18/08/2026
ভাই কাজ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি আলাদা, তাঁদের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রও সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজনের গবেষণার বিষয় ছিল মহাবিশ্ব, মহাকর্ষ, কৃষ্ণগহ্বর ও কসমোলজি; অন্যজনের কাজের কেন্দ্রে ছিল মনোবিজ্ঞান, বিশেষ শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার। কিন্তু দুজনের জীবনের শেষ পরিচয়টি এসে মিলে যায় একই জায়গায়—দুজনই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক।
তাঁরা হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও কসমোলজিস্ট জামাল নজরুল ইসলাম এবং মনোবিজ্ঞানী ও বিশেষ শিক্ষাবিদ সুলতানা সারওয়াত আরা জামান। ভাই-বোনের এই জুটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বিরল এক অধ্যায়ের নাম।
জামাল নজরুল ইসলামের সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক শুধু শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদেশের নামী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর তিনি দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতভিত্তিক গবেষণাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত Research Centre for Mathematical and Physical Sciences-এর সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Professor Emeritus হন।
তাঁর গবেষণার পরিধি ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো ঘিরে। মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে বিবর্তিত হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি কী হতে পারে—এসব প্রশ্ন নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা The Ultimate Fate of the Universe এবং An Introduction to Mathematical Cosmology তাঁকে আন্তর্জাতিক কসমোলজি অঙ্গনেও পরিচিত করে। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ, মহাকর্ষ ও মহাবিশ্বের গাণিতিক কাঠামো নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চাকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আলাদা পরিচিতি দেয়।
অন্যদিকে, একই পরিবারের আরেক সন্তান সুলতানা সারওয়াত আরা জামানের কর্মজীবনের প্রধান ঠিকানা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্রের Emory University থেকে পিএইচডি অর্জনের পর দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসরের পর তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Professor Emeritus করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি ছিল বিশেষ শিক্ষাকে একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Education and Research-এ Special Education-এর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে বিশেষ শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার পথ পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বাইরেও তাঁর কাজ ছিল বিস্তৃত। ১৯৭২ সালে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও নারীদের জন্য Deepshikha Vidyalaya প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Bangladesh Protibandhi Foundation। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর একাডেমিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজ পরিবর্তনের একজন সক্রিয় কর্মীর পরিচয়ও।
দুই ভাই-বোনের বিশ্ববিদ্যালয় দুটি তাই তাঁদের জীবনে কেবল কর্মস্থল ছিল না; হয়ে উঠেছিল তাঁদের চিন্তা ও কাজের প্রধান ক্ষেত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জামাল নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের মাটিতে উচ্চতর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও কসমোলজির চর্চাকে এগিয়ে নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুলতানা সারওয়াত আরা জামান বিশেষ শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে কাজ করেছেন।
একজনের চোখ ছিল আকাশের দিকে, অন্যজনের দৃষ্টি ছিল সমাজের প্রান্তে। একজন প্রশ্ন করেছেন—এই মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? অন্যজন কাজ করেছেন—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি শিশুর সম্ভাবনার শেষ কোথায়, তা যেন সমাজ আগে থেকে ঠিক করে না দেয়।
দুই বিশ্ববিদ্যালয়, দুই ভিন্ন শাস্ত্র, দুই ভিন্ন পথ। কিন্তু দুজনের অর্জন একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়—নিজ নিজ ক্ষেত্রে এমন একটি উত্তরাধিকার তৈরি করা, যা তাঁদের শিক্ষকতার সময় পেরিয়েও টিকে আছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সুলতানা সারওয়াত আরা জামান তাই শুধু একজন ভাই ও একজন বোন নন; বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে তাঁরা দুই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উজ্জ্বল অধ্যায়।