24/06/2026
সাম্প্রদায়িকতার চরমপন্থা ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা :-
১৯৪৭ সালের দেশভাগ। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সংঘটিত এই বিভাজনের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান; কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশভাগের প্রায় আট দশক পরও ভারত, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ম, পরিচয় ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার পেশীশক্তির রাজনীতি নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভারতের সরকার ও সমর্থকরা দাবি করেন যে তারা জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করার নীতি অনুসরণ করছেন। বাস্তবতা হলো, যখনই রাজনীতির কেন্দ্রে নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে ধর্মীয় পরিচয় প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক বিতর্ক ও মেরুকরণের প্রভাব আমাদের সমাজেও প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো যদি জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের পরিবর্তে বিভাজনের রাজনীতিকে উৎসাহিত করে, তাহলে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
তবে সমস্যার মূল কারণ শুধুমাত্র কোনো একটি দেশ, সরকার বা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, মত ও পরিচয়ের মানুষ সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ঘৃণা কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না; বরং সহাবস্থান, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি।
আজ উপমহাদেশের জনগণের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি অতীতের বিভাজনের রাজনীতি আঁকড়ে ধরে থাকব, নাকি একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এগোব? কারণ রাষ্ট্রের শক্তি কোনো একক ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ে নয়, বরং তার সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও মতের ভিন্নতা বিভেদের কারণ নয়, বরং বৈচিত্র্যের শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক আগামী দিনের বিশ্ব।
এটাই বাংলাদেশ নৈতিকবাদী পার্টির আবেদন।
ধন্যবাদ।