11/08/2026
চট্টগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের অবদান শুধু একটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তার, জনসেবা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই নিজের ছাপ রেখে গেছেন কাজেম আলী। চট্টগ্রামবাসীর কাছে তিনি ‘কাজেম আলী মাস্টার’ নামে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা ও জনদরদের কারণে চট্টগ্রামবাসী তাঁকে ‘শেখ-ই-চাটগাম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
কাজেম আলী (১১ আগস্ট ১৮৫২–১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬) চট্টগ্রামের ফরিদের পাড়ায়, বহদ্দারহাটের উত্তরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলের নামকরা উকিল মুনশি কাসিম আলী। বাল্যকালে কাজেম আলীকে ‘গুরু ঠাকুরের পাঠশালা’য় পড়তে হয়। স্কুলে যাওয়ার প্রতি অনীহার কারণে তাঁকে হুগলিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাস করে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
এন্ট্রান্স পাস করার পর কাজেম আলী সাতকানিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবেই তিনি চট্টগ্রামে ‘কাজেম আলী মাস্টার’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে সাতকানিয়া থেকে চট্টগ্রামে এসে চাকমা রাজার কাছ থেকে ৬০ টাকায় কেনা জমিতে ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চিটাগাং মিডল ইংলিশ স্কুল। শিক্ষক হিসেবে তাঁর সুনাম ও চট্টগ্রামবাসীর উৎসাহ তাঁকে আরও বড় উদ্যোগ নিতে অনুপ্রাণিত করে। নিজের পিতার সম্পত্তি বন্ধক রেখে ১৮৮৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চিটাগাং হাই ইংলিশ স্কুল।
তাঁর মৃত্যুর পর ১৯২৮ সালে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কাজেম আলী হাই স্কুল। পরে ২০১২ সালে এটি কলেজে উন্নীত হয়। অর্থাৎ, চট্টগ্রামে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও তাঁর নাম বহন করছে, তার শিকড় গড়ে দিয়েছিলেন কাজেম আলী নিজেই।
তবে কাজেম আলী মাস্টারের কর্মপরিধি শুধু শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের একজন প্রবক্তা। কংগ্রেস কমিটি, মুসলিম লীগ, চট্টগ্রাম কংগ্রেস কমিটি ও খিলাফত কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং বহু স্কুল-মাদ্রাসার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৮৯৩ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি চট্টগ্রাম পৌরসভার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নিঃস্বার্থ জনসেবার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি দুবার ‘কায়সার-ই-হিন্দ গোল্ড মেডেল’ এবং ‘সার্টিফিকেট অব অনার’ লাভ করেন। পরে তিনি এসব সম্মান সরকারকে ফিরিয়ে দেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯১১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের নেতা যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী, স্বামী দীনানন্দ, নৃপেন ব্যানার্জীসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে তিনি কারাবরণ করেন। একই বছর সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে ইন্ডিয়া পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন কাজেম আলী মাস্টার।
শিক্ষা বিস্তার, জনসেবা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার কারণে তিনি চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ও দীর্ঘদিনের জনসেবার স্বীকৃতিতেই চট্টগ্রামবাসী তাঁকে দিয়েছিল ‘শেখ-ই-চাটগাম’ উপাধি।
১৯২৬ সালে সংসদ অধিবেশন চলাকালে তাঁর মৃত্যু হয়। দেওয়া তথ্যে তাঁর মৃত্যুর তারিখ হিসেবে শুরুতে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ এবং শেষ অংশে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। দিল্লিতে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে সমাহিত করা হয় এবং তাঁর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘শেখ-ই-চাঁটগাম’ নামের স্মৃতিসৌধ।
#চট্টগ্রাম #ইতিহাস #কাজেমআলী
©