Md. Ruhul Islam (হেডস্যার)

Md. Ruhul Islam (হেডস্যার) হেডস্যার

29/08/2026

আমার আব্বার টুকরো স্মৃতিকথা
---‐---------------------------

আমার আব্বা অনেক কিছু লিখতে চাইতেন। কিন্তু নানা কারণে জীবনের শেষটায় আর পেরে ওঠেননি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে গেছেন টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতির খসড়া।
তখন উনি ভীষণ অসুস্থ, ঢাকায় বড় আপার বাসায় চিকিৎসাধীন। ঠিক সেই সময়ে 'ভেড়ামারা সমিতি'র একটা স্মরণিকা বা বইয়ে লেখার জন্য আব্বার লেখা চাওয়া হলো। অসুস্থতার কারণে উনার নিজে লেখার সেই শারীরিক ক্ষমতা আর ছিল না। কিন্তু কী এক অদ্ভুত আকুলতা কাজ করছিল তাঁর মনের ভেতর! প্রতিদিন আমার দুই ভাগিনাকে দিয়ে ভয়েস পাঠিয়ে আমাকে বলতেন লিখে নিতে। আমি মূল বক্তব্যটা ঠিক রেখে হুবহু তাঁর মুখের সুরেই লিখে যাওয়ার চেষ্টা করেছি।
আজ সেই খসড়া থেকে কিছু অংশ তুলে দিলাম। যদি উনার লেখার ক্ষমতা থাকত, হয়তো আরও কত না-বলা গল্প কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন! আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধবোধগুলোর একটা হলো—আব্বার কথাগুলো লিখে রাখতে না পারা।

১. তেঁতুলিয়ার পথে প্রথম পদার্পণ

ফজরের আজানের পর আব্বা ডাকছেন— "ওগো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।"
এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে? দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দেখি একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝলাম অনেক দূর থেকে এসেছেন। চোখ দুটো বড় বড়, ফোলা; সারারাত না ঘুমানোর আর দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি স্পষ্ট লেগে আছে চোখে। উনার হাতে একটা চিঠি, আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
চিঠিতে লেখা—
"আমার যদি ভুল না হয় তুমি আবুল কাসেমের ভাই—রুহুল ইসলাম। পত্র পাওয়া মাত্রই বাহকের সাথে চলে আসো।"

চিঠিটা লিখেছেন তেঁতুলিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার।
সিদ্ধান্ত নিতে এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। আব্বা দেওয়া সাহস আর উৎসাহ সম্বল করে যাত্রা শুরু করলাম সুদূর তেঁতুলিয়ার পথে। সেই সাথে একজন হেডস্যারের ৩৮ বছরের দীর্ঘ পথচলা শুরু হলো। তখন আমার বয়স মাত্র একুশ!

২. হেডস্যার ও চায়ের দোকান

তেঁতুলিয়াতে কাজ বুঝে নিতে খুব একটা সমস্যা হয়নি, ভেড়ামারা স্কুলের অভিজ্ঞতা সেখানে দারুণ কাজে লেগেছিল। অল্প বয়স হলেও কখনো কোনো দ্বিধায় পড়তাম না। অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলতো, "আপনিই হেডস্যার? পারবেন তো?"
আমি হাসিমুখে বলতাম, "জ্বী, আমিই হেডস্যার। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।"
যেখানে থাকতাম, সেখান থেকে একটু দূরেই একটা চায়ের দোকান। সারাদিন চা বিক্রি হয়—নোনতা বিস্কুট, মিষ্টি বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর। বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি, দাড়ি-পাকা বুড়ো থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষের আড্ডা বসত সেখানে। আমি মাঝে মাঝে চা খেতে যেতাম। কিন্তু আমাকে দেখলেই দোকানি গরম পানি দিয়ে কাপ ধোয়া শুরু করত, সবাই "হেডস্যার আসছে" বলে সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে যেত, এমনকি কখনো চায়ের বিলও নিতে চাইত না। বাবার বয়সী মানুষদের কাছ থেকে এমন আচরণে আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করতাম।
একদিন দোকানিকে ডেকে বললাম, "সম্ভব হলে আমার চা-টা ঘরে দিয়ে এসো।" এরপর থেকে দোকানে আমার ঘরেই চা পৌঁছে যেত, আর আমি কখনো চায়ের দোকানে যাইনি।
কয়েকদিন পর মাসিক বিল দিতে গেলে দোকানি হাতজোড় করে বলল, "স্যার, আপনার চা-এর বিল এলাকার মানুষ আগেই পরিশোধ করে দিয়েছে এবং বলে দিয়েছে—হেডস্যারের থেকে যেন একটা পয়সাও নেওয়া না হয়।"

৩. যোগ্যতার সম্মান

একদিন অফিসে বসে আছি, দপ্তরি একটা খাম দিয়ে গেল। সিরাজগঞ্জ হাইস্কুল থেকে হেডমাস্টার পদের ইন্টারভিউয়ের ডাক এসেছে। চিঠিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। তারপর একটা চিঠি লিখে পাঠালাম—
> "আপনারা যে পদে আমাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকেছেন, আমি ঠিক সেই পদেই কর্মরত আছি। তাই একই পদে আবার ইন্টারভিউ দেওয়া আমার যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই সাথে যাতায়াতে সময় নষ্ট, অর্থ নষ্ট এবং শারীরিক পরিশ্রম। তাই হেডমাস্টার পদে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না।"

মাসখানেক পর আরেকটি চিঠি এল। তাতে লেখা—
"আমরা তোমার চিঠি পেয়েছি। আমাদের ইন্টারভিউ পর্ব আমরা শেষ করেছি এবং কাউকে চূড়ান্ত করতে পারিনি। তবে আমরা হেডমাস্টার পদে তোমাকেই সবচেয়ে যোগ্য মনে করছি। তোমার ইন্টারভিউ নেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই। যত দ্রুত সম্ভব আপনি সিরাজগঞ্জ হাইস্কুলে এসে যোগদান করো।"

চিঠিটা নিয়ে তেঁতুলিয়া স্কুল কমিটির কাছে গেলাম। তারা পরম মায়ায় বলল, "তোমাকে ছাড়তে আমাদের খুব খারাপ লাগবে। তাই বলে আমরা তো চাই না তোমার জীবনের বড় কোনো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাক। তেঁতুলিয়াকে ভুলেরো না।"

আমি তেঁতুলিয়াকে ভুলিনি। সেখানকার মানুষের কাছে আমি অন্তহীন সম্মান আর ভালোবাসা পেয়েছি। আমার খুব ইচ্ছে করে, জীবনের একদম শেষ সময়ে হলেও একবার তেঁতুলিয়া ঘুরে আসি, সেই স্কুলটাকে দেখে আসি। আমি জানি, আমার ছাত্ররা নিশ্চয়ই আমাকে দেখার একটা ব্যবস্থা করে দেবে।

৪. দপ্তরি বসন্ত ও আত্মমর্যাদার সম্পর্ক

হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। এক হাতে টিনের ট্রাঙ্ক, কাঁধে ব্যাগ। সামনেই সিরাজগঞ্জ হাইস্কুলের ঘর। আমাকে দেখে বয়োজ্যেষ্ঠ এক মানুষ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার পরিচয়?"
বললাম, "আমি এই স্কুলের নতুন হেডমাস্টার। আমার নাম মো. রুহুল ইসলাম।"
তিনি সম্মান জানিয়ে বললেন, "আসুন স্যার, আসুন। আপনার নাম কী? আমার নাম বসন্ত, আমি দপ্তরি।"
তিনি আমাকে স্কুলরুমে নিয়ে গেলেন। এভাবেই সিরাজগঞ্জে আমার নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
সম্পর্ক তৈরি হয় সম্মানের ভিত্তিতে, আর তা টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। দপ্তরি বসন্ত বয়স্ক মানুষ, স্কুলের বহু পুরনো এক কর্মী। স্কুলের প্রতি তাঁর দরদ দেখলেই বোঝা যেত মাটির সাথে তাঁর নাড়ির টান কেমন। স্কুলের ভালো-মন্দ, ফাঁকফোকর—সবকিছু বসন্তের নখদর্পণে ছিল। স্কুল ছুটির পর মাঠে হাঁটতাম, আর স্কুল নিয়ে নানা কথা হতো।
একদিন ওর বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। জানাল, মাত্র বারো টাকা পায়!
কমিটিকে ডেকে একদিন বললাম, "উনার বেতনটা বাড়িতে দিয়ে আসবেন। অনেক পুরনো মানুষ, অসম্ভব সৎ। স্কুলের সব খবর রাখে, এত পরিশ্রম করে, দায়িত্ব পালন করে—স্কুলের প্রতি ওর বুকভরা দরদ আছে। ওর বেতন পঞ্চাশ টাকা করে দিন।"
কমিটি তো অবাক! তারা বলল, "স্যার, আপনার নিজের বেতনই তো একান্ন টাকা!"
আমি বলেছিলাম, "হোক! এই স্কুলে আমার চেয়েও বেশি বেতন পাওয়ার যোগ্যতা ওর আছে।" স্কুল কমিটি আমার কথা রেখেছিল।

বসন্তকে আমি মুরুব্বি হিসেবে, এবং স্কুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যেমন গভীর সম্মান করতাম, তেমনি সেও আমাকে হেডস্যার হিসেবে প্রাণের ভক্তি করত। এর মধ্যে কোনো খাদ ছিল না।
বসন্ত যেদিন মারা গেল, আমি আমার চেয়ারে বসে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলাম।
অভিভাবকত্ব, বন্ধুত্ব কিংবা নিখাদ বিশ্বস্ততা—আসলে সম্পর্কের আসল সংজ্ঞাটা কী?

৫. ভিক্ষুক ও আত্মমর্যাদার পাঠ

সপ্তাহে নির্দিষ্ট একটি দিনে এক ভিক্ষুক আসতেন আমার কাছে, আমি তাঁকে কিছু পয়সা দিতাম। একদিন দেখি তিনি এলেন না। আমি অপেক্ষা করলাম, কিন্তু এলেন না। পরদিন তাঁকে আসতে দেখে পকেট থেকে পয়সা বের করলাম।
কিন্তু ভিক্ষুক অবাক করে দিয়ে বললেন, "স্যার, আজ ভিক্ষা নিতে আসিনি। দাওয়াত দিতে এসেছি। স্কুলের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছি।"
পরের দিন স্কুলের দপ্তরি আমাকে সেই ভিক্ষুকের বাড়িতে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে তো আমার চোখ কপালে! টিনের পাকা বাড়ি, যা আমাদের নিজেদের বাড়ির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর ও গোছানো।
পরের সপ্তাহে ভিক্ষুক আবার এলেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, "তোমার অবস্থা তো এত ভালো, তবুও কেন ভিক্ষা করো?"
লোকটি নির্দ্বিধায় উত্তর দিল, "স্যার, ভিক্ষা আমাদের বংশগত পেশা। আর্থিক অবস্থা যতই ভালো হোক না কেন, এই পেশা আমরা ছাড়ব না।"
আমি তখন গম্ভীর হয়ে বললাম, "জেনে রাখো, আজ থেকে আমি তোমাকে আর কোনো ভিক্ষা দেব না।"

৬. ভেড়ামারার টানে ঘরে ফেরা

বাড়ি থেকে আব্বা চিঠি দিলেন। বারবার তাগাদা দিয়ে লিখলেন—"তুমি আর কোথাও চাকরি করবে না, সোজা ভেড়ামারায় ফিরে এসো এবং স্কুলের হাল ধর।" ভেড়ামারার মুরুব্বি ও প্রভাবশালী বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা আব্বাকে ধরেছিলেন তাঁকে ফিরিয়ে আনার জন্য।
সিরাজগঞ্জ ছেড়ে আমি ভেড়ামারায় ফিরে এলাম। সঙ্গে নিয়ে এলাম বিশাল এক স্মৃতির ভাণ্ডার। প্রাণের একটা অংশ সেখানে সঁপে দিয়ে এসেছিলাম।

যোগদানের চিঠি হাতে পাওয়ার পর আব্বা বললেন, "যাও, বড় চাচার সাথে দেখা করে এসো। সবার আগে চিঠিটা তাঁকেই দেখাও।"

বড় চাচার কাছে গিয়ে চিঠিটা উনার হাতে দিয়ে বললাম, "বড় চাচা, আমি ভেড়ামারা ছেড়ে আর কোথাও যাচ্ছি না!"

বড় চাচা আবেগ আর ধরে রাখতে পারলেন না, সবাইকে ডেকে ডেকে বললেন, "তোমরা দেখছ? আমাদের ভেড়ামারা হাইস্কুলের নতুন হেডস্যার এসেছে!"
সেকথা শুনে 'ভিএম সাহেব' ছুটে এলেন নতুন হেডস্যারকে একনজর দেখতে। তিনি বড়চাচার ওখানে থাকতেন।আমাকে দেখে কিছুটা অবাকও হলেন। তিনি অন্য কাউকে ভেবে ছিলেন।

স্কুলের প্রথম দিন। হাফেজ সাহেব সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। আমি তাঁকে খুঁজলাম, পেলাম না। শুনলাম তিনি স্কুলের ছাত্রাবাসে শুয়ে আছেন। আমি গিয়ে বললাম, "হাফেজ সাহেব, উঠুন। আমাদের তো একসাথে কাজ করতে হবে, এভাবে শুয়ে থাকলে কি চলে?"

হাফেজ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। সেই যে তিনি সেদিন উঠে দাঁড়ালেন, আমৃত্যু তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। দাপ্তরিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মানুষটি আমার ছায়া হয়ে ছিলেন। ঈদের নামাজের পর আমি আর কারো কাছে না গিয়ে সোজা তাঁর কাছে চলে যেতাম।

তিনি যেদিন মারা যান, সেই দিনটার কথা আজ ঠিকমতো মনে করতে পারি না। কেবল মনে আছে, সেদিন উনার কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। চারপাশের সবাই যখন আমার পাশে সান্ত্বনা নিতে দাঁড়িয়েছিল, আমি ছলছল চোখে কেবল একটি কথাই বারবার বলছিলাম—
"আমার জীবনে একটাই মাত্র বন্ধু ছিল, আজ সেও আমাকে চিরকালের মতো ছেড়ে চলে গেল!"

সম্পর্ক নিয়ে একটা কথা আগেই বলেছিলাম, আজও বলব—অভিভাবকত্ব, বন্ধুত্ব কিংবা বিশ্বস্ততা... সম্পর্কের মাপকাঠিতে আসলে এর সংজ্ঞাটা কী?

শেষ কথা

ভেড়ামারা পাইলট হাইস্কুলের সেই শেষ দিনটার কথা আজ আর আমার কলম দিয়ে বের করতে পারলাম না। শুধু এটুকু বলতে পারি—সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মনে মনে ভেবেছিলাম, "স্কুলটাকে পেছনে ফেলে আজ সত্যি সত্যি আমি শেষবারের মতো গেট পার হয়ে আসছি বটে, কিন্তু একজন হেডস্যার হিসেবে আমার এই যাত্রা চিরকাল চলমান থাকবে। খাতায়-কলমে হয়তো আমার কোনো দাপ্তরিক পদ থাকবে না, কিন্তু মনের গহীনে 'অলিখিত' হেডস্যার পদের আজীবন দায়িত্ব আমাকে পালন করে যেতে হবে।"
এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়তি, আর সাথে বুকভরা ভীষণ প্রাপ্তি!

---
এই লেখাটা আমি ভেড়ামারা সমিতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। সম্ভবত তাদের পছন্দ হয়নি, তাই তারা লেখাটি ছাপেনি।
এই লেখাটার পেছনে আব্বার কী এক চরম ব্যাকুলতা কাজ করছিল! নইলে অত অসুস্থ শরীরেও ভয়েস পাঠিয়ে আমাকে নিজের মতো করে লিখে নিতে বলতেন না। একদিন খুব মলিন মুখে আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
"কী রে, ওরা কি আমার লেখাটা ছেপেছে?"
আমি অপরাধীর মতো বলেছিলাম—"আব্বা, আমি তো লেখাটা পাঠানোই হয়নি। আমার মনেই ছিল না..." :'(

এডমিন ক্রিয়েটর

09/10/2022

গতরাতে হেডস্যার কে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্ট্রোক করেছিল আরেকবার। সেইসাথে ডেঙ্গু ধরা পরেছে।

সবাই দোয়া করবেন।

09/04/2022

হেডস্যার খুব অসুস্থ। তাঁকে গতকাল ভেড়ামারা থেকে ঢাকা আনা হয়েছে। তিনি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

হেডস্যার... একটা যাত্রা ১.ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "এই...
28/03/2022

হেডস্যার... একটা যাত্রা



১.
ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "
এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে ? আমি দরজা খুলে বাইরে গেলাম। দেখি একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । বুঝলাম অনেক দূর থেকে এসেছে । চোখ দুটো বড় , ফোলা। বোঝা যায় সারারাত ঘুম হয়নি । দীর্ঘ ভ্রমন আর না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট লেগে আছে চোখে। উনার হাতে একটা চিঠি। আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
তাতে লেখা--
" আমার যদি ভুল না হয় তুমি আবুল কাসেমের ভাই । রুহুল ইসলাম । পত্র পাওয়া মাত্রই বাহকের সাথে চলে আসো।"
চিঠিটা লিখেছেন তেঁতুলিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার ।
সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করলাম না । বাবার দেয়া সাহস আর আগ্রহে যাত্রা শুরু করলাম সূদুর তেঁতুলিয়ার পথে। সেই সাথে একজন হেডস্যারের ৩৮ বছরের যাত্রা শুরু হলো। তখন আমার বয়স ছিল ২১!

২.
তেঁতুলিয়াতে কাজ বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি। ভেড়ামারা স্কুলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগলো। তেঁতুলিয়া হাইস্কুল কে সাজানোর চেষ্টা করলাম।
বয়স কম ছিল বলে কখনো দ্বিধায় পড়িনি। নিজের প্রতি সম্মানবোধ ছিল। অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলতো , আপনিই হেডস্যার ? পারবেন তো।
আমি বলতাম , জ্বী আমিই হেডস্যার। এতে কোন সন্দেহ নাই।
তেঁতুলিয়ায় যেখানে আমি থাকতাম। তার কিছুটা দূরেই চায়ের দোকান। সারাদিন চা বিক্রি হয়। নোনতা বিস্কুট , মিষ্টি বিস্কুট , মুড়ি , চানাচুর। সকল ধরনের মানুষ ওখানে চা খেত। বয়োজ্যেষ্ঠ , মুরুব্বি , দাঁড়িপাকা বুড়ো এবং নানা বয়সী মানুষ।
আমি দোকানে চা খেতে যেতাম। আমাকে দেখলেই দোকানি চায়ের কাপ গরম পানি দিয়ে ধোয়া শুরু করতো , হেডস্যার আসছে বলে সবাই উঠে দাঁড়াতো , এমনি কি চায়ের বিল দিতে দিতো না। বাবার বয়েসী মানুষদের থেকে এই ধরনের আচারে আমি স্বাভাবিকভাবেই বিব্রতবোধ করতাম।
একদিন দোকানিকে ডেকে বললাম। সম্ভব হলে আমার চা টা তুমি আমার ঘরেই দিও। দোকানী আমার ঘরেই চা দিয়ে আসতো। এরপর থেকে আমি কোনদিন চায়ের দোকানে চা খাইনি।


৩.
একদিন অফিসে বসে আছি দপ্তরি একটা খাম দিয়ে গেল। ইন্টারভিউয়ের জন্য সিরাজগঞ্জ চৌবাড়িয়া ইসলামিয়া হাই স্কুল থেকে ডেকেছে হেড মাস্টার পদের জন্য । কিছুক্ষন চিঠি নিয়ে বসে থাকলাম। তারপর একটা চিঠি লিখলাম ,
“আপনারা যে পদে আমাকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকেছেন , আমি ঠিক সেই পদেই কর্মরত আছি। তাই তাই আবার সেই পদেই ইন্টারভিউ দেয়াটা আমার যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেইসাথে যাতায়াতে সময় নষ্ট , অর্থ নষ্ট , শারীরিক পরিশ্রম। তাই হেড মাস্টার পদে ইন্টারভিউ দিতে যেতে খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না। “

মাসখানেক পরে একটা চিঠি এলো। তাতে লেখা ,
“আমরা তোমার চিঠি পড়েছি। আমাদের ইন্টারভিয়ের পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। আমার কাউকে সিলেক্ট করতে পারিনি। আমরা হেড মাস্টার পদে তোমাকেই যোগ্য মনে করছি। তোমার ইন্টারভিউ নেয়ার প্ৰয়োজন নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি সিরাজগঞ্জ হয় স্কুলে যোগদান করো। “

চিঠিটা নিয়ে আমি তেঁতুলিয়া স্কুল কমিটির কাছে গেলাম। তারা বললো – “ তোমাকে ছাড়তে আমাদের খুব খারাপ লাগবে। তাই বলে আমরা চাইনা জীবনের ভালো সুযোগ গুলো তুমি কাজে না লাগাও। তেঁতুলিয়া কে ভুল না। “

আমি তেঁতুলিয়া কে ভুলি নি। ওখানকার মানুষের কাছে অনেক সন্মান অর্জন করেছি , ভালোবাসা পেয়েছি। আমার খুব ইচ্ছা জীবনের শেষ সময়ে হলেও যেন তেঁতুলিয়া ঘুরে আসতে পারি। সেই স্কুল তাকে দেখতে পারি। আমি জানি আমার ছাত্ররা নিশ্চয় একটা ব্যবস্থা করবে।


৪.
প্রচন্ড বৃষ্টি। আমরা আঞ্চলিক ভাষায় বলি ঢল। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। হাতে টিনের ট্রাঙ্ক আর ঘাঢ়ে ব্যাগ। সামনেই সিরাজগঞ্জ চৌবাড়িয়া ইসলামিয়া হাইস্কুল ঘর। আমাকে দেখে এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোক এগিয়ে এসে বললেন , আপনার পরিচয় ?
আমি বললাম , আমি এই স্কুলের হেডমাস্টার। আমার নাম মোঃ রুহুল ইসলাম।
উনি সালাম দিয়ে বললেন , আসুন স্যার আসুন।
আপনার নাম কি ? আমার নাম বসন্ত। আপনি দপ্তরি।
তিনি আমাকে স্কুল রুমে নিয়ে গেলেন। সিরাজগঞ্জে আমার নতুন যাত্রা শুরু হলো।

সম্পর্ক তৈরী হয় সম্মানের মাধ্যমে , সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। দপ্তরি বসন্ত বয়স্ক মানুষ , স্কুলের অনেক পুরোনো মানুষ। স্কুলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আর সন্মান দেখেই বোঝা যায় স্কুলের সাথে তাঁর সম্পর্ক কতটুকু। স্কুলের ভালো মন্দ , ফাঁক ফোকর সব কিছু বসন্ত জানত।
ওর সাথে আমার অনেক কথা হতো। স্কুল ছুটির পর মাঠে হাঁটতাম কথা হতো স্কুল নিয়ে। একদিন তার বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। বলল , ১২ টাকা।
কমিটিকে একদিন বললাম , উনার বেতন বাড়িতে দিন। অনেক পুরোনো লোক। স্কুলের সব খবর জানে , পরিশ্রম করে, দায়িত্ব পালন করে , স্কুলের প্রতি প্রচন্ড রকম দরদ আছে। ওর বেতন ৫০ টাকা করে দিন।
কমিটি অবাক হয়ে বললো, আপনার বেতন ই তো ৫১ !
আমি বললাম, হোক! এই স্কুলে আমার চেয়ে বেশি বেতন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে সে।
স্কুল কমিটি আমার কথা রেখেছিলো।

এর আগে সম্মানের কথা বলেছিলাম। বসন্তকে আমি বয়জেষ্ঠ হিসাবে এবং স্কুলের প্রতি তার দায়িত্ববোধ , ভালোবাসার প্রেক্ষিতে যেমন সন্মান করতাম ঠিক তেমন ই সে হেডস্যার হিসেবে আমাকে সন্মান করত। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না।

বসন্ত যেদিন মারা যায় আমি আমার চেয়ারে বসে খুব কেঁদেছিলাম। হুহুকরে কেঁদেছিলাম। অভিবাবক , বন্ধুত্ব কিংবা বিশ্বস্ততা .... সম্পর্কের সংজ্ঞা কি?

-----
হেডস্যার কোন একজায়গাতে তাঁর স্মৃতি ছাপাবেন বলে ঠিক করেছিলেন। কিন্ত এখন তো আর তাঁর কলম চলেনা।
বুড়ো হয়েছেন। টেবিলে পড়ে থাকা একটা মোটা খাতায় তিনি কিছু লিখতে চেয়েছিলেন। আমি মাঝে মাঝে চোখ বুলাই, লেখা গুলো স্পর্শ করি।
তিনি যেহেতু লিখতে পারেন না তাই লেখার দ্বায়িত্বটা আমার কাঁধেই পড়লো। অসুস্থ অবস্থায় অস্পষ্ট স্বরে তিনি ভয়েজ ম্যাসেজ পাঠাতেন। আমি মন দিয়ে শুনতাম এবং টুকরো টুকরো স্মৃতির গুলো লেখার চেষ্টা করতাম। একসময় দেখলাম অনেকখানি লেখা হয়ে গেছে।
তবে হ্যাঁ এই লেখা কোথাও ছাপা হয়নি। এই পেজের মাধ্যমে অল্প কিছু অংশ প্রকাশ করলাম।
লেখাটা চলবে....

তাঁর হেডস্যার জীবনের অনেক অজানা তথ্য এবং স্মৃতির এই পেজে প্রকাশ করতে পারো আশাকরি।

** আবার বলছি ।এই লেখাটা তাঁর মুখ থেকে শোনা। আমি শুধু গুছিয়ে টাইপ করেছি।

ধন্যবাদ
এডমিন

11/03/2022

'হেডস্যার.... একটি যাত্রা।'

হেডস্যারের অপ্রকাশিত স্মৃতি আসছে খুব শীঘ্রই.....

এডমিন।

ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে ? ...
01/01/2022

ফজরের নামাজের পর আব্বা ডাকছেন- " ও গো ওঠো ওঠো। তোমার কাছে কে যেন এসেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। "
এই ভোরে আমার কাছে কে আসবে ? আমি দরজা খুলে বাইরে গেলাম। দেখি একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে । বুঝলাম অনেক দূর থেকে এসেছে । চোখ দুটো বড় , ফোলা। বোঝা যায় সারারাত ঘুম হয়নি । দীর্ঘ ভ্রমন আর না ঘুমানোর ক্লান্তি স্পষ্ট লেগে আছে চোখে। উনার হাতে একটা চিঠি। আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
তাতে লেখা--
" আমার যদি ভুল না হয় তুমি আবুল কাসেমের ভাই । রুহুল ইসলাম । পত্র পাওয়া মাত্রই বাহকের সাথে চলে আসো।"
চিঠিটা লিখেছেন তেঁতুলিয়া হাইস্কুলের হেডমাস্টার ।

মোঃ রুহুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করলেন না। তাঁর বাবার দেয়া সাহস আর আগ্রহে তিনি যাত্রা শুরু করলেন সূদুর তেঁতুলিয়ার পথে। সেই সাথে একজন হেডস্যারের ৩৮ বছরের যাত্রা শুরু হলো। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১!

আজ ১ লা জানুয়ারি । তাঁর জন্মদিন।

গতকাল হেডস্যার কে হাসপাতাল থেকে বাসাতে আনা হয়েছে।  আলহামদুলিল্লাহ, আজ তিনি বসতে পারছেন। এডমিন
22/10/2021

গতকাল হেডস্যার কে হাসপাতাল থেকে বাসাতে আনা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আজ তিনি বসতে পারছেন।

এডমিন

দাদাভাইয়ের সাথে আমার ২য় ঈদ।
16/05/2021

দাদাভাইয়ের সাথে আমার ২য় ঈদ।

আমার দাদুভাইয়ের জন্মদিন  । ০৮\০২\২০২১
08/02/2021

আমার দাদুভাইয়ের জন্মদিন ।
০৮\০২\২০২১

Address

Nawdapara
Bheramara
7040

Telephone

+8801674252826

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Md. Ruhul Islam (হেডস্যার) posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category