16/09/2025
ফিতনার ঘনঘোর অন্ধকারে শেষ জামানার চিত্রপট।
উপস্থাপনা
যখন সত্য, মিথ্যার মুখোশে ঢাকা পড়ে, যখন আলোর পরিচয়ে অন্ধকার গাঢ় হয়, তখনই ফেতনার সময় আসে। শেষ জামানা—এ এক অস্থির ও বিক্ষুব্ধ সময়ের নাম। এমন এক সময়, যখন মানুষ দ্বীনের মূলনীতি ভুলে গিয়ে দুনিয়ার মোহে বিভোর থাকে, হক আর বাতিলের সীমারেখা মিলিয়ে যায়, আর নৈতিকতার মানদণ্ড চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে।
এই ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যে আলোর আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যেন এক কঠিন সাধনার নাম। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ফেতনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আজ তার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি যেন আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে। প্রযুক্তির ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে ইমান, বিজ্ঞানের ছদ্মবেশে ধ্বংস হচ্ছে নৈতিকতা।
এই রচনায় আমরা সেই শেষ জামানার ভয়াল বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়কে তুলে ধরার চেষ্টা করবো যাতে পাঠকের অন্তরে জাগে চিন্তা, সৃষ্টি হয় আত্মসমালোচনার উদ্দীপনা, এবং জাগ্রত হয় আল্লাহর পথে ফিরে আসার এক আন্তরিক আহ্বান।
ফিতনা শব্দটি فتن মূল বর্ণ থেকে এর অর্থ হলো বিশৃঙ্খলা, সংঘাত, পরীক্ষা বা প্রলোভন।
ভালোভাবে বললে এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যেখানে সমাজে অরাজকতা, কলহ এবং বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, বা যেখানে মানুষকে আল্লাহ্র পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়। এর বিস্তৃত অর্থের মধ্যে রয়েছে গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রদ্রোহ, অত্যাচার, নিপীড়ন এবং দলাদলি।
বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে কুরআন মাজিদে শব্দটির বেশ কয়েকটি অর্থ লক্ষ্য করা যায় সেগুলো আমরা ধারাবাহিক ভাবে জানবো ইনশাআল্লাহ।
কিছু মূল অর্থ:
১.বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা:
যখন সমাজে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ অবস্থার বিপরীত অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন তাকে ফিতনা বলা হয়।
دليل:
وَٱلْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ ٱلْقَتْلِ
– البقرة: 191
২.পরীক্ষা ও যাচাইকরণ:
কুরআনে ফিতনার অর্থ হতে পারে পরীক্ষা বা যাচাইকরণ, যেমন আগুনে পুড়িয়ে সোনার মান যাচাই করা হয়।
دليل:
وَلَقَدْ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ
– العنكبوت: 3
৩.প্রলোভন:
এটি এমন কিছুকেও বোঝায় যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য প্রলুব্ধ করে, যেমন সম্পদ, সন্তান বা অন্য কোনো আকর্ষণীয় বিষয়।
دليل:
إِنَّمَآ أَمْوَٰلُكُمْ وَأَوْلَٰدُكُمْ فِتْنَةٌ
– التغابن: 15
৪.সংঘাত ও বিভেদ:
দলাদলি, মতবিরোধ, বিভক্তি এবং উম্মতের মধ্যে বিভাজনকেও ফিতনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
دليل:
وَلَا تَكُونُوا كَٱلَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَٱخْتَلَفُوا
– آل عمران: 105
৫.অত্যাচার ও নিপীড়ন:
মানবসমাজে ভয়ভীতি, অত্যাচার এবং অনাচারের মাধ্যমে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকেও ফিতনা বলা হয়।
دليل:
إِنَّ ٱلَّذِينَ فَتَنُوا ٱلْمُؤْمِنِينَ وَٱلْمُؤْمِنَٰتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ
– البروج: 10
✍️শেষ জামানার চিত্রপট:এখানে আমরা কুরআন হাদীস থেকে দলিলের ভিত্তিতে শেষ জামানার ফিতনার চিত্রপট গুলো উল্লেখ করবো।
১. ফিতনা হবে রাতের অন্ধকারের মত।
عن جابر رضى الله عنه قال ،قال رسول الله ﷺ:
«يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا»
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“মানুষ সকালে মুমিন থাকবে আর সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে, অথবা সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে আর সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামান্য লোভ-লালসার বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দেবে।”(সহীহ মুসলিম হাদীস নং১১৮)
এই হাদীস শেষ জামানায় ঈমানের স্থায়িত্ব কতটা দুর্বল হয়ে পড়বে, তার এক গভীর ভবিষ্যদ্বাণী। মানুষ মুহূর্তেই পথ পরিবর্তন করবে, ফিতনার ঢেউয়ে ঈমান হারাবে।
২. ইলমহীনতা ও জাহালতের প্রাদুর্ভাব
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو بْنِ الْعَاصِ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ:
"إِنَّ اللَّهَ لاَ يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا، اتَّخَذَ النَّاسُ رُؤُوسًا جُهَّالًا، فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا"
আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনে আল-‘আস ( রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনি: “আল্লাহ জ্ঞানকে সরাসরি মানুষদের হৃদয় থেকে তুলে নেন না; বরং তিনি জ্ঞানকে সুদক্ষ আলেমদের মৃত্যু দ্বারা সরান। যখন আর কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ জ্ঞানশূন্য ব্যক্তিদেরকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে; যখন তাদের থেকে জ্ঞান ছাড়া মতামত চাইবেন, তারা জ্ঞানহীনভাবে ফতওয়া দেবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।”
(বুখারী হাদীস নং ১০০)
আলেমগণের অনুপস্থিতিতে ফতোয়া দেবে অজ্ঞরা, পথ দেখাবে অন্ধরা। সমাজ হবে যেমন নাবিকবিহীন নৌকা—ডুবিই তার পরিণতি।
৩. দাজ্জালের ফিতনা সর্ববৃহৎ ধোঁকাবাজি
عَنْ قَتَادَةَ، سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ:
"مَا بَيْنَ خَلْقِ آدَمَ إِلَى قِيَامِ السَّاعَةِ أَمْرٌ أَكْبَرُ مِنَ الدَّجَّالِ."
ক্বতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক কে বলতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“আদম (আঃ) সৃষ্টির পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় কোনো ফিতনা ঘটবে না।”
সহীহ মুসলিম, كتاب الفتن وأشراط الساعة, হাদীস নং 2946
সে জান্নাত দেখাবে, কিন্তু তা হবে জাহান্নাম। তার কথা সত্য মনে হবে, কিন্তু সবই মিথ্যা—এই ফিতনা হবে আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর চরম আঘাত।
৪. ধর্মের নামে বিভ্রান্তির জোয়ার
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُوا۟ دِينَهُمْ وَكَانُوا۟ شِيَعًۭا ۖ كُلُّ حِزْبٍۭ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
"তারা দ্বীনকে খণ্ড খণ্ড করে নিয়েছে এবং দলবদ্ধ হয়েছে তাদের প্রত্যেক দল তাদের যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত।
(সূরা রুম: ৩২)
নিজস্ব ব্যাখ্যা, দলীয় বিভাজন, মতবাদী প্রচার—এই বিভ্রান্তি দ্বীনের সরলতা ও ঐক্যকে চূর্ণ করবে।
৫. নারীর উন্মুক্ততা ও সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رضي الله عنه، قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাচ্ছি না। ( সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং: 5096)
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رضي الله عنه، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: إِنَّ الدُّنْيَا حُلْوَةٌ خَضِرَةٌ، وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا، فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ، فَاتَّقُوا الدُّنْيَا، وَاتَّقُوا النِّسَاءَ، فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ.
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
নিশ্চয়ই দুনিয়া মিষ্টি ও সবুজ (আকর্ষণীয়)। আল্লাহ তোমাদের এতে খলিফা বানাবেন, অতঃপর দেখবেন তোমরা কী কর। সুতরাং দুনিয়ার ব্যাপারে সাবধান হও এবং নারীদের ব্যাপারেও সাবধান হও। কারণ বনী ইসরাঈলের প্রথম ফিতনা নারীদের মাধ্যমেই হয়েছিল।(সহীহ মুসলিম)
শেষ জামানায় নারীর পর্দাহীনতা, সামাজিক অবাধ্যতা ও লজ্জার বিলুপ্তি এক মারাত্মক সামাজিক ফিতনায় রূপ নেবে।
৬. গীবত, মিথ্যা, ও অপবাদ—চরিত্রহীন সমাজের বাস্তবতা
আল্লাহ তায়া’লা বলেন
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱجۡتَنِبُواْ كَثِيرٗا مِّنَ ٱلظَّنِّ إِنَّ بَعۡضَ ٱلظَّنِّ إِثۡمٞۖ وَ لَا تَجَسَّسُواْ وَلَا يَغۡتَب بَّعۡضُكُم بَعۡضًاۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمۡ أَن يَأۡكُلَ لَحۡمَ أَخِيهِ مَيۡتٗا فَكَرِهۡتُمُوهُۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ تَوَّابٞ رَّحِيمٞ (12)
“হে ঈমানদারগণ! সন্দেহের অন্ধকারে ডুবে যেও না, কেননা অনেক সন্দেহই গুনাহ। একে অপরের গোপন ত্রুটি খুঁজে বেড়িও না, আর কেউ যেন অন্যের অগোচরে তার সম্মান নষ্ট না করে। বলো তো—তোমাদের কেউ কি কখনো চাইবে, নিজের মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে? তোমরা তো তা ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করবে! তবে আল্লাহকে ভয় করো—নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।”(সূরা হুজরাত: ১২)
শেষ জামানায় এই নিষেধাজ্ঞাকে ঠাট্টা করা হবে, মিথ্যা হবে বাহাদুরির পরিচয়, আর গীবত হবে বিনোদন।
৭. ধর্ম হবে নামসর্বস্ব, কুরআন থাকবে কণ্ঠে—হৃদয়ে নয়
হাদিসে এসেছে
عن عطاء بن يسار، قال: قال رسول الله ﷺ:
«سيأتي على أمتي زمان لا يبقى من الإسلام إلا اسمه، ولا من القرآن إلا رسمه، مساجدهم عامرة وهي خراب من الهدى، علماؤهم شرّ من تحت أديم السماء، من عندهم تخرج الفتنة وفيهم تعود».
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“আমার উম্মতের উপর এক সময় আসবে— তখন ইসলামের শুধু নামটুকুই অবশিষ্ট থাকবে, আর কুরআনের শুধু অক্ষরগুলো থাকবে (অর্থ-হিদায়াত হারিয়ে যাবে)। তাদের মসজিদগুলো বাহ্যিকভাবে পূর্ণ থাকবে, অথচ হিদায়াত থেকে শূন্য থাকবে। তাদের আলেমরা আসমানের নিচে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হবে। তাদের থেকেই ফিতনা উৎপন্ন হবে এবং তাদের কাছেই তা ফিরে আসবে।"(বায়হাকি হাদীস নং ১৭৬৩)
মসজিদ থাকবে, কিন্তু ইবাদতের প্রাণ থাকবে না; কুরআন পড়া হবে, কিন্তু তা জীবনে প্রতিফলিত হবে না।
৮. সৎ লোককে মিথ্যাবাদী বলা হবে এবং মিথ্যাবাদীকে সৎ বলা হবে
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস থেকে দলীল
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُول اللَّهِ ﷺ:
سَيَأْتِي عَلَى النَّاسِ سَنَوَاتٌ خَدَّاعَاتٌ، يُصَدَّقُ فِيهَا الْكَاذِبُ، وَيُكَذَّبُ فِيهَا الصَّادِقُ، وَيُؤْتَمَنُ فِيهَا الْخَائِنُ، وَيُخَوَّنُ فِيهَا الْأَمِينُ، وَيَنْطِقُ فِيهَا الرُّوَيْبِضَةُ»
قِيلَ: وَمَا الرُّوَيْبِضَةُ؟ قَالَ: «الرَّجُلُ التَّافِهُ يَتَكَلَّمُ فِي أَمْرِ الْعَامَّة
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“মানুষের উপর প্রতারণামূলক বছর আসবে; তখন মিথ্যাবাদীকে সত্যবাদী মনে করা হবে, আর সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী মনে করা হবে; বিশ্বাসঘাতককে বিশ্বস্ত গণ্য করা হবে, আর বিশ্বস্তকে বিশ্বাসঘাতক বলা হবে; এবং ‘রুয়াইবিদা’ কথা বলবে।”
সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “রুয়াইবিদা কী?”
তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “অযোগ্য/তুচ্ছ মানুষ যে জনসাধারণের বিষয়ে কথা বলবে।” (সুনান ইবন মাজাহ হাদীস নং: 4036)
শাইখ আলবানী (رحمه الله) একে সহীহ বলেছেন (সহীহুল জামে‘, হাদীস নং: 3650)।
সমাজের মানদণ্ড থাকবে সম্পূর্ণ উল্টো পথে—সত্য হবে নিপীড়িত, আর মিথ্যা হবে নায়ক।
৯. বিশ্বায়নের ছদ্মবেশে মূল্যবোধের অবসান।
আল্লাহ তায়া’লা বলেন :
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
(সুরা আল-ইসরা 17:16)
অর্থ: “আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করতে চাই, তখন সেখানকার ভোগ-বিলাসীদেরকে শাসন করতে দিই, ফলে তারা সেখানে পাপাচারে লিপ্ত হয়; তখন সেই জনপদের বিরুদ্ধে শাস্তির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, এবং আমি তাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করি।”
মিথ্যাবাদী বিশ্বস্ত হবে, আর সত্যবাদীকে মিথ্যাবাদী বলা হবে। আজকের মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডা-শাসিত বিশ্বায়নের ছায়ায় এ বাস্তবতা চোখে পড়ছে।
ইবন কাসীর (রহ.) (তাফসীর, সুরা আনআম 6:116 এর ব্যাখ্যায় বলেন:
“যদি তুমি দুনিয়ায় অধিকাংশ মানুষের অনুসরণ করো, তারা তোমাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তারা বাহ্যিক চাকচিক্য আর দুনিয়ার লোভের পেছনে ধাবিত।”
সভ্যতা এগোবে, কিন্তু চরিত্র থাকবে পশ্চাতে—এক অন্ধ আধুনিকতার বাস্তবচিত্র।
১০ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ মেনে চলা কঠিন হয়ে যাবে
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ:يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ أَشَدُّ عَلَى النَّاسِ مِنَ الْجَمْرِ، فَتَمَسَّكُوا بِمَا بَقِيَ مِنْ سُنَّتِي
আবূ হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“শেষ জামানায় কিছু মানুষকে সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা জলন্ত আংগারের চেয়েও কঠিন হয়ে যাবে। তাই তোমরা আমার যে সুন্নাহ এখনও অবশিষ্ট আছে, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।”
মুসনাদ আহমাদ হাদীস নং: ২২৮৯৬
১১. হত্যা বেড়ে যাবে।
عن ابى هريرة رضي الله عنه
قال رسول الله ﷺ
لا تَقُومُ السَّاعَةُ حتَّى يُكْثُرَ الهَرْجُ
قالوا: وما الهَرْجُ يا رَسُولَ اللَّهِ؟ قالَ: «القَتْلُ، القَتْلُ».
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “কিয়ামত আসবে না যতক্ষণ না হত্যা-খুন (হারাজ) বেড়ে যায়।”
সহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! হারাজ কী?”
তিনি বললেনঃ “হত্যা, হত্যা।”
সহীহ বুখারী (7062), সহীহ মুসলিম (2672)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ لاَ يَدْرِي الْقَاتِلُ فِي أَىِّ شَىْءٍ قَتَلَ وَلاَ
يَدْرِي الْمَقْتُولُ عَلَى أَىِّ شَىْءٍ قُتِلَ "
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে, কি অপরাধে সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে, কি অপরাধে সে নিহত হয়েছে। (মুসলিম হাদীস নং ৭০৩৯)
১২. সালাফদের উপলব্ধি: একাকীত্ব কখনো কল্যাণকর। ইবনে মাসউদ রাঃ এর কথা থেকে বিষয়ি স্পষ্ট হয়
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَال
إِنَّمَا الْجَمَاعَةُ مَا وَافَقَ طَاعَةَ اللَّهِ، وَإِنْ كُنْتَ وَحْدَكَ. قِيلَ لَهُ: فَإِنَّ كَثِيرًا مِمَّنْ يَقُولُ النَّاسُ لَهُمْ الْجَمَاعَةُ؟ فَقَالَ: إِنَّهُ لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ. السنن الكبرى (৮/১৫৮)
ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেছেন:
“জামাআত হলো কেবল সেই যা আল্লাহর আনুগত্যের সাথে মিলে যায়, যদিও তুমি একাই হও।”
কেউ তাঁকে বলল: “কিন্তু অনেকে তো আছে যাদের মানুষ জামাআত বলে ডাকে?”
তিনি বললেন: “আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো আনুগত্য নেই।
যখন চারপাশে ফিতনার আগুন তখন নাজাতের স্বর্ণসূত্র
১. কুরআনের আলোতে পথ চলা
ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
“এই কিতাব—এতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য পথনির্দেশ।”(সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২)
যখন চারপাশে বিভ্রান্তি ছড়ায়, তখন কুরআনের প্রতিটি আয়াত হয় মুমিনের দিশারী। যার হৃদয় কুরআনের আলোয় উদ্ভাসিত, সে অন্ধকারে হারায় না।
২. সুন্নাহর ছায়ায় আত্মরক্ষা
عَنْ مَالِكٍ، أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ:
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ، لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
মালিক (রহ.) থেকে বর্ণিত, তাঁকে পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।
মুআত্তা ইমাম মালিক ( হাদীস নং ১৫৯৪)
সুন্নাহ হলো সেই ছায়া, যা ফিতনার দাবানলে এক চিরশীতল আশ্রয়। তার পদাঙ্ক অনুসরণেই নিরাপদ ঈমানের পথ।
৩. নেক সঙ্গীর অনুসন্ধান
عَنۡ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ:
اَلرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
আবূ হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“মানুষ তার অন্তরঙ্গ বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে দেখে নিক, কাকে সে অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাচ্ছে।”(সুনান আত-তিরমিজি, হাদীস: ২৩৭৮)
ইমাম তিরমিজি বলেছেন: হাদীসটি হাসান সহীহ।
ভালো সঙ্গী যেমন জান্নাতের পথে টেনে তোলে, তেমনি খারাপ সঙ্গী জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়। শেষ জামানায় তাই সাথি বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের পরিচয়।
৪. আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অবলম্বন
আল্লাহ বলেন:
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا. وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّاهَا
“নিশ্চয়ই সে সফলকাম হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ধ্বংস হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।”
(সূরা আশ-শামস, ৯-১০)
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا • وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।”
— (সূরা আত-তালাক, ২-৩)
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
“সত্যিকারের মুজাহিদ হলো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর আনুগত্যে নিজের নফস (ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা) এর সাথে জিহাদ করে।”
(মুসনাদ আহমদ, হাদীস: ২৩৪৪৫)
আত্মশুদ্ধি ছাড়া প্রকৃত তাকওয়া অর্জিত হয় না।
তাকওয়া মানে শুধু বাহ্যিক আমল নয়, বরং অন্তরের ভয়, খাঁটি নিয়ত, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
অন্তরের পবিত্রতাই বাহ্যিক আমলের সৌন্দর্য। যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাকেই আল্লাহ ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।
৫. নির্জনে ইবাদতের আশ্রয় নেওয়া
عَنْ مَعْقِلِ بْنِ يَسَارٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
لْعِبَادَةُ فِي الْهَرْجِ كَهِجْرَةٍ إِلَيَّ
মা‘কিল ইবনু ইয়াসার (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
“ফিতনা-ফ্যাসাদের সময় ইবাদত করা আমার নিকট হিজরতের সমতুল্য।”
(সহীহ মুসলিম হাদীস নং 2984)
যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন একাকী থেকে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করা মুমিনের জন্য নিরাপত্তার চাদর হয়ে দাঁড়ায়।
সূরা আলে ইমরান আয়াত ১০১ এর শেষ অংশের আল্লাহ বলেন
وَمَن يَعْتَصِم بِٱللَّهِ فَقَدْ هُدِىَ إِلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ
“আর যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে, সে অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত হয়েছে।”
তাফসির ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে
এখানে “يعتصم بالله” অর্থাৎ আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা বলতে বোঝানো হয়েছে
আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে মেনে চলা।
ইবন কাসীর (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর প্রতি অনুগত হয়, সেগুলোকে আঁকড়ে ধরে এবং তার উপর দৃঢ় থাকে, সে-ই আসল হিদায়াতপ্রাপ্ত। এমন লোকই সরল পথের উপর রয়েছে।”
কখনো কখনো সমাজের বিপরীতধারায় চলাই প্রকৃত ঈমানদারির পরিচয়।
৬. বেশি বেশি দাজ্জাল থেকে আশ্রয় চাওয়া।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে, তাশাহহুদ শেষে সালাম ফেরানোর আগে আল্লাহর কাছে চার জিনিস থেকে আশ্রয় চাইতে হবে:
اللهم إني أعوذ بك من عذاب القبر، ومن عذاب النار، ومن فتنة المحيا والممات، ومن شر فتنة المسيح الدجال
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই কবরের আজাব থেকে, জাহান্নামের আজাব থেকে, জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষার ফিতনা থেকে এবং মসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে।”
সাহিহ মুসলিম, হাদীস: 588
সূরা কাহফের আয়াত পাঠ করতে হবে।
রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
“من حفظ عشر آيات من أول سورة الكهف عصم من الدجال”
“যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জাল থেকে সুরক্ষিত থাকবে।”
সাহিহ মুসলিম, হাদীস: 809
আরেক রেওয়ায়েতে এসেছে: শেষ দশ আয়াত পড়ার কথাও বলা হয়েছে।
দাজ্জালের ফিতনা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
উপসংহার
শেষ জামানার ভয়াবহ দৃশ্যপট আমাদের সতর্ক করছে—যেখানে সত্য ও ন্যায়ের চেয়ে মিথ্যা ও প্রতারণা, নৈতিকতার চেয়ে দুনিয়ার মোহ ও লোভ প্রাধান্য পাবে। ফিতনা, বিভ্রান্তি ও অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়লেও আল্লাহর নির্দেশনা, কুরআনের আলো ও রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাহ আমাদের নিরাপদ আশ্রয়।
এই সময়ে সঠিক পথে অটল থাকা, সত্যের সঙ্গে দৃঢ় থাকা, নেক সঙ্গী বেছে নেওয়া এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করাই আমাদের করণীয়।
শেষ জামানা হবে ঈমানের দুর্বলতা, জ্ঞানহীনতা, বিভ্রান্তি ও অনৈতিকতার সময়। দাজ্জালের ফিতনা, মিথ্যা বাহাদুরি, সামাজিক অবক্ষয়—সবই আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকবে। এ অন্ধকারেও সত্যের পথে অটল থাকা, সুন্নাহ অনুসরণ, আল্লাহর দিকে দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে থাকা এগুলোই প্রকৃত বিজয়। ফিতনার মধ্যেও যারা আল্লাহর পথে অবিচল থাকবে, তাদের জন্য আলো ও হিদায়াতের পথ সুনিশ্চিত।