গতরাতে হেডস্যার কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্ট্রোক করেছিল আরেকবার। সেইসাথে ডেঙ্গু ধরা পরেছে।
সবাই দোয়া করবেন।
Md. Ruhul Islam (হেডস্যার)
হেডস্যার
হেডস্যার খুব অসুস্থ। তাঁকে গতকাল ভেড়ামারা থেকে ঢাকা আনা হয়েছে। তিনি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
28/03/2022
হেডস্যার... একটা যাত্রা
১.
ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "
এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে ? আমি দরজা খুলে বাইরে গেলাম। দেখি একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । বুঝলাম অনেক দূর থেকে এসেছে । চোখ দুটো বড় , ফোলা। বোঝা যায় সারারাত ঘুম হয়নি । দীর্ঘ ভ্রমন আর না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট লেগে আছে চোখে। উনার হাতে একটা চিঠি। আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
তাতে লেখা--
" আমার যদি ভুল না হয় তুমি আবুল কাসেমের ভাই । রুহুল ইসলাম । পত্র পাওয়া মাত্রই বাহকের সাথে চলে আসো।"
চিঠিটা লিখেছেন তেঁতুলিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার ।
সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করলাম না । বাবার দেয়া সাহস আর আগ্রহে যাত্রা শুরু করলাম সূদুর তেঁতুলিয়ার পথে। সেই সাথে একজন হেডস্যারের ৩৮ বছরের যাত্রা শুরু হলো। তখন আমার বয়স ছিল ২১!
২.
তেঁতুলিয়াতে কাজ বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি। ভেড়ামারা স্কুলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগলো। তেঁতুলিয়া হাইস্কুল কে সাজানোর চেষ্টা করলাম।
বয়স কম ছিল বলে কখনো দ্বিধায় পড়িনি। নিজের প্রতি সম্মানবোধ ছিল। অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলতো , আপনিই হেডস্যার ? পারবেন তো।
আমি বলতাম , জ্বী আমিই হেডস্যার। এতে কোন সন্দেহ নাই।
তেঁতুলিয়ায় যেখানে আমি থাকতাম। তার কিছুটা দূরেই চায়ের দোকান। সারাদিন চা বিক্রি হয়। নোনতা বিস্কুট , মিষ্টি বিস্কুট , মুড়ি , চানাচুর। সকল ধরনের মানুষ ওখানে চা খেত। বয়োজ্যেষ্ঠ , মুরুব্বি , দাঁড়িপাকা বুড়ো এবং নানা বয়সী মানুষ।
আমি দোকানে চা খেতে যেতাম। আমাকে দেখলেই দোকানি চায়ের কাপ গরম পানি দিয়ে ধোয়া শুরু করতো , হেডস্যার আসছে বলে সবাই উঠে দাঁড়াতো , এমনি কি চায়ের বিল দিতে দিতো না। বাবার বয়েসী মানুষদের থেকে এই ধরনের আচারে আমি স্বাভাবিকভাবেই বিব্রতবোধ করতাম।
একদিন দোকানিকে ডেকে বললাম। সম্ভব হলে আমার চা টা তুমি আমার ঘরেই দিও। দোকানী আমার ঘরেই চা দিয়ে আসতো। এরপর থেকে আমি কোনদিন চায়ের দোকানে চা খাইনি।
৩.
একদিন অফিসে বসে আছি দপ্তরি একটা খাম দিয়ে গেল। ইন্টারভিউয়ের জন্য সিরাজগঞ্জ চৌবাড়িয়া ইসলামিয়া হাই স্কুল থেকে ডেকেছে হেড মাস্টার পদের জন্য । কিছুক্ষন চিঠি নিয়ে বসে থাকলাম। তারপর একটা চিঠি লিখলাম ,
“আপনারা যে পদে আমাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকেছেন , আমি ঠিক সেই পদেই কর্মরত আছি। তাই তাই আবার সেই পদেই ইন্টারভিউ দেয়াটা আমার যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেইসাথে যাতায়াতে সময় নষ্ট , অর্থ নষ্ট , শারীরিক পরিশ্রম। তাই হেড মাস্টার পদে ইন্টারভিউ দিতে যেতে খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না। “
মাসখানেক পরে একটা চিঠি এলো। তাতে লেখা ,
“আমরা তোমার চিঠি পড়েছি। আমাদের ইন্টারভিয়ের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। আমার কাউকে সিলেক্ট করতে পারিনি। আমরা হেড মাস্টার পদে তোমাকেই যোগ্য মনে করছি। তোমার ইন্টারভিউ নেয়ার প্ৰয়োজন নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি সিরাজগঞ্জ হয় স্কুলে যোগদান করো। “
চিঠিটা নিয়ে আমি তেঁতুলিয়া স্কুল কমিটির কাছে গেলাম। তারা বললো – “ তোমাকে ছাড়তে আমাদের খুব খারাপ লাগবে। তাই বলে আমরা চাইনা জীবনের ভালো সুযোগ গুলো তুমি কাজে না লাগাও। তেঁতুলিয়া কে ভুল না। “
আমি তেঁতুলিয়া কে ভুলি নি। ওখানকার মানুষের কাছে অনেক সন্মান অর্জন করেছি , ভালোবাসা পেয়েছি। আমার খুব ইচ্ছা জীবনের শেষ সময়ে হলেও যেন তেঁতুলিয়া ঘুরে আসতে পারি। সেই স্কুল তাকে দেখতে পারি। আমি জানি আমার ছাত্ররা নিশ্চয় একটা ব্যবস্থা করবে।
৪.
প্রচন্ড বৃষ্টি। আমরা আঞ্চলিক ভাষায় বলি ঢল। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। হাতে টিনের ট্রাঙ্ক আর ঘাঢ়ে ব্যাগ। সামনেই সিরাজগঞ্জ চৌবাড়িয়া ইসলামিয়া হাইস্কুল ঘর। আমাকে দেখে এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোক এগিয়ে এসে বললেন , আপনার পরিচয় ?
আমি বললাম , আমি এই স্কুলের হেডমাস্টার। আমার নাম মোঃ রুহুল ইসলাম।
উনি সালাম দিয়ে বললেন , আসুন স্যার আসুন।
আপনার নাম কি ? আমার নাম বসন্ত। আপনি দপ্তরি।
তিনি আমাকে স্কুল রুমে নিয়ে গেলেন। সিরাজগঞ্জে আমার নতুন যাত্রা শুরু হলো।
সম্পর্ক তৈরী হয় সম্মানের মাধ্যমে , সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। দপ্তরি বসন্ত বয়স্ক মানুষ , স্কুলের অনেক পুরোনো মানুষ। স্কুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর সন্মান দেখেই বোঝা যায় স্কুলের সাথে তাঁর সম্পর্ক কতটুকু। স্কুলের ভালো মন্দ , ফাঁক ফোকর সব কিছু বসন্ত জানত।
ওর সাথে আমার অনেক কথা হতো। স্কুল ছুটির পর মাঠে হাঁটতাম কথা হতো স্কুল নিয়ে। একদিন তার বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। বলল , ১২ টাকা।
কমিটিকে একদিন বললাম , উনার বেতন বাড়িতে দিন। অনেক পুরোনো লোক। স্কুলের সব খবর জানে , পরিশ্রম করে, দায়িত্ব পালন করে , স্কুলের প্রতি প্রচন্ড রকম দরদ আছে। ওর বেতন ৫০ টাকা করে দিন।
কমিটি অবাক হয়ে বললো, আপনার বেতন ই তো ৫১ !
আমি বললাম, হোক! এই স্কুলে আমার চেয়ে বেশি বেতন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে সে।
স্কুল কমিটি আমার কথা রেখেছিলো।
এর আগে সম্মানের কথা বলেছিলাম। বসন্তকে আমি বয়জেষ্ঠ হিসাবে এবং স্কুলের প্রতি তার দায়িত্ববোধ , ভালোবাসার প্রেক্ষিতে যেমন সন্মান করতাম ঠিক তেমন ই সে হেডস্যার হিসেবে আমাকে সন্মান করত। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না।
বসন্ত যেদিন মারা যায় আমি আমার চেয়ারে বসে খুব কেঁদেছিলাম। হুহুকরে কেঁদেছিলাম। অভিবাবক , বন্ধুত্ব কিংবা বিশ্বস্ততা .... সম্পর্কের সংজ্ঞা কি?
-----
হেডস্যার কোন একজায়গাতে তাঁর স্মৃতি ছাপাবেন বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্ত এখন তো আর তাঁর কলম চলেনা।
বুড়ো হয়েছেন। টেবিলে পড়ে থাকা একটা মোটা খাতায় তিনি কিছু লিখতে চেয়েছিলেন। আমি মাঝে মাঝে চোখ বুলাই, লেখা গুলো স্পর্শ করি।
তিনি যেহেতু লিখতে পারেন না তাই লেখার দ্বায়িত্বটা আমার কাঁধেই পড়লো। অসুস্থ অবস্থায় অস্পষ্ট স্বরে তিনি ভয়েজ ম্যাসেজ পাঠাতেন। আমি মন দিয়ে শুনতাম এবং টুকরো টুকরো স্মৃতির গুলো লেখার চেষ্টা করতাম। একসময় দেখলাম অনেকখানি লেখা হয়ে গেছে।
তবে হ্যাঁ এই লেখা কোথাও ছাপা হয়নি। এই পেজের মাধ্যমে অল্প কিছু অংশ প্রকাশ করলাম।
লেখাটা চলবে....
তাঁর হেডস্যার জীবনের অনেক অজানা তথ্য এবং স্মৃতির এই পেজে প্রকাশ করতে পারো আশাকরি।
** আবার বলছি ।এই লেখাটা তাঁর মুখ থেকে শোনা। আমি শুধু গুছিয়ে টাইপ করেছি।
ধন্যবাদ
এডমিন
'হেডস্যার.... একটি যাত্রা।'
হেডস্যারের অপ্রকাশিত স্মৃতি আসছে খুব শীঘ্রই.....
এডমিন।
01/01/2022
ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "
এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে ? আমি দরজা খুলে বাইরে গেলাম। দেখি একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । বুঝলাম অনেক দূর থেকে এসেছে । চোখ দুটো বড় , ফোলা। বোঝা যায় সারারাত ঘুম হয়নি । দীর্ঘ ভ্রমন আর না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট লেগে আছে চোখে। উনার হাতে একটা চিঠি। আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
তাতে লেখা--
" আমার যদি ভুল না হয় তুমি আবুল কাসেমের ভাই । রুহুল ইসলাম । পত্র পাওয়া মাত্রই বাহকের সাথে চলে আসো।"
চিঠিটা লিখেছেন তেঁতুলিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার ।
মোঃ রুহুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করলেন না। তাঁর বাবার দেয়া সাহস আর আগ্রহে তিনি যাত্রা শুরু করলেন সূদুর তেঁতুলিয়ার পথে। সেই সাথে একজন হেডস্যারের ৩৮ বছরের যাত্রা শুরু হলো। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১!
আজ ১ লা জানুয়ারি । তাঁর জন্মদিন।
22/10/2021
গতকাল হেডস্যার কে হাসপাতাল থেকে বাসাতে আনা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আজ তিনি বসতে পারছেন।
এডমিন
16/05/2021
দাদাভাইয়ের সাথে আমার ২য় ঈদ।
08/02/2021
আমার দাদুভাইয়ের জন্মদিন ।
০৮\০২\২০২১
25/05/2020
সবাই ভালো থাকুক ।
25/05/2020
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Telephone
Website
Address
Bheramara
7040