান অনস্বীকার্য।
নোয়াখালীর দমদমার মাওলানা কোব্বাদ রহ. ছিলেন হযরত থানভীর অন্যতম খলীফা। তিনি যেমন ছিলেন বিজ্ঞ আলিম, তেমনি ছিলেন আশিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবীজির সা.-এর শানে তিনি ‘আহমাদুল আরব’ নামে বিখ্যাত আরবী কাসীদা লিখে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন। নোয়াখালীতে বহু মাদরাাসা মসজিদের তিনি প্রতিষ্ঠাতা তিনি। তবে তাঁর প্রধান দাওয়াহ ও ইসলাহী কেন্দ্র ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে তাঁর হাজার হাজার ভক্ত অনুসারী রয়েছে। সেখানে তিনি বহু মসজিদ-মাদরাসা-মকতব প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সেখানেই তিনি সমাহিত হন।
লক্ষীপুর বটতলীর মাওলানা আবদুল আজীজ জনাবওয়ালা রহ. ছিলেন হযরত থানভী রহ.-এর খাস খলীফা। পশ্চিম নোয়াখালীতে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার এবং সমাজকে বিদআত-শিরক মুক্ত করণে হযরত জনাবওয়ালা ও তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা অনন্য। তাঁর অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন রায়পুরের মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ রহ., যিনি উজানীর বড় কারী সাহেবের জামাতা।
বাংলাদেশের প্রথম ‘শাইখুল হাদীস’ উপাধি ধারণ করেন এবং হাদীসের মসনদে বরিত হন যিনি, তিনি ছিলেন নোয়াখালীর? স›দ্বীপ নিবাসী হযরতুল আল্লামা মাওলানা সাঈদ আহমাদ রাহ. ছিলেন বাংলার প্রথম শাইখুল হাদীস। তাঁর মাধ্যমেই বাংলাদেশে দাওরায়ে হাদীসের দরস আরম্ভ হয়। তিনি দীর্ঘকাল যাবত দারুল উলূম হাটহাজারীর হাদীসের মসনদ অলঙ্কৃত করে রাখেন। পরে তিনি হাটহাজারীস্থ চারিয়া মাদরাসায় হিজরত করেন এবং সেখানে হাদীসের দরস কায়েম করেন।
শুধু তাই নয়, দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন আমাদের বড় মুহাদ্দিস সাহেব হুযুর রহ.। তিনিই প্রথম বাঙ্গালী আলিম, যিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সদস্য হওয়ার সম্মান ও সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম বাঙ্গালী শিক্ষকও ছিলেন নোয়াখালীর এক কৃতি সন্তান। বেগমগঞ্জের মিরালীপুর গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা নুরুল্লাহ রহ. ছিলেন সেই মহান ব্যক্তি। তিনি দারুল উলূমে পড়ালেখা করেন এবং দারুল উলূমে আদব ও বালাগাতে শিক্ষকতা করেন। বিশেষকরে আরব ও আফ্রিকার ছাত্রদের তিনি আরবী সাহিত্য পড়াতেন। আরবী উর্দূ ও ফার্সী ভাষায় তিনি আদিব পর্যায়ের আলিম ছিলেন। আরবী গদ্য ও পদ্যে তাঁর সমান সক্ষমতা ছিল।
জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের খতীব ছিলেন নোয়াখালীর মুফতী আবদুল মুইজ্জ রহ.। দীর্ঘকাল তিনি এ আসন অলঙ্কৃত করে রাখেন। তিনি ছিলেন হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর খলীফা লক্ষীপুর বটতলীর ‘জনাবওয়ালা’ হযরতের সুযোগ্য পুত্র।
দাওয়াত ও তাবলীগের মুরুব্বীদের অন্যতম ছিলেন মাওলানা লুৎফুর রহমান রহ. এবং মাওলানা মুনির রহ.। প্রথমজনের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে, আর দ্বিতীয়জনের বাড়ি বেগমগঞ্জের আমানতপুরে। বর্তমানেও তাবলীগের অধিকাংশ শীর্ষ মুরুব্বীও নোয়াখালী অঞ্চলের। হাফিজ মাওলানা যুবাইর সাহেব, মাওলানা রবিউল হক সাহেব, মাওলানা নূরুর রহমান সাহেব, মাওলানা জাফর সাহেব- এঁরা সকলেই নোয়াখালীর অধিবাসী।
বাংলার ইসলামী রাজনীতির আকাশে ধুমকেতু হয়ে যিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং উজ্জ্বল আলোকপ্রভায় রাজনীতির আকাশকে উদ্ভাসিত করেছিলেন, তিনি হলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইসলামী রাজনীতির উত্থান ও জাগরণ ঘটে, ইতিপূর্বে যা ছিল অঘোষিত নিষিদ্ধ। তিনি ছিলেন ইসলামী রাজনীতির পথিকৃৎ, তাঁর নির্মিত পথ ধরে এবং দেখানো নির্দেশনা অনুসারে বর্তমানে ইসলামী রাজনীতি একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামী রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ এবং আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের বাড়ি নোয়াখালী লক্ষীপুরের রায়পুর থানার লুধুয়া গ্রামে।
বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের কুরআন তাফসীরের প্রাণপুরুষ ছিলেন খতীবে আজম হাবীবুল্লাহ মিসবাহ রহ.। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কুরআনের সহীহ তাফসীর ও জীবনঘনিষ্ঠ ব্যাখ্যা পেশ করা ধারা চালু করেন তিনি। তিনি মসজিদে ও মাঠে সপ্তাহ মাসব্যাপী তিনি তাফসীরের ধারা জারি করেন। নোয়াখালীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মসজিদে মসজিদে তাফসীর মাহফিলকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাফসীর মাহফিলকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে হযরত মিসবাহ রহ. এর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন হযরত মাওলানা মুস্তাফা আল হুসাইনী রহ., যিনি কুমিল্লা’র বাসিন্দা হলেও নোয়াখালীতেই জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে গেছেন। ‘তাজুল ওয়ায়েজীন’ মাওলানা কাসেম হাজিপুরী রহ.-এর তিনি ছাত্র ও জামাতা ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থেকেই তিনি ওয়াজ করা শিখে ছিলেন।
মাওলানা কাসেম হাজিপুরী রহ. ছিলেন বিখ্যাত ওয়ায়েজ ও বক্তা। নোয়াখালী কুমিল্লার পরে তিনি সবচেয়ে বেশি বয়ান করেছিলেন সিলেট অঞ্চলে। এখনো ওদিকে তাঁর বহু ভক্ত-অনুরক্ত রয়েছে। ফেনীর কোনো এক মাহফিলে তাঁকে ‘তাজুল ওয়ায়েজীন’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। ‘হাদীসের তত্ত¡ ও ইতিহাস’ গ্রন্থে মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আজমী রহ. এ তথ্য লিখেছেন।
মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আজমী রহ. ছিলেন একজন ইসলামিক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, গবেষক, অনুবাদক ও সাহিত্যিক। তিনি মিশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ করাসহ বহু গ্রহন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁর রচিত ‘হাদীসের তত্ত¡ ও ইতিহাস’ গ্রন্থটি হাদীসের ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় এক অনন্য সংযোজন। ফেনী সিলোনিয়া ‘বেকের বাজারে’র পাশেই এই মহান সাধক সমাহিত আছেন।
এগুলো কয়েকটি উদারহণ মাত্র। ইলম, ইসলাহ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নোয়াখালীর উলামায়ে কেরামে নেতৃত্বদানের কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। অন্যথা বাংলাদেশে ইসলামের প্রচারপ্রসার ও বিকাশে এবং দীনী অঙ্গনে নেতৃত্বদানে নোয়াখালীর উলামায়ে কেরামের কীর্তি অবদান ও কুরবানী লিখে শেষ করার মত নয়। এটি এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা ও ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য। নোয়াখালী একদিকে আরব ও আজমের দাঈ ও বুযুর্গদের শ্রমসুধার বরকত ও নেকদৃষ্টি লাভ করে সমৃদ্ধিশালী হয়েছিল, অপরদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশানুসারে দীনের শিক্ষা ও দাওয়াত সারা জমীনে ছড়িয়ে দেওয়ার নিমিত্ত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। ভারতবর্ষে আরব বণিক দাঈদের প্রথম মনযিলগুলোর একটি এ ‘সানী আরব’ নোয়াখালী। মধ্য এশিয়ার আরবী ফারসী দাঈদের সাথে সাথে বহু ‘সাইয়েদ’ তথা আহলে বাইতের দাঈগণ এখানে আগমন করেছিলেন এবং এখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন। হায়দারগঞ্জের সাইয়েদ পরিবার তাদের মধ্যে অন্যতম। বাদশা শরীফ হোসাইনের যুগে হাফিয তহা মক্কী রহ. এখানে তাশরীফ এনেছিলেন এবং এখানেই থিতু হয়েছিলেন। রায়পুরের মাওলানা আবদুল্লাহ রহ.-এর বাড়ির সম্মুখে তাঁর কবর রয়েছে। তাঁর বিদুষী কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুযুর রহ.। ফুরফুরা ও জৈনপুরের বুযুর্গগণ এখানে বহুকাল ধরে দাওয়াতের কাজ করে গেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। আকাবিরে হিন্দ ও দারুল উলূম দেওবন্দের সাথে নোয়াখালীর সম্পর্ক ছিল সরাসরি। ঐতিহ্যবাহী নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদরাসা দারুল উলূম দেওবন্দের সরাসরি তত্ত¡াবধানে পরিচালিত হতো। দেওবন্দ থেকেই এখানে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হত। দারুল উলূমে দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাকালীন ছাত্র ছিলেন রায়পুরের মাওলানা আবদুল্লাহ রহ.। তিনি শাইখুল হিন্দের খাস শাগরিদ ছিলেন। এভাবেই ইলম ও আধ্যাত্মিকতার, দাওয়াত ও আযীমতের শোনিতধারা নোয়াখালীতে প্রবেশ করেছিল। নোয়াখালীবাসীও সেই আমানত সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ করা গেছে, দীনী ও ইলমী ক্ষেত্রে নোয়াখালীবাসী সেই আগের মত আবদান রাখতে পারছে না। দানী ময়দানে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বদানে সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে না, যেভাবে রেখেছিল তাদের পূর্বপুরুষগণ। যেখানে একসময় তারা অন্যদের পথের দিশারী ছিল, বর্তমানে তারা নিজেরাই যেন পথের ভিখারী। শুধু তাই নয়, দীন পরিপালনে এবং ধর্মীয় অনুশাসনে নোয়াখালীবাসীর যে সুনাম-সুখ্যাতি ছিল, তা বর্তমানে অনেকটাই ¤্রয়িমান। নামাযে অলসতা, পর্দা-পুশিদায় শিথিলতা ব্যাপকহারে দেখা দিয়েছে। একসময় যেখানে দিনের বেলা নারীদের রাস্তায় দেখা বিরল ছিল, এখন মেয়েরা অহরহ পর্দালঙ্ঘন করে পথে ও বাজারে বের হচ্ছে। সালাম-কালাম, সামাজিক আদব-কায়দা ও ভদ্রতা-সভ্যতায় যেখানে নোয়াখালীবাসী অনিন্দ্য উপমা ছিল, সেখানে উঠতি তরুণদের অভদ্র আচরণ চোখে পড়ার মত। তরুণদের প্রকাশ্যে ধুমপান, গানবজনা বাজানো এখন সাধারণ দৃশ্য। যেখানে নোয়াখালীর সাধারণ দীনমজুরও অন্যদের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা রাখতো, সেখানে বহু মাদরাসাপড়–য়া (এক্ষেত্রে কাওমীর চাইতে আলিয়ার অবস্থা গুরুতর) এমন আছে, যাদের পেছনে নামায পড়া কঠিন। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, মুআমালা মুআশারার নীতি-নৈতিকায়ও নোয়াখালীবাসী অনেক পিছিয়ে পড়েছে। একসময় সারাদেশে নোয়াখালীর হুযুররাই যেখানে ঘুরে ঘুরে বয়ান করে বেড়াতেন এবং মানুষদের হেদায়েত করতেন; আজ বাইরের বক্তা না-আনলে নোয়াখালীর মাহফিল জমে না। নোয়াখালীর মাহফিল-দাঈদের সংখ্যা বহুলাংশে কমে গেছে। এককথায়, দীন পরিপালন ও দীনী দাওয়াহ ও শিক্ষাপ্রদানে নোয়াখালীবাসীর যে সোনালী ইতিহাস ও গৌরবময় ঐতিহ্য ছিল; তা এখন সে পর্যায়ে নেই। যদিও বহু অঞ্চল থেকে নোয়াখালীবাসী এখনো অনেক ভালো রয়েছে। ব্যক্তিগত পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে দীন পালনে যেমন নোয়াখালীবাসী পিছিয়ে পড়েছে, তেমনি দীনী শিক্ষা, দাওয়াহ ও রাজনীতির ময়দানে নেতৃত্বদানে ব্যর্থ হচ্ছে; যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এর কারণ কি? এই অধঃমুখিতার হেতু কি? নোয়াখালীর বর্তমান নেতৃত্ব এবং তরুণ প্রজন্মকে এ প্রশ্নের জবাব বের করতে হবে এবং তদানুযায়ী সংশোধনী ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্মিলিত ও ব্যক্তিগতভাবে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা সময়ের একান্ত দাবী।
একথা চিরসত্য- আল্লাহ তাআলাই জাতির মধ্যে উত্থান ও পতন ঘটান এবং তিনিই সকল পরিবর্তনের অধিপতি। তিনিই জাতিসমূহের মধ্যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে অদল-বদল করেন, জাতির জয়-পরাজয়ের মধ্যে আবর্তন করেন। ইরশাদ করেন :
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ.
“আর আমি দিনগুলোকে মানুষের মাঝে পালাক্রমে আবর্তিত করতে থাকি।” (সূরা আলে ইমরান : ১৪০)
কিন্তু আল্লাহর কোনো কাজই হিকমতহীন নয় এবং কোনো পরিবর্তনই অকারণে নয়। মানুষর কর্মগুণ বা কর্মদোষেই মানুষের জীবনে উত্থান-পতন ঘটে এবং মানুষের ইতিহাসে পরিবর্তন আসে। ইরশাদ করেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءًا فَلَا مَرَدَّ لَهُ وَمَا لَهُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَالٍ.
“নিশ্চয় আল্লাহ কোনও জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে...।” (সূরা রা’দ : ১১)
সুদিন থেকে দুর্দিনে পতিত হওয়ার কারণ নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন। সেই দুর্দিন থেকে সুদিনে ফিরতে চাইলে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সুদিনকে যদি তার যথাযথ কদর ও মূল্যায়ন করা না-হয় এবং তার কৃতজ্ঞতা ও কর্তব্য পূরণ করা না-হয়, তখনই দুর্দিন আসতে আরম্ভ করে। আবার যখন দুর্দিনে পতিত হয়, তারপর যদি আত্মোপলব্ধি ফিরে আসে এবং তাওবা, সংশোধনী গ্রহণ করে, তখন আবার আল্লাহর ইচ্ছায় সুদিন আসতে আরম্ভ করে। বনী ইসরাইলসহ পূর্বেকার বহু জাতির উত্থান-পতনের কাহিনী ও কার্যকারণ কুরআন মাজীদে বিধৃত হয়েছে। নিজেদের বদ-আমলের কারণেই বনী ইসরাইল ফেরাউনের কবলে পড়েছিল। আবার মূসা আ.-এর তরবিয়ত ও সংশোধনী গ্রহণের পর ফেরাউন থেকে মুক্তি পেয়েছিল এবং তাদের সম্মান মর্যাদা, খেলাফত ও কর্তৃত্ব ফিরে এসেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ .
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অজ্ঞতাবশত মন্দকাজ করে ফেলে, তারপর তাওবা করে ও নিজেকে সংশোধন করে নেয়; তবে আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সূরা আনআম : ৪৮)
একথায়, নিজেদের মধ্যে সামগ্রিক পরিবর্তন এবং সংশোধনীগ্রহণের মাধ্যমে নোয়াখালীবাসী আবার নিজেদের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারে। ফিরে আসতে পারে ইলম ও ইসলামের নেতৃত্বের আসনে। এর আগে এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনুভব-উপলব্ধি, আলাপ-আলোচনা বাড়াতে হবে। অধঃমুখিতার কারণ নির্ণয় করতে হবে এবং তদনুযায়ী সুনিদিষ্ট কর্মসূচি ও কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে।
তবে এ অধঃমুখিতার কারণগুলো কী কী, তার সমাধান কী, পরবর্তীতে কী কী সংস্কার ও সংশোধনী কীভাবে গ্রহণ করতে হবে, তা আমাদের বিজ্ঞ আকাবির ও দূরদর্শী মুরুব্বীগণ ভালো বলতে পারবেন। অনুসন্ধিৎসু পাঠকগণকে তাঁদের শরণাপন্ন হয়ে জেনে নেওয়া মুনাসিব মনে করি। একজন তালিবে ইলম হিসাবে অধমও বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আকাবির ও মুরুব্বীদের মতামতগুলো একত্র করে পরবর্তীতে সংকলন তৈরি করার আশা রাখি, ইনশা আল্লাহ। ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।
মুহাম্মাদ সাইফুদ্দীন গাজী
দারুল হিকমাহ
চৌমুহনী, নোয়াখালী
১৮/১০/২৩