18/09/2025
১১৩. সূরা ফালাক এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা ফালাক মদীনায় অবতীর্ণ হয়, আয়াত সংখ্যা ৫ ।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, (২) তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, (৩) অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, (৪) গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে যাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে (৫) এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
*মসনদে আহমদে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহুদী রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইহুদী যাদু করেছে এবং যে জিনিষে যাদু করা হয়েছে, তা অমুক কূপের মধ্যে আছে। রসূলুল্লাহ (সাঃ) লোক পাঠিয়ে সেই জিনিষ কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। তিনি গ্রন্থিগুলো খুলে দেওয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন। জিবরাঈল (আঃ) ইহুদীর নাম বলে দিয়েছিলেন এবং রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে চিনতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অভ্যাস তার কোনদিনই ছিল না। তাই আজীবন এই ইহুদীকে কিছু বলেননি এবং তার উপস্থিতিতে মুখমণ্ডলে কোনরুপ অভিযোগের চিহ্নও প্রকাশ করেননি। কপটবিশ্বাসী হওয়ার কারণে ইহুদী রীতিমত দরবারে হাযির হত।
*সহীহ্ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-্এর উপর জনৈক ইহুদী যাদু করলে তার প্রভাবে তিনি মাঝে মাঝে দিশেহারা হয়ে পড়তেন এবং যে কাজটি করেন নি, তাও করেছেন বলে অনুভব করতেন। একদিন তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) কে বললেন, আমার রোগটা কি আল্লাহ্ তায়ালা তা আমাকে বলে দিয়েছেন। (স্বপ্নে) দু'ব্যক্তি আমার কাছে আসল এবং একজন শিয়রের কাছে ও অন্যজন পায়ের কাছে বসে গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্যজনকে বলল তার অসুখটা কি ? অন্যজন বলল ইনি যাদুগ্রস্থ। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল কে যাদু করল ? উত্তর হল, ইহুদীদের মিত্র মুনাফিক লবীদ ইবনে আ'সাম যাদু করেছে। আবার প্রশ্ন হল কি বস্তুতে যাদু করেছে ? উত্তর হল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হল, চিরুনীটি কোথায় ? উত্তর হল, খেজুর ফলের আবরণীতে 'বরযরওয়ান' কূপের একটি পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। অত:পর রসূলুল্লাহ (সাঃ) সে কূপে গেলেন এবং বললেন স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হয়েছে। অত:পর চিরুনীটি সেখান থেকে বের করে আনলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, আপনি ঘোষণা করলেন না কেন (যে, অমুক ব্যক্তি আমার উপর যাদু করেছে ?) রসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে রোগ মুক্ত করেছেন। আমি কারও জন্য কষ্টের কারণ হতে চাই না।(উদ্দেশ্য, একথা ঘোষনা করলে মুসলমানরা তাকে হত্যা করত অথবা কষ্ট দিত)। মসনদে আহমদের রেওয়ায়েতে আছে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-র এই অসুখ ছয় মাস স্থায়ী হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা এগার আয়াত বিশিষ্ট এ দু'টি সূরা নাযিল করলেন। রসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেক গ্রন্থিতে এক আয়াত পাঠ করে তা খুলতে লাগলেন। গ্রন্থি খোলা সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তিনি অনুভব করলেন যেন একটি বোঝা নিজের উপর থেকে সরে গেছে। ---(ইবনে কাসীর)।
*হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) কোন রোগে আক্রান্ত হলে এই সূরাদ্বয় পাঠ করে হাতে ফু দিয়ে সর্বাঙ্গে বুলিয়ে নিতেন। আমার হাত তার পবিত্র হাতের বিকল্প হতে পারত না। তাই আমি এরুপ করতাম।---(ইবনে কাসীর)।
*হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক রাত্রিতে বৃষ্টি ও ভীষণ অন্ধকার ছিল। আমরা রসূলুল্লাহ (সাঃ) কে খুজতে বের হলাম। যখন তাকে পেলাম, তখন প্রথমেই তিনি বললেন বল। আমি আরয করলাম, কি বলব ? তিনি বললেন, সূরা ইখলাছ ও কুল আঊযু সূরাদ্বয়। সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো তিনবার পাঠ করলে তুমি প্রত্যেক কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে।---(মাযহারী)।
*১নং আয়াত এর শাব্দিক অর্থ বিদীর্ণ হওয়া। এখানে উদ্দেশ্য নিশি শেষে ভোর হওয়া। অন্য এক আয়াতে আল্লাহর গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আল্লাহর সমস্ত গুণের মধ্য থেকে একে অবলম্বন করার রহস্য এই হতে পারে যে, রাত্রির অন্ধকার প্রায়ই অনিষ্ট ও বিপদাপদের কারণ হয়ে থাকে এবং ভোরের আলো সেই বিপদাপদের আশংকা দূর করে দেয়। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যে তার কাছে আশ্রয় চাইবে, তিনি তার সকল মুসীবত দূর করে দেবেন।(মাযহারী)
*২নং আয়াতে আল্লামা ইবনে কাইয়্যেম (রহঃ) লিখেন শব্দটি দু’প্রকার বিষয়বস্তুকে শামিল করে এক. প্রত্যক্ষ অনিষ্ট ও বিপদ, যদ্ধারা মানুষ সরাসরি কষ্ট পায়, দুই. যা মুসীবত ও বিপদাপদের কারণ হয়ে থাকে যেমন কুফর ও শিরক। কুরআন ও হাদীসে যেসব বস্তু থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা আছে সেগুলো এই প্রকারদ্বয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেগুলো হয় নিজেই বিপদ, না হয় কোন বিপদের কারন। আয়াতের ভাষায় সমগ্র সৃষ্টির অনিষ্টই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কাজেই আশ্রয় গ্রহণের জন্য এ বাক্যটিই যথেষ্টে ছিল কিন্তু এস্থলে আরও তিনটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রায়ই বিপদ ও মুসীবতের কারণ হয়ে থাকে।
*৩নং আয়াতের শব্দের অর্থ অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়া। আয়াতের অর্থ এই যে, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই রাত্রি থেকে যখন তার অন্ধকার গভীর হয়। রাত্রিবেলায় জিন, শয়তান, ইতরপ্রাণী কীট-প্রতঙ্গ ও চোর-ডাকাত বিচরণ করে এবং শত্রুরা আক্রমণ করে। যাদুর ক্রিয়াও রাত্রিতে বেশী হয়। তাই বিশেষভাবে রাত্রি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
*৪নং আয়াতের অর্থ ফুঁ দেওয়া। যারা যাদু করে, তারা ডোর ইত্যাদিতে গিরা লাগিয়ে তাতে যাদুর মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেয়। যাদুর কাজ সাধারণত নারীরাই করে এবং জন্মগতভাবে এর সাথে তাদের সম্পর্কও বেশী। এছাড়া রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদুর ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরাদ্বয় অবতীর্ণ হয়েছে। সেই ঘটনায় ওলীদের কন্যারাই পিতার আদেশে রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করেছিল। যাদু থেকে আশ্রয় চাওয়ার কারণ এটাও হতে পারে যে, এর অনিষ্ট সর্বাধিক। কারণ মানুষ যাদুর কথা জানতে পারে না।
অজ্ঞতার কারণে তা দূর করতে সচেষ্ট হয় না। রোগ মনে করে চিকিৎসা করতে থাকে। ফলে কষ্ট বেড়ে যায়।
*৫নং আয়াতে বলা হয়েছে অর্থাৎ হিংসুক ও হিংসা। হিংসার কারণেই রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করা হয়েছিল। ইহুদী ও মুনাফিকরা মুসলমানদের উন্নতি দেখে হিংসার অনলে দগ্ধ হত। তারা সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পেরে যাদুর মাধ্যমে হিংসার দাবানল নির্বাপিত করার প্রয়াস পায়। রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি হিংসা পোষণকারীর সংখ্যা জগতে অনেক। এ কারণেও বিশেষভাবে হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। কারও নিয়ামত ও সুখ দেখে দগ্ধ হওয়া ও তার অবসান কামনা করা। এই হিংসা হারাম ও মহাপাপ। এটাই আকাশে করা সর্বপ্রথম গুনাহ এবং এটাই পৃথিবীতে করা সর্বপ্রথম গুনাহ। আকাশে ইবলীস আদম (আঃ) এর প্রতি এবং পৃথিবীতে আদমপুত্র কাবীল তদীয় ভ্রাতা হাবীলের প্রতি হিংসা করেছে। (কুরতবী) কারও নিয়ামত ও সুখ দেখে নিজের জন্য তদ্রুপ নিয়ামত ও সুখ কামনা করা। এটা জায়েজ বরং উত্তম। এখানে তিনটি বিষয় থেকে বিশেষ প্রার্থনার কথা আছে। কিন্তু প্রথম ও তৃতীয় বিষয়ের সাথে বাড়তি কথা যুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিষয়ের সাথে কোন কিছু সংযুক্ত করা হয়নি। কারণ এই যে, যাদুর ক্ষতি ব্যাপক। কিন্তু রাত্রির ক্ষতি ব্যাপক নয় বরং রাত্রি যখন গভীর হয় তখনই ক্ষতির আশংকা দেখা দেয়। এমনিভাবে হিংসুক ব্যক্তি যে পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে প্রবৃত্ত না হয় সেই পর্যন্ত হিংসার ক্ষতি তার নিজের মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে সে যদি হিংসায় উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষের ক্ষতিসাধনে সচেষ্ট হয় তবেই প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই প্রথম ও তৃতীয় বিষয়ের সাথে বাড়তি কথাগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]