01/07/2022
পঞ্চম শ্রেণিতে পঠিত কবি কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত "শিক্ষকের মর্যাদা" কবিতাটি আজও মনে দাগ কেটে আছে।
কিন্তু আমার মনে দাগ কাটলে কি হবে? বোধ করি কারও কারও মনে কবিতাটি কোনও প্রভাব ফেলেনি যার কারণে সম্প্রতি পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই থেকে অন্যতম সেরা শিক্ষনীয় এই কবিতাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই সমাজে আজকের বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যেখানে চির উন্নত শিক্ষা গুরুর শিরে আজ জুতোর মালা। আর বাদশাহ আলমগীরের মতো গুটিকয়েক অভিভাবকের মনেও আজ ব্যথা কিন্তু এই ব্যথা সন্তান গুরুর পায়ে হাত বুলিয়ে পা ধুয়ে দেয়নি কেন সে জন্যে নয় বরং শিক্ষককে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যাকারি সন্তানকে পালাতে সহায়তা করার পরও পুলিশের হাতে ছেলে অবশেষে ধরা পরে গেল কেন সেই কারণে ব্যথা।
ছোটবেলা থেকেই বিটিভি তে অত্যন্ত হৃদয় স্পর্শী একটি সুন্দর গান শুনে বড় হয়েছি " আজ যে শিশু
পৃথিবীর আলোয় এসেছে আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই।" কিন্তু সেই সাজানো বাগান গড়ার প্রত্যয়ে সন্তানের গায়ে যেনো একটি ফুলের টোকাও না পরে তাই সন্তানের পিঠে শিক্ষকের একটি বেতাঘাত বা গালে একটি চড় মারার বিপরীতে পরদিনই অতি সচেতন (!) অভিভাবক কর্তৃক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের নামে উল্টো নালিশ নিয়ে আসা হয়। যার ফলশ্রুতিতে কিছুদিন পর সন্তান সেই শিক্ষকের পিঠে হকস্টিক ভাঙ্গে এবং সেই বাবা আবার সন্তানের এইসব কুকীর্তি ঢাকতে ছেলেকে পালাতে সাহায্য করে।
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ড সোজা রাখার দায়িত্বে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা বা গলায় জুতোর মালা পড়ানোর ঘটনায় একজন শিক্ষক হিসেবে আমি আজ জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই সংকিত। কিন্তু কেন এই ঘটনা গুলো ঘটছে। কোথায় আমরা ব্যর্থ। হ্যা আমরা ব্যর্থ শুনতে খারাপ লাগলেও এটা সত্য তো বটেই। এই ব্যর্থতা পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষক, দেশের শাষন ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলার অবনতি, সরকারি নজরদারি সবকিছুর উপরেই বর্তায়।।
আমরা সন্তানদের সময় দিতে পারছি না বা নিজেদের নিয়ে এতো ব্যস্ত যে তাদের সময় দিতে চাইনা। তাদের কে একটা নৈতিক গল্প বলা বা তাদের সাথে গঠন মূলক খেলাধুলা করার সময় বা ইচ্ছে আমাদের নেই। কেনো আমরা সন্তানের হাতে একটা মোবাইল ফোন ধরিয়ে তাতে ভিন দেশি কার্টুন চালিয়ে তাকে শান্ত রাখার বাহানায় নিজে ফেসবুক বা টিকটক নিয়ে মেতে থাকি?
টেলিভিশন অন করলেই আজকাল একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পাচ্ছি। দেশের সুনামধন্য একটি মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপন। Fastest 4G তে সবচেয়ে এগিয়ে। সেখানে বিজ্ঞাপনের শেষের অংশে দেখানো হচ্ছে বাবা তার মেয়েকে Fastest 4G এর ঠেলায় (!) কিভাবে Car racing game টি খেলতে হয় সেটি শিখাচ্ছে। কেনো ভাই সেখানে কি Car race এ কিভাবে first হতে হয় সেটি না শিখিয়ে নির্বিঘ্ন নেটওয়ার্কে কোনো শিক্ষা মূলক প্রোগ্রাম দেখছে এরকম কিছু দেখানো যেতো না! মিডিয়ার এখন অনেক পাওয়ার। দয়া করে এসব ভুলভাল উদাহরণ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
আমাদের যৌথ পরিবার গুলোও আজ একক পরিবারে রুপান্তর হচ্ছে যেখানে শিশু তার দাদা-দাদী, নানা-নানুর বট বৃক্ষের ছায়াতল থেকে বঞ্চিত। যেখান থেকে অনেক নৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক শিক্ষা আসতে পারতো।
শিশুকে শাষন করতে গিয়ে আবার শুধু মেরে তক্তা বানানোর নাম শাষন নয়। এতে হিতে বিপরীত হয়। শিশু যখন যা চাইছে তাই তার হাতে তুলে দেবেন না। শিশুকে অভাব বোধ শিখান। কেয়ারিং শেয়ারিং আরও আরও অনেক কিছুই আছে শিখার। আসলে লিখতে গেলে অনেক কিছুই লিখা যাবে। কিন্তু আমি জানি বেশিরভাগ অভিভাবকই আমরা সব জানি বুঝি কিন্তু মানিনা বা করিনা।।
শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে নানা অসঙ্গতি। কবিতার সেই মৌলভী শিষ্যকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালিয়েছিলেন। আর আমরা সাজানো গোছানো পরিষ্কার শ্রেণি কক্ষের মেঝেতে শিক্ষার্থীদের ছোড়া কাগজ, চকলেটের প্যাকেট বা টিফিনের পড়ে যাওয়া অংশ বিশেষ তাদেরকে দিয়েই পরিস্কার করাই শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের সাবলম্বি হবার প্রশিক্ষণ দেবার লক্ষ্যে। তারপরেও কখনোও কখনোও শুনতে হয় এতো টাকা খরচ করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়কি কাজ করানোর জন্যে? হায়রে আমার দেশ যেখানে জাপানের মতো উন্নত দেশে শিক্ষার্থীদের দিয়ে বাথরুমও পরিস্কার করানো হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র্যাগিং, র্যাগ ডের নামে চলে ইভটিজিং ও উচ্ছৃঙ্খলতা। শিক্ষকেরা যেখানে নির্বিকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি পবিত্র স্থান। এখানে এই ধরনের অপসংস্কৃতি গুলো বন্ধ করতে হবে।
দেশের শাষণ ব্যাবস্থা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা পর পর ঘটে যাওয়া শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনা গুলো দেখে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছি। কিশোর গ্যাং তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। দেশের আইন শৃঙ্খলার কতটুকু অবনতি ঘটলে এরকম কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। যারা কিশোর অবস্থাতেই ভবিষ্যত সন্ত্রাসী হবার বীজ বোপন করছে। এদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এই সকল গ্যাং আরো শক্তিশালী হয়ে কত জঘন্য অপরাধ সংগঠিত করবে ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।।
পরিশেষে এটাই বলতে পারি আমার নয় বছরের শিক্ষকতা জীবণে সচেতন অভিভাবকের সংখ্যাই ছিলো বেশী যাদের কাছ থেকে পেয়েছি অনেক সম্মান ও মর্যাদা। ঠিক একই ভাবে এমন অনেক শিষ্টাচার সমৃদ্ধ শিক্ষার্থীও পেয়েছি যাদের ভালোবাসায় হয়েছি শিক্ত ও ধন্য।
কিন্তু একজন শিক্ষক হয়ে অন্য শিক্ষকের লাঞ্ছনায় আজ কলম না ধরে থাকতে পারলাম না। গুটি কয়েক অসচেতন অভিভাবক ও কুলাঙ্গার শিক্ষার্থীদের ছাড় দিতে পারছিনা।
আমার জ্ঞানের সীমা অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এখনোও প্রতিনিয়ত শিখছি। কোথাও কোন ভুল লিখে থাকলে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি পৃথিবীতে এখনও ভালোর সংখ্যাই বেশি। খারাপের সংখ্যা কম। তাই আমাদের প্রতিনিয়ত ভালোর চেষ্টাই করে যেতে হবে। আল্লাহ সবাই কে হেদায়েত দান করুক।
এডমিন
21/01/2022
05/01/2022
21/12/2021
21/12/2021
16/12/2021
12/12/2021
11/12/2021
11/12/2021
11/12/2021