24/04/2026
দুমকি ক্যাম্পাসের বড় ভাইয়ের লেখা
এডমিশন টু গ্র্যাজুয়েশনঃ জীবনের দুই পুলসিরাত
২০১৪ সালে HSC পরীক্ষার পরে হুট করেই মনে হয় সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আর এডমিশন দিবনা, ইন্টারমিডিয়েট এ এতটাই ফাকিবাজি করেছিলাম যে সায়েন্সের সাবজেক্টের ক খ ও জানতাম না। তাই আর্টস বিভাগে পরীক্ষা দিতে গিয়ে রীতিমতো বেগ হতে হয়। সব জায়গায় মেরিটে শেষের দিকে আসত। যার ফলে খুব হতাশ হয়ে যাই। মন থেকে খুব চাইতাম ইশ! কম্পিউটার সায়েন্স রিলেটেড কোনো সাবজেক্টে ভর্তি হতে পারতাম!কিন্তু আর্টস এ পরীক্ষা দেওয়ার কারণে সেটার সুযোগ ছিলনা। তাই হতাশাটাও অনেক বেশি ছিল।
কোথাও চান্স না পেতে পেতে ভাগ্য ফিরে তাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশনে। ওয়েটিং এ ভাল একটা পজিশন আসে। ভেবেই নেই যাক তাহলে অন্তত ইউনিভার্সিটি লাইফে পদার্পন হচ্ছে।
তখনকার সময়ে এন্ড্রয়েড বা স্মার্ট ফোনের আধিক্য ছিলনা, হাতে ছিল একটা Java প্ল্যাটফর্ম ওয়ালা মোবাইল, Opera Mini দিয়ে ইন্টারনেট চালাতাম। এক সপ্তাহ পরপর মোবাইলে ইন্টারনেট কিনে অনলাইনে গিয়ে খোজ নিতাম কবে ভর্তি হবে। একদিন শীতের সকাল,মনে হল জগন্নাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এডমিশন পেইজে ঢুকি, হুট করে দেখি আমার রোলের ভাইভার ডেট পড়েছে, ভাইভা দিয়ে ভর্তি হতে হবে। চোখ গিয়ে পড়ল তারিখ এবং সময়ের দিকে। দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। একদিন আগে তারিখটা পার হয়ে গেছে। ভাবলাম যে তবুও যাবো কিনা। কিন্তু কি যেন ভেবে আর গেলাম না। শুরু হলো বাড়তি ডিপ্রেশনের।
ন্যাশনালে ভর্তি হয়ে কাটিয়ে দিলাম কিছুদিন। এরপর আবার এডমিশন টাইম চলে আসল। এবার ভাবলাম যে কষ্ট করে হলেও সায়েন্স এই দেই। কিছু বই কিনে পড়া শুরু করলাম। কিন্তু কোথাও চান্স হচ্ছিল না। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর পরীক্ষাটা সবার লাস্টে ছিল। পবিপ্রবিতে যেদিন পরীক্ষা ছিল তার পরেরদিন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফর্ম ফিলাপ এর তারিখ ছিল, যদি মিস করি তাহলে আরো এক বছর নষ্ট হবে। কিন্তু কি যেন ভেবে ডিসিশন নিলাম পবিপ্রবি তেই এক্সাম দেবো। ন্যাশনালে ফর্ম ফিলাপ করব না। তো পরীক্ষা দেই, কেমন হয়েছিল তখন বুঝতাম না, ভাবতাম হলো ত মোটামুটি। পরীক্ষার দুইদিন পরে রেজাল্ট হলো, দেখলাম মেরিটেই চান্স হয়ে গেলো।
এরপর সেখানে থাকারই প্ল্যান করে ফেললাম। ভর্তি হলাম নিউট্রিশন এন্ড ফুড সায়েন্স অনুষদে। বাসা নাটোর হওয়াতে ইউনিভার্সিটি অনেক দূরে ছিল। তাই ১/২ মাস দেরি করে ভার্সিটিতে যাই। ক্লাস এর গ্যাপ, পড়াশোনা থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি কারণে মনে হচ্ছিল সবার সাথে তাল মেলাতে পারছিনা। দেরি করে আসার কারণে ব্যাচমেট বা সিনিয়র কারও সাথে পরিচিত হওয়া হয়নি, একেবারেই নতুন পরিবেশ, অবস্থান, সবকিছু মিলিয়ে একটা প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় আমার জন্য, প্রচুর ডিপ্রেসড থাকতাম।
আবার অইদিকে মন তখনও পড়ে আছে সিএসই তে, লাইব্রেরি থেকে C,C+,Java এগুলোর বই নিয়ে আসতাম, পড়তাম। নিউট্রিশন রিলেটেড পড়াশোনা ভাল লাগত না। নিজের ইচ্ছা আর একাডেমিক মিল না হওয়াতে কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারতাম না। যার ফলে ডিপ্রেশনটা ক্রমশঃ বেড়েই চলছিল
সবাই যখন ঘুমিয়ে যেত আমি হলের বারান্দায় মন খারাপ করে বসে থাকতাম,ভাবতাম এখানে আমি মানিয়ে উঠতে পারব না তারচেয়ে বাসায় গিয়ে কম্পিউটারের দোকান দেব,সারাদিন কম্পিউার নিয়ে বসে থাকব আর গান ডাউনলোড ,ফর্ম ফিলাপ করার মাধ্যমে দোকান চালাবো 😛
বৃহস্পতিবার কিংবা ছোট খাটো ছুটিতে সবাই বাড়ি যেত, কিন্তু আমি যেতাম না।প্রচুর রাত জাগতাম আর এশেজ এর গান শুনতাম। প্রায় দিনই ভোরে ঘুমাতে যেতাম।
এভাবে প্রথম সেমিস্টার পার হলো, ভাবলাম হয়ত ফেল করব। কিন্তু অবাক করে দিয়ে সব সাবজেক্টে পাস করে ফেললাম। যেখানে ভেবেছিলাম যে ফেল করব কোন একটা সাবজেক্টে, সেখানে সব বিষয়ে পাস করাটা অনেক বড় অর্জন মনে হলো।
তখন লাইফ সুন্দর করার জন্য মোটিভেশন খুজতাম। বেড আর দেয়ালের আশেপাশে অনেক মোটিভেশনাল লাইন লিখে রাখতাম। শুয়ে শুয়ে সেগুলো দেখতাম আর ভাবতাম কবে সকল ডিপ্রেশন দূর হবে। ভেবেই নিয়েছিলাম এই লাইফ আর চেঞ্জ হবেনা কখনো।
সেকেন্ড সেমিস্টারে বন্ধু হলো কিছু, সিদ্ধান্ত নিলাম ক্লাস মিস দিবোনা। পড়াশোনা ত এমনিও করিনা, কিন্তু ক্লাসে অন্তত প্রেজেন্ট থাকব। সব ফ্রেন্ডরা একসাথে ক্লাসে যেতাম। কিন্তু প্রত্যেকটা ক্লাসে ৫/৬ মিনিট লেট করে যাওয়া হতো। এক বন্ধুর নাম ত মিঃ লেটম্যান ই হয়ে গেল এই দেরি করার দরুন। আমরা ছিলাম ব্যাকবেঞ্চার। ক্লাস শেষে সবাই আড্ডা দিতাম, বিকেলে ঘুরতাম, রাতে কার্ড খেলতাম, কারেন্ট চলে গেলে ছাদে গিয়ে গান গাইতাম। লাইফটা তখন এনজয় করা শুরু করলাম। ভাবলাম লাইফ ত এই একটাই, যা পারি এনজয় করে নেই।
রাত ১/২ টায় ফ্রেন্ডদের সাইকেল নিয়ে গ্রুপ ভাবে বের হয়ে পরতাম, দূর দুরান্তে ঘুরে বেড়াতাম। রুমে এসে লাইট বন্ধ করে গান গাইতাম। তখন দেখলাম আমার সেই আগের ডিপ্রেশন টা ঠিক আগের মত নেই। সব কিছু হাল্কা লাগা শুরু হলো। এরপর পরীক্ষার সময় আসলো, পরীক্ষার আগের দিন থেকে সবাই খুব সিরিয়াস। রাত ২/৩/৪ টা পর্যন্ত পড়ত সবাই।
সেভাবে এক্সাম দিয়ে দেখলাম হুট করেই সেমিস্টারে প্রথম হয়ে গেলাম, সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়ে গেলাম। খুবই অবাক, সবার মত আমিও ভাবলাম আসলেই কিভাবে রেজাল্ট এত ভাল হয়ে গেল! কেননা পরীক্ষার আগে ছাড়া আমার সাথে বই খাতার কোন সম্পর্ক ই থাকত না,যেই আমি কিনা প্রথম সেমিস্টারে টেনেটুনে পাশ সেই দ্বিতীয় সেমিস্টারে ৩.৭+ পেয়ে গেলাম!! তখন আসলে বুঝতে শুরু করলাম, লাইফটা এনজয় করতে হবে। যে জিনিসটা আমি পছন্দ করিনা সেটাতে আমি ভাল করবনা, তাই জীবনকে উপভোগ করতে হবে।
এরপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পঞ্চম-ষষ্ঠ আর সপ্তম-অষ্টম সেমিস্টারে ডিন’স মেরিট এওয়ার্ডও আমার হয়ে গেল, অনার্স এবং মাস্টার্স ভালভাবেই পার হয়ে গেলো। মাস্টার্স করার পাশাপাশি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করা শুরু করলাম।সিজিপিএ ৩.৯০ নিয়ে মাস্টার্স শেষ হলো, ব্যাংকের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সরকারী চাকরির পড়াশোনা শুরু করলাম ২০২২ এ। ৬ মাস পর পরীক্ষা ছিল সমন্বিত ব্যাংকের, সেটায় টিকে গেলাম। এরপর সোনালী ব্যাংক এ সিনিয়র অফিসার হিসেবে জয়েন করলাম ২০২৪ এ, এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক এ সহকারী পরিচালক হিসেবে জয়েন করলাম ২০২৫ এ ।
নিজের এই খাদে পড়া লাইফ থেকে উঠে যে শিক্ষাটা পেলাম সেটা হচ্ছে :
> মনোবল দৃঢ় রাখতে হবে, ভাংবেন কিন্তু মচকাবেন না এমন।
> নিজের উপর আস্থা আর সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা অন্ধকার পথের একমাত্র আলো।
> জীবনটা উপভোগ করা জরুরি, মানুষ ক'দিন ই বা বাঁচে!
>ক্ষমা করতে শেখা,সবার আগে নিজেকে ক্ষমা করতে হয় সব কিছুর জন্য নিজেকে দোষ দিতে নেই।
>আপনার ইচ্ছা শক্তি থাকলে যে কোন প্রতিকূল অবস্থা ই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
>হারিয়ে যাবার অনেক কারন থাকতে পারে আর এই কারণগুলোকে অযুহাত বলে, অযুহাত অনেক থাকতে পারে কিন্তু নিজেকে প্রমান করার জন্য একাগ্রতা আর পরিশ্রম ই যথেষ্ট
> ডিপ্রেশনে থাকলে সেটা থেকে বের হওয়ার উপায় নিজেকেই ঠিক করতে হবে,এমন কিছু করুন যেটা আপনার মন ভাল রাখে হোক তা খেলাধুলা বা ঘোরাঘুরি বা কোন শখের কাজ।
> লাইফে কিছু ভাল বন্ধু জীবনের দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার গুলোর অন্যতম
> আড্ডা বা ঘোরাঘুরি এগুলা আসলে সময় নষ্ট নয় আপনার মেন্টাল হেলথ ফ্রেশ রাখার উপায়
> ব্যাস্ত সময় একটা ব্লেসিং। একাকিত্ব দূর করতে হবে,কারন অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা
> যেটা অর্জন করতে চান সেটার জন্য লেগে থাকতে হবে,পজিটিভ জেদ একটা যাদুর কাঠির মতন।
মোঃ খালেদ মাসুদ
সহকারী পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংক
সাবেক সিনিয়র অফিসার
সোনালী ব্যাংক পিএলসি
́n
19/04/2026
18/04/2026
10/04/2026
04/03/2026
03/03/2026