01/05/2024
"আমার স্মৃতিতে আমার মুর্শিদ;
হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর কেবলা রহ."
-অধ্যাপক আবু জাফর মুকুল
১৯৯৩ সালে আমি যখন বাকেরগঞ্জের কাকরধা কলেজে চাকরি নিলাম তখন কলেজের পাশাপাশি রোকোনুদ্দীন সিনিয়র মাদরাসায়ও পাঠদান করতাম। তৎকালীন ওখানকার সবচেয়ে প্রবীণ শিক্ষক, পরবর্তীতে লেখক ও গবেষক জনাব মাও: ইয়াকুব সাহেবের সাথে আমার চমৎকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উনি একদিকে যেমন ছিলেন মহৎ ব্যক্তি, অপরদিকে ছিলেন প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী। ইসলাম সম্পর্কে আমি উনার কাছে যত প্রশ্ন করেছি তার সবগুলোরই সদুত্তর পেয়েছি। যাই হোক, ঐ সময় পর্যন্ত আমি ধারণা করতাম- সত্য জ্ঞান দর্শনের মাধ্যমে মানুষ মহৎ হতে পারে। কিন্তু উনি আমার ধারণা পাল্টে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শুধু সত্য জ্ঞান নয়, সত্য জ্ঞান এবং মহৎ জ্ঞান অনুযায়ী জীবন-যাপনকারী ব্যক্তির ছোহবাত এখতিয়ারের মাধ্যমে মহৎ মানুষ হওয়া যায়।’ এভাবে বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে এক পর্যায়ে উনার কাছ থেকে হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুরের নাম এবং হুজুরের বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে অবগত হই। কেন জানি না, না দেখা হুজুর কেবলা আমার হৃদয়ে এমন আসন করে বসলেন যে, তাঁকে দেখার জন্য মাঝে-মাঝে মনটা অস্থির হয়ে উঠত এবং ভাবতাম, হায়! এমন সুন্দর মানুষ এই পৃথিবীতে এখনও আছে, অথচ হুজুরকে দেখার সৌভাগ্য আমার হল না! একটি প্রচলিত কথা আছে ‘মানুষ যা চায় তা পায় না’। সব সময় আমার কাছে এ কথাটি যথাযথ সত্য হিসেবেই বিবেচিত ছিল কিন্তু বর্তমানে তা নয়। আমি মনে করি, মানুষ যা চায় তার সবটুকু না পেলেও কিছু কিছু পায়। এ সত্যের পথ ধরে আমি একদিন ঠিকই কায়েদ ছাহেবকে পেয়ে গেলাম, শুধু পেয়েই গেলাম না তাঁর সান্নিধ্যে দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর কাটিয়ে দিলাম। এই পনেরো বছর আমার হৃদয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আমার জীবনে হুজুরের সান্নিধ্য পাওয়ার ইতিহাস আশ্চর্য ও অলৌকিক বলা চলে। কেননা, কোথায় কুষ্টিয়া, কোথায় কাকরধা আর কোথায় ঝালকাঠি। ১৯৯৪ সালে এক ঈদের ছুটিতে আমি কাকরধা থেকে লঞ্চে বরিশাল যাচ্ছিলাম। পথে নেছারাবাদ মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্যক্ষ কায়েদ ছাহেব হুজুরের মেঝ জামাতা জনাব মাও: আব্দুছ ছাদেক ছাহেবের সাথে পরিচয় হয়। উনি এক পর্যায়ে আমাকে বললেন, আপনার কথা অনেকের কাছে শুনেছি, আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের মাদ্রাসায় আসতে পারেন, আমাদের বাংলা প্রফেসরের পদ শূন্য হয়েছে। কথাটি বলামাত্র আমি রাজি হয়ে গেলাম। এরপর নিয়োগ পরীক্ষা শেষে মাদ্রাসায় যোগদান করে আমার গন্তব্য কাকরধা চলে গেলাম। সেদিন অনেকক্ষণ ধরে হুজুরের পাশে বসে কথা বলেছিলাম। এরপর মাস চারেক পর সপরিবারে নেছারাবাদ চলে এলাম।
সে সময় মাদ্রাসার এরিয়া ছিল বর্তমান প্রধান গেটের পূর্ব থেকে পশ্চিমে খাল পর্যন্ত উত্তর এরিয়া। মেইন গেটের সোজা পূর্বে রাস্তার ওপর ছিল ব্রিজ। বর্তমান মেইন গেটটি একটি খালের ওপর। খালটি নদী থেকে বেরিয়ে সোজা মেইন গেট থেকে হাতখানেক পশ্চিমে এগিয়ে আবার উত্তরে হাত খানেক ঘুরে আবার সোজা পশ্চিমের খালের সাথে মিশে গিয়েছিল। তখন বোর্ডিং ছিল বর্তমান মসজিদের উত্তরের অর্ধাংশের ওপর একটি টিনের দোতলা ঘর। হুজুরের থাকার জায়গা ও খানকা একই রুমে ছিল একটি ওয়াল করা টিনের ঘরের মধ্যে। রুমটির অবস্থান ছিল হুজুরের মাযারের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। মাদ্রাসার অবস্থান বর্তমান মসজিদের দক্ষিণের তিন তলা বিল্ডিং এর দোতলা পর্যন্ত। অবশ্য বিল্ডিং এর দক্ষিণ কোণ থেকে সোজা পূর্বে রাস্তা পর্যন্তও একটি টিনের ঘর ছিল, কিন্তু ঘরটি ছিল অত্যন্ত নাজুক। তখন সকল ক্লাস মিলে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৭০-৮০ জন মাত্র । মাদরাসায় যোগদানের পর ৬/৭ মাস দেখেছি ছাত্ররা নিয়মিত আসত না। এ সময় মাদ্রাসার খুব দুঃসময় চলছিল বলা চলে। কিন্তু এ ব্যাপারে হুজুরের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিনি বরং তখনও তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সাথে কথা বলতেন ও আমাকে মাঝে-মাঝে বলতেন, ‘এখানে আপনার কেমন লাগছে? কোন অসুবিধা হয় কিনা?’ ইত্যাদি।
আমি হুজুরের প্রতি প্রথম মুগ্ধ হলাম অধ্যক্ষ মাও: আব্দুল বারী ছাহেবের বিদায়ের পর অধ্যক্ষ নিয়োগ বিষয়ে। গভর্নিং বডির সকল সদস্য এমনকি মাদরাসার অত্যন্ত আপনজন ঝালকাঠি ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জনাব মাও: আব্দুর রশীদ ছাহেব পর্যন্ত হুজুরকে অনুরোধ করলেন হুজুরের একমাত্র ছেলে বর্তমান অধ্যক্ষ মাও: খলীলুর রহমান নেছারাবাদী ছাহেবকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ করার জন্য। হুজুর কিছুতেই রাযী হলেন না। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আ: ওয়াহেদ ছাহেব একরকম জোর করেই বর্তমান অধ্যক্ষ সাহেবকে নিয়োগ দান করলেন এবং হুজুরকে বললেন, ‘হজুর! আপনি আমার কথায় অমত করবেন না। কেননা আমি অনেক ভেবে দেখেছি, বর্তমান অবস্থা থেকে মাদ্রাসাকে উন্নত করে দাঁড় করাতে এই মুহূর্তে আপন, ত্যাগী ও যোগ্য ব্যক্তির অত্যন্ত প্রয়োজন। আমার বিশ্বাস, মাওলানা খলীল সাহেবের মধ্যে সে যোগ্যতা আছে।’ আমি সেদিন অবাক হয়েছিলাম এই দেখে, এ জীবনে বাবাদের দেখেছি ছেলেদের চাকরির জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ধরণা দিতে, দেখেছি ঘুষ দিয়ে চাকুরির ব্যবস্থা করতে। সেখানে একজন বাবা হয়ে ছেলের চাকরির জন্য বাধা সৃষ্টি করেন, অবাক নীতিবোধ!
আশ্চর্য হওয়া এখানেই শেষ নয়। আমার আশ্চর্য হওয়া দেখে উপাধ্যক্ষ জনাব মাও: আ: ছাদেক ছাহেব বলেছিলেন, স্যার! এতেই অবাক হলেন, আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন, মাদরাসা যখন কামিল হল, তার আগে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে যারা পরিদর্শনে এসেছিলেন তারা হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। হুজুর তাদের বলেছিলেন, ‘মাদ্রাসা কামিল পর্যায়ে যেতে যা যা লাগে তা কিন্তু এখানে নেই। ওনারা যদি কাগজ কলমে দেখিয়ে থাকেন আমি মনে করি মিথ্যে দেখিয়েছেন; কামিল চালানোর মত যোগ্যতা আমাদের নেই বলে আমি মনে করি। আপনারা ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ হুজুরের এই সত্যবাদিতার কারণে তারা এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, কামিলের শুধু স্বীকৃতিই দেননি বরং স্বীকৃতির সাথে বিলও দিয়েছিলেন। এভাবে অতীতের যত কথা হুজুর সম্পর্কে শুনতে লাগলাম, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আমার তত বাড়তে লাগল। এর মধ্যে হুজুরের জযবা শুরু হয়ে গেল।
জযবায় হুজুরের কার্যক্রম আমার বেশ ভাল লাগছিল। কেননা, আলেম-ওলামাদের ইতঃপূর্বে আমি যে অবস্থায় দেখেছি, হুজুরের অবস্থাটা ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। অধিকাংশ আলেম সাধারণতঃ মানুষের সাথে মিশে থাকে, কথা বলে থাকে নামায-রোযা ও ধর্মীয় কাজ নিয়ে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ ইত্যাদি কর্মকা-ের প্রতি অনেকটাই উদাসীন। তারা ধর্মীয় কর্মকা-ের মাধ্যমেই তাদের জীবিকার সংস্থানকে চূড়ান্ত বলে মনে করেন। যে ইমামতি করে সে ইমামতির মাধ্যমে, যে আযান দেয় সে আযানের মাধ্যমে, যে কোনো মক্তবে বা মাদ্রাসায় পড়ায় সে ঐ পেশাকেই তার জীবিকার একমাত্র উপায় হিসেবে গণ্য করে। এ কারণে তারা আর্থিক দিক থেকে যেমন দুর্বল, সামাজিক গুরুত্বের দিক দিয়েও অবহেলিত। আমার কাছে বরাবর এটা খুবই কষ্টদায়ক ছিল।
হুজুরের মধ্যে আমি দেখলাম এর বিপরীত চরিত্র। তিনি একদিকে ছিলেন একজন বড় আলেম, অন্যদিকে ছিলেন কর্মবীর এবং বলিষ্ঠ সমাজসেবক। হুজুরকে দেখলাম সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে সর্বশ্রেণীর, সর্বজাতির কল্যাণকামী এক মহান ব্যক্তি হিসেবে। আমি হুজুরকে দেখতাম, খাল-বিল, নদ-নদী বিধৌত বাংলার আর দশজন সৌখিন অথবা পেশাজীবী সাহসী শিকারীর মত একাগ্রচিত্তে চাই অথবা ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরতে; দেখতাম পেশাজীবী ফলমুল বিক্রেতার মত মৌসুমী তরকারি, ফুট, তরমুজ, পেয়ারা ইত্যাদি কাউখালী, আটঘর-কুরিয়ানাসহ বিভিন্ন পাইকারী কাঁচা বাজার থেকে কিনে এনে সের-মূলে, কেজি-মূলে বিক্রি করতে। এর পাশাপাশি তিনি আমার কাছে আবিষ্কৃত হলেন এক উদ্ভাবনী শক্তির আকর হিসেবে। আবার দেখতাম তিনি নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরী পেয়ারার জেলি, তেঁতুলের চাটনি ও আমড়ার জুস এগুলো শুধু তৈরি নয়; বরং বিক্রি, বাজারজাতকরণ এবং এগুলোর গুণও বর্ণনা করতেন। এগুলো আবিষ্কারের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেন, ‘আমার উদ্দেশ্য আপনাদেরকে কর্মমুখীকরণ, দেশী সম্পদের সদ্ব্যবহার করণ এবং ইহুদী পণ্য বর্জনে উৎসাহিত করা।’ হুজুর যখন তেঁতুলের চাটনী ও পেয়ারার জেলি আবিষ্কার করেন তখন এ দেশের কোনো বিজ্ঞানী অথবা আবিষ্কারক এগুলো নিয়ে ভাবেননি এমনকি কাজও করেননি। এখন দোকানে দোকানে বিভিন্ন নামি-দামি কোম্পানীর চাটনী নজরে পড়ে এবং পেয়ারার জেলি তৈরির কাজও নাকি চলছে। এছাড়াও আরো অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি আমি দেখেছি, যা নিয়ে প্রয়োজনের অনেক আগেই তিনি ভেবেছেন এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়েছেন। পরবর্তীতে ইনশাআল্লাহ সেগুলো বর্ণনা করার চেষ্টা করব।
যে কথা বলছিলাম । হুজুর ঐ সময় চায়ের বিকল্প জোশান্দা পান করার ওপর খুব গুরুত্বারোপ করতেন। তিনি বলতেন, ‘চা শীত প্রধান দেশের জন্য প্রযোজ্য, আমাদের দেশের জন্য নয়। আমাদের দেশের লোক যদি চায়ের প্রতি বেশি আসক্ত হয় তাতে আলসার, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিদ্রার মত বেশকিছু জটিল সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি এ সমস্যা অনেকের মধ্যে দেখাও যাচ্ছে। এসব সমস্যা উপলব্ধি করে আমি চিন্তা করলাম, চা পানের প্রতি মানুষের যে অভ্যাস হয়েছে তা দূর করা সম্ভব নয় বরং এর বিকল্প এমন কিছু আবিষ্কার করা দরকার যা পানের মাধ্যমে মানুষের অভ্যাসের ওপরও আঘাত না আসে, অন্য দিকে উপকারও হয়। এক সময় মাথায় ঢুকল রসূল মেহেদী পাতা দাড়িতে লাগাতেন, এমনকি মাথায় দিতেন মাথা ঠান্ডা করার জন্য। তাহলে নিশ্চয়ই এর মধ্যে এমন গুণ আছে যা দ্বারা চায়ের বিকল্প পানীয় হিসেবে পান করা সম্ভব। তৈরি করে ফেললাম। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি, আমি সফল হয়েছি।’ শুনেছি একবার ঝালকাঠির বিজ্ঞান মেলায় চায়ের বিকল্প জোশান্দার প্রজেক্ট প্রথম স্থান পেয়েছিলে। এখন দেখতে পাই, চা পানে যে ক্ষতি হয়, জোশান্দা পানে তা হয় না; এর পাশাপাশি আমাশয় ও মেয়েদের শ্বেতপ্রদরের মত জটিল রোগেও জোশান্দা এক মহৌষধ।
হুজুর এই কথাগুলো এত গুরুত্ব দিয়ে বলতেন যে, সাধারণ মানুষ অতি মুগ্ধ হয়ে শুনতো। হুজুরের এই আগ্রহ দেখে অধ্যক্ষ সাহেব ১৯৯৮ সালে প্রধান গেইটের দুই পাশে বিরাট জোশান্দা বাগান করেছিলেন এবং জোশান্দার গুণ বর্ণনা করে লিফলেট ছাপিয়েছিলেন। এ বাগানের পাতা বিক্রি করে তখন কয়েক হাজার টাকা আয় হয়েছিল। বর্তমানে ঝাউ গাছ বড় হওয়ায় জোশান্দা বাগান প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে বলা চলে। এ বাগান দেখে হুজুর এত খুশী হয়েছিলেন যে, অনেককে বলতেন, আপনার বাড়িতে জোশান্দা গাছ লাগিয়ে আমাদের কাছে পাতা বিক্রি করতে পারবেন, আপনার অতিরিক্ত আয় হবে। সে সময় অনেকের মধ্যেই বিষয়টি সাড়া জাগিয়েছিল। এমনকি, ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে হুজুরের কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছিল। এতে তখন হুজুরের আরেকটি বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছিল। তা হল, ভেষজ চিকিৎসার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ। এ সময় হুজুরের খানকার সামনে ঔষধী গাছ-গাছড়ার একটি ছোট্ট বাগান ছিল এবং ঐ বাগানের মধ্যে বিভিন্ন সুগন্ধি ফুলের গাছ ছিল। জযবার সময় হুজুর যখন ঐ বাগানের পাশ দিয়ে হাঁটতেন তখন তাঁকে দেখেছি বিভিন্ন গাছের পাতা তুলতে, শিকড় উঠাতে, গাছের ছাল উঠাতে এবং ঐগুলোর গুণাগুণ বর্ণনা করতে। এখন ভেষজ চিকিৎসার ওপর সরকার যেভাবে গুরুত্বারোপ করেছে তেমনি দেশ ও বিদেশে এর ওপর ব্যাপক চর্চা চলছে। অথচ হুজুর যখন এর ওপর চর্চা করেছিলেন তখন ভেষজ চিকিৎসার ওপর কারোই তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না। আমার মনে আছে, হুজুরের এই আগ্রহ দেখে এল.জি.ই.ডি'র তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী, পরবর্তীতে সচিব মরহুম কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ছাহেব হুজুরের জন্য বিশ খ-ের ভেষজ চিকিৎসার ওপর গবেষণামূলক বই উপহার দিয়েছিলেন। হুজুর প্রায়ই বলতেন, ‘আমি তো মনে করি, মানুষ যেখানে বসবাস করে, আল্লাহ তায়ালা তার আশেপাশের গাছ-গাছড়ার মধ্যেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা রেখেছেন। আমাদের গবেষণার দ্বারা সেগুলো আবিষ্কার করতে হবে। আমরা তো ফেকের করি না, জানব কি করে?’ বিষয়টা কিন্তু হুজুরের কথার কথা ছিল না, তিনি এ ব্যাপারে গবেষণা করেছেন, সফলও হয়েছেন। আমার মনে আছে, অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য হুজুর ঝালকাঠির নিরঞ্জন কবিরাজকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট ভেষজ গবেষণা পরিষদ গঠন করেছিলেন, যার সদস্য আমি নিজেও ছিলাম। এ কমিটির জন্য বেশ কয়েকটি খাতা হুজুর নিজের টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছিলেন।
হুজুর একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ‘মানুষের দেহে যে জিনিসের অভাব হবে, সেই জিনিস খাওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি হবে।’ অনেক সময় হুজুর আমাদের জিজ্ঞেস করতেন, ‘বলেন, আপনাদের টক, মিষ্টি, ঝাল এর মধ্যে কার কোনটা পছন্দ?’ যারা বলত, মিষ্টি পছন্দ। হুজুর বলতেন, আপনার দেহে সুগারের অভাব। যারা বলত, টক পছন্দ-তাদের বলতেন, ভিটামিন সি এর অভাব। এভাবে অসংখ্য জটিল প্রশ্নের উত্তর তিনি এত সহজ করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করতেন যে, মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর পাশে বসে থাকা ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না। একদিন হুজুর নেছারাবাদ মাদ্রাসার শিক্ষক জনাব আলমগীর ছাহেবের বাসায় উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলছেন। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, প্রফেসর সাহেব! আপনার স্বাস্থ্য খারাপ নাকি? বাস্তবিকই তখন দু’তিন দিন আমার শরীরটা-বিশেষ করে হাত এবং পায়ের তালু খুবই গরম মনে হচ্ছিল বিধায় কোনো কাজের প্রতি মনোযোগী হতে পারছিলাম না। আমি উত্তর দিলাম, জি। পাশাপাশি হাত-পা গরমের কথাও বললাম। হুজুর হাসতে হাসতে বললেন, ‘দুই টাকা ভিজিট দেন, আমি এমন একটি ওষুধ দেবো যা খেলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে আপনার হাত-পায়ের গরম স্বাভাবিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।’ পরে আবার বললেন, ‘না, ভিজিট থাক। মাস্টার আলমগীর, স্যারের জন্য একটা বিচি কলা নিয়ে আসেন। আলমগীর সাহেব বিচি কলা এনে আমাকে দিলেন। হুজুর আমাকে খেতে বললেন, আমি খেয়ে ফেললাম। এরপর বিভিন্ন কথার এক পর্যায়ে হুজুর আধা ঘন্টার কথা ভুলেন নি। হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আধা ঘণ্টা হয়েছে? আমি বললাম, জি হুজুর। তখন হুজুর আমার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনার হাত কি সে রকম গরম আছে?’ আমি বললাম, ‘না হুজুর, আমার শরীরটাও ভাল লাগছে।’ এবার হুজুর রসিকতা করে বললেন, ‘এত বড় চিকিৎসার পরও কিন্তু আপনারা আমাকে ডাক্তার হিসেবে জানবেন না।’ হুজুরের কথায় আমি শুধু হাসলাম।
এছাড়া তাল খেলে এবং তালের রস খেলে কেন সুনিদ্রা আসে? এ প্রসঙ্গে হুজুর বলতেন-‘আমার মনে হয়, তাল গাছের শিকড় যেমন মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং মাথা সাধারণ গাছ থেকে ওপরে থাকে বিধায় তাল গাছের শিকড় যেমন মাটির গভীরের ঠান্ডা পানি গ্রহণ করে তেমনি গাছের মাথা অন্য গাছের ওপরে থাকার কারণে ওপরের ঠান্ডা বাতাস গ্রহণ করে। আর এ উভয় প্রকার ঠান্ডার সংমিশ্রণে ঐ গাছ থেকে যা উৎপাদিত হয় তা সবই দেহ শীতল বা ঠান্ডা করার জন্য উপযোগী। এ কারণে পাকা তাল খেলে ও রস খেলে সুনিদ্রা আসে।’ হুজুরের এসব কথা আমার কাছে বিনা প্রশ্নেই নির্ভুল বলে মনে হত।
এমনকি পরে কাঁচা আম, পাকা আম, মিষ্টি আম ও টক আমের গুণাগুণের পার্থক্য কী; কাঁঠাল কাদের জন্য খাওয়া উপকারী-কাদের জন্য ক্ষতিকর; পেঁপে কার উপকার করে? কোন অবস্থায় পেঁপে খাওয়া ঠিক নয়; জাম হজমের জন্য উপকারী কিন্তু সবার জন্য নয়। এ রকম শত-শত প্রশ্ন নিজে আমাদের কাছে করতেন। আমরা উত্তর দিতে না পারলে নিজে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতেন।
এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে হুজুর কুরআনুল করীম থেকে এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন ও তরজমা করতেন, ‘ইন্না ফী খালকিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ............... ফাকিনা আযাবান নার।’ ‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে (এবং তাকে সৃষ্ট সকল জীব ও পর্দাথে), দিবা রাত্রির আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি (এবং তাতে সৃষ্ট সকল জীব ও পদার্থ) সম্পর্কে চিন্তা গবেঘণা করে (তখন অন্তরের অন্তস্থল থেকে আপনা আপনি বলে ওঠে) হে আমাদের পরওয়ারদিগার! আপনি এসব অনর্থক সৃষ্টি করেন নি। আমরা আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আপনি আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’
এই আয়াত তেলাওয়াত ও তরজমা করার সময় হুজুর কোনো কোনো সময় এত আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়তেন যে, চোখের পানিতে দু’গাল ভিজে যেত। অথচ আমরা এতই হতভাগা ছিলাম যে, তখন এর অর্থ, সারমর্ম কিছুই উপলব্ধি করার চেষ্টা করিনি। আমরা যেন আদর্শ শিক্ষকের ক্লাসে দায়িত্বহীন ছাত্রের মত; শিক্ষকের ক্লাসে থেকেছি, কথা শুনেছি-কিছুই বুঝার চেষ্টা করিনি। আমাদের এই দায়িত্বহীনতা যে হুজুর বুঝতেন না-তা নয়। মাঝে-মাঝে আমাদের এরূপ উপলব্ধিহীনতা অনুমান করে হাসতে হাসতে বলতেন, ‘আমি বুঝি যা, মায় বোঝে না তা, তবুও বলে ফতা তুই মেজবানে যা।’ আবার কখনো আমাদের বুঝানোটা এত প্রয়োজন মনে করতেন যে, মৌখিকভাবে বুঝাতে ব্যর্থ হলে মসজিদের মধ্যে সবাইকে বসিয়ে ব্লাকবোর্ডে লিখিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করতেন এবং বারবার প্রশ্ন করতেন আমরা বুঝেছে কি না। এর পরেও কিন্তু আমাদের বুঝ তো হতোই না বরং চুপ করে থাকতাম অথবা এমন অপ্রাসঙ্গিক উত্তর দিতাম যে, হুজুর শুনে স্তম্ভিত হয়ে যেতেন এবং অন্তর্বেদনায় কেঁদে ফেলে দিয়ে বলতেন, আমি এই বিরান বাগানের বুলবুলি, আমি সারা জীবন গেয়ে গেলাম; আমার গলার আওয়াজ কেউ বুঝলনা, কেউ শুনলো না।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (বাংলা)
ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা
(প্রকাশিত: মাসিক কায়েদ, এপ্রিল সংখ্যা-২০২৪ইং)