08/08/2024
বাঙ্গালী, তুই কবে সংশোধন হবি?
শুরুটা কিভাবে করব ঠিক বুঝতে পারছি না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমি দেখিনি; দেখিনি ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। কিন্তু গত ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট বেলা ২:০০ টা পর্যন্ত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধাদের আত্নত্যাগ আমি উপলদ্ধি করতে পেরেছি। ৫ আগস্ট বেলা ৩:০০ টায় ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের স্বাদও উপলদ্ধি করতে পেরেছি।
না! আমি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ২০২৪ সালের ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে আপময় জনগণের বিজয়ের সাথে তুলনা করছি না। আমি মনেকরি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার ভিত্তি, আমাদের শেকড়ের পরিচয়। আর ২০২৪ সালের ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে আপময় জনগণের বিজয় আমাদের মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশ আর সভ্যতা বিকাশের ভিত্তি। তার মানে আমরা এতদিন অসভ্য জাতি ছিলাম? না আমি তাও বলছি না। আমি শুধু আত্মোপলদ্ধির চেষ্টা করছি মাত্র।
বর্তমান ঘটনা প্রবাহের দিকে একটু ফিরে তাকাই।
সর্বপ্রথম সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। ওই আন্দোলনের ফলে সরকার চাকরিতে সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। এরপর মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। এ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ জুন ২০২৪ হাইকোর্টের রায়ে কোটা বাতিল করে সরকারের জারি করা পরিপত্র বাতিল করে দেন। ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা আবারও বহাল হয়। এরপর পুনরায় কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করে ছাত্ররা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে তারা আন্দোলন করতে থাকে। দ্বিতীয় দফা টানা আন্দোলন শুরু হয় গত ১ জুলাই থেকে। ছাত্রদের অহিংস এই আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপ দেয়া হয় ১৫ জুলাই থেকে। ১৬ জুলাই আন্দোলন চলাকালে একজন পুলিশ সদস্যের গুলিতে শহীদ হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আবু সাঈদ। আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সারা বিশ্বের মিডিয়াতে স্থান পায়; উত্তাল হয়ে উঠে ছাত্র আন্দোলন। ছাত্র আন্দোলন মোকাবিলায় দমনণীতি গ্রহণ করে সরকার। দিন যতই যাচ্ছে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি। একে একে ছাত্রদের পাশে দাঁড়াচ্ছে অবিভাবক, শিক্ষক, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, আপময় জনসাধারণ। ৮-১০ বছরের কিশোর ছেলেটি পানির জগ নিয়ে রাস্তায় নেমে এলো তার ভাইয়ের তৃষ্ণা মেটাতে, রান্না রেখে গৃহিনী রাস্তায় এলো তার পাড়ার ছেলেটিকে বাঁচাতে। এ এক অভূতপূর্ব চেতনা যা ভাষায় পরিপূর্ণ ভাবে প্রকাশ করা যাবে না। এরপর বহু ঘটনা প্রবাহে ৫ আগস্ট শেষ পর্যন্ত সরকার প্রধান পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
এ বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়েছিল ছাত্র সমাজ; তাদের পাশে ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। এ বিজয় দেশের ছাত্র সমাজের, সাধারণ মানুষের, কিশোর ছেলেটির। বিজয়ের পর একটা জিনিষ আমরা নিশ্চিত হই যে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রী ভাই বোনের সঠিক পথে আছে, সত্য ও ন্যায়ের পথে আছে। তারা বখে যায়নি। শুধু বিজয় অর্জন করেই তারা বসে থাকেনি। গত তিন দিন ধরে তারা রাস্তায় ট্রাফিকের কাজ করছে, রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করছে, সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীর কাজ করছে। ১২ ঘন্টার মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনসহ সকল রাষ্ট্রীয় স্থাপনার আবর্জনা পরিস্কার করেছে। মন্দির, গির্জাসহ সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিচ্ছে। তাদেরকে শুধু স্যালুট দিয়ে বা ধন্যবাদ দিয়ে জাতি হিসেবে আমাদের দায়মুক্তির সুযোগ নেই।
সুধি সমাজ এবার একটু চোখ খুলুন; আর কত চোখবুজে ঘুমের ভান করবেন? বিবেককে শুধু একটা প্রশ্ন করুন আপনি কি করছেন? দৈনিক প্রথম আলোর সূত্র বলছে, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে মৃত্যুর সংখ্যা ৩২৮ জন। বিজয়ের পর অর্থাৎ ৫ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত দুই দিনে মৃত্যুর সংখ্যা ২৩২ জন। ছাত্র জনতার নজীরবিহীন বিজয়ের পর কেন এত মৃত্যু? এটাই কি ছিল বিজয়ের লক্ষ্য?
৬ আগস্ট সর্বপ্রথম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু হয় দীর্ঘ দিনের সুবিধা বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের সুবিধা আদায়ের লড়াই। একই চিত্র সচিবালয়, এনবিআর সহ সকল অফিস আদালতে। আমি বলব এটা তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের লড়াই; দেশের সংস্কার বা উন্নয়নের কোন লড়াই না। কতটা নিলজ্জ জাতি আমরা! তরুন ছাত্র-ছাত্রীরা যাদের হাত ধরে এ বিজয় এসেছে তারা এখনো রাস্তায় জঞ্জাল পরিষ্কার করছে, আর আপনি? নিজের স্বার্থ আর সুবিধা আদায়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যাচ্ছেন অফিস পাড়ায়। ধিক! আমলা শ্রেণি।
গত রাতও (৮-৮-২০২৪) ঘুমাতে পারিনি। রাত ৩ টায় মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা হলো “আশেপাশের বিভিন্ন বাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে, সবাই সতর্ক থাকুন”। এটাই কি বিজয়ের ফসল?
আমরা সাধারণ মানুষ এখন আর কোন বিষয়ে অবাক হই না, বিস্মিতও হই না। কারণ এসবে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বড় জোর হাঁসি পায়। গতকাল (৭-৮-২০২৪) একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ দেখে, স্টেজের আসন বিন্যাস, বক্তাদের বক্তব্য শুনে বড্ড হাঁসি পেয়েছিল। স্টেজের প্রথম সারিতে যাদেরকে দেখা গিয়েছিল গত বছর ২৮ অক্টোবর ঐ দলটির সরকার বিরোধী সমাবেশে অনেক নেতারা অসুস্থতার ভান করে সমাবেশে যোগ দেয় নাই। এমন ভান ধরেছিল ভেবে ছিলাম মৃত্যুশয্যায়। হায়রে রাজনৈতিক ভাড়! দলের নীতিনির্ধারকদের বুজা উচিত যে, স্বার্থবাদী এবং ভাড় দিয়ে আর যাই হোক রাজনীতি হয় না। তাদেরই নিকট অতীত তার প্রমান। রাজনৈতিক দলগুলোর এখন বুজা উচিত শো’ডাউন আর সেলপির রাজনীতি শেষ। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ধারায় তারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের পুরাতন বিধ্বংসী সত্তা পরিবর্তন করে ছাত্র জনতার মনের ভাষা এবং পালস্ বুজতে পারবে ততই তাদের জন্য মঙ্গল হবে; উন্নতি হবে দেশমাত্রিকার। আমি কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই। রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ বা উপদেশ দেয়ার দৃষ্টতাও আমার নেই। তবে আমি মনেকরি দেশের এ ক্রান্তিকালে শো’ডাউনের পরিবর্তে যদি তাদের নেতাকর্মীরা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মত জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকত তাহলে হয়ত জনগণের মনে তাদের জন্য একটু হলেও আস্তা এবং মমতা জন্মিত। শুধু নিশ্চিত ভাবে এটা বলতে পারি ৫ আগস্টের বিজয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোন অংশ নাই।
পরিশেষে একটি গল্প বলে শেষ করছি। শিকল পরা এক গাধাকে তার মালিক একটু ছেড়ে দিল। গাধা নিজেকে মুক্ত ভেবে মালিকের খেতের এটা ওটাতে মুখ দিতে লাগল। কিন্তু গর্ধব এটা ভুলে গেল যে, মালিক যেকোন সময় আবার শিকল টেনে তাকে বন্দী করতে পারে।