26/04/2026
যার প্রার্থনা করার কোনও মানুষ নেই, সে বড় দুর্ভাগা।
আমরা কখনও জানতেই পারি না, পৃথিবীর কোথায় কে আমাদের জন্য প্রার্থনা করছে, আমাদের সবসময়ই শুভকামনায় রাখছে। এমনও হতে দেখেছি, কেউ এমন একজন মানুষের জন্য প্রার্থনা করছেন, চাইছেন--সেই মানুষটা ভালো থাকুক, তার অসুখবিসুখ না হোক, সে তার পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে বাঁচুক, তার জীবনে কোনো দুঃখ না থাকুক, চলার পথে ঝড় এলে যেন মানুষটা সামলে নিতে পারে, বেঁচে-থাকাটাকে তার কাছে সুন্দর মনে হোক--এরকম আরও অনেক কিছু...আর সে মানুষটা কখনও জানলই না যে কেউ তাকে প্রতিক্ষণেই এত ভালোবাসছে!
না জানলই-বা! কী এসে যায়? কাউকে ভালোবাসলে তাকে জানাতেই হবে? না জানালে ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় কখনও? মানুষটির জন্য পাগলামি কমে যেতে পারে, অস্থিরতার প্রকাশও সময়ের সাথে সাথে ফিকে হয় হয়তো, তবু সত্যিকারের ভালোবাসা বেঁচে থাকে, শেষ অবধি টিকে থাকে। সেই মানুষটির সাথে হয়তো দেখাও হয়, কথাও হয়, তবু কখনওই বলা হয় না--ভালোবাসি, এমন ভালোবাসার কি মূল্য নেই? ভালোবেসে ফেললে বলে দেওয়া যায়... সত্যিই যায়? তবু, যে ভালোবাসে, সে কি আনন্দ পায় না? কাউকে ভালোবাসলে তার জন্য প্রার্থনা মন থেকেই চলে আসে। আর প্রার্থনার অর্থই তো হলো হৃদয়ের ঈশ্বরের সাথে একান্ত আলাপন। এই আলাপন, এই সংযোগসাধন, এই নিভৃতযাপন মানুষের মনের শক্তিকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। ভালোবাসা ধ্যানের মতো, স্বস্তির মতো, আশ্রয়ের মতো।
আমরা যতক্ষণ প্রার্থনা করি, ততক্ষণ আমাদের সাথে ঈশ্বরের গল্প হয়। সে-গল্পে প্রায়ই নিজের অজান্তেই অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে, অনেক অনুভূতির পরিশুদ্ধি ঘটে, অসীম শক্তি এসে ভর করে মনে, জীবনের অনেক নতুন দিক খুলে যায়। আমরা যে-সকল রহস্যের কূলকিনারা করতে পারি না হাজার চেষ্টাতেও, সেগুলির সহজসরল ব্যাখ্যা প্রার্থনার সময় কোথা থেকে যেন চলে আসে। এই যে আনন্দের পথে আশ্চর্য যাত্রা, তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর হয় না।
যাঁরা আর্টিস্ট, তাঁরা যখন সৃষ্টি করেন, তখন তাঁরা হয়তো কোনও প্রিয় মানুষ, ভাবনা বা অস্তিত্বকে মনের মধ্যে গেঁথে রেখে দেন। এতে অনেক সুবিধে হয়, সৃষ্টির কাজটি সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে। জগতের সকল মহৎ সৃষ্টিই প্রার্থনার এক-একটি ফসল। যে-মানুষটি আপনার জুতোজোড়া চকচকে করে দিচ্ছেন, তাঁর কথা ভাবুন তো! তিনি যখন কাজটি করছেন, তখন হয়তো তাঁর মনে ভাসছে তাঁর প্রিয়জনের মুখটি, যাঁর জন্য তাঁর জীবিকার আজকের এই আয়োজন। যখনই তাঁর মন সেই ছবি আঁকছে, তখনই তাঁর কাজটা হয়ে উঠছে প্রার্থনার কাছাকাছি কোনও কিছু। কাজের মান বাড়ছে, আপনার খুশি বাড়ছে।
জুতোর চেহারাবদলের সাথে সাথে আপনার চেহারাও বদলে যাচ্ছে। আপনার আনন্দ, আপনার আত্মবিশ্বাস, আপনার সৌন্দর্য আপনার আশেপাশের সবাইকে স্পর্শ করছে। এই যে নতুন এক মানুষ সৃষ্টি হলো, সে নিশ্চয়ই ওই গরীব মানুষটির অবদান। এখানেই তিনি আর্টিস্ট। এই আর্টের সৃষ্টিপ্রক্রিয়াই হলো প্রার্থনা।
প্রার্থনায় মানুষের দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। শিল্পীর তুলি তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে, লেখকের কলমটি তাঁর সাথে কথা বলে, গায়কের হারমোনিয়াম তাঁর কাছে কী যেন চায়, নরসুন্দরের কাঁচি তাঁকে শাসন করে, ফটোগ্রাফারের লেন্স তাঁর কাছে কিছু দাবি রাখে...ওরা বলে যায়, আমাকে ভালোবাসো! ভয় পেয়ো না, তোমার এই প্রার্থনায় আমি তোমার সাথে আছি। সত্যিই, প্রত্যেক আর্টিস্টই প্রেমে পড়েন--শিল্পসৃষ্টির উপকরণের, তাঁর কাজের, তাঁর নিজের শিল্পীসত্তার, আর্টের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার।
তা থেকেই আসে প্রার্থনা ও আন্তরিকতা।
তাই বলছি, চোখে হাসি ও মনে স্বস্তি নিয়ে বাঁচতে হলে জীবনে এমন কাউকে প্রয়োজন, যাঁর জন্য প্রার্থনা আপনিই চলে আসে, যাঁর কথা ভেবে নিজেকে ভালো রাখতে ইচ্ছে করে। যাঁকে বলে ফেলা যায় না--ভালোবাসি, অথচ প্রতি মুহূর্তের যাপনে সেই মানুষটিই থেকে যায়... শেষ পর্যন্ত...যা-ই ঘটুক না কেন!©পাল দাদা
Bishwajit Dey