১১৩. সূরা ফালাক এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা ফালাক মদীনায় অবতীর্ণ হয়, আয়াত সংখ্যা ৫ ।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, (২) তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, (৩) অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, (৪) গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে যাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে (৫) এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
*মসনদে আহমদে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহুদী রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। জিবরাঈল (আঃ) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইহুদী যাদু করেছে এবং যে জিনিষে যাদু করা হয়েছে, তা অমুক কূপের মধ্যে আছে। রসূলুল্লাহ (সাঃ) লোক পাঠিয়ে সেই জিনিষ কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। তিনি গ্রন্থিগুলো খুলে দেওয়ার সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন। জিবরাঈল (আঃ) ইহুদীর নাম বলে দিয়েছিলেন এবং রসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে চিনতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারে কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার অভ্যাস তার কোনদিনই ছিল না। তাই আজীবন এই ইহুদীকে কিছু বলেননি এবং তার উপস্থিতিতে মুখমণ্ডলে কোনরুপ অভিযোগের চিহ্নও প্রকাশ করেননি। কপটবিশ্বাসী হওয়ার কারণে ইহুদী রীতিমত দরবারে হাযির হত।
*সহীহ্ বুখারীতে হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-্এর উপর জনৈক ইহুদী যাদু করলে তার প্রভাবে তিনি মাঝে মাঝে দিশেহারা হয়ে পড়তেন এবং যে কাজটি করেন নি, তাও করেছেন বলে অনুভব করতেন। একদিন তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) কে বললেন, আমার রোগটা কি আল্লাহ্ তায়ালা তা আমাকে বলে দিয়েছেন। (স্বপ্নে) দু'ব্যক্তি আমার কাছে আসল এবং একজন শিয়রের কাছে ও অন্যজন পায়ের কাছে বসে গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্যজনকে বলল তার অসুখটা কি ? অন্যজন বলল ইনি যাদুগ্রস্থ। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল কে যাদু করল ? উত্তর হল, ইহুদীদের মিত্র মুনাফিক লবীদ ইবনে আ'সাম যাদু করেছে। আবার প্রশ্ন হল কি বস্তুতে যাদু করেছে ? উত্তর হল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হল, চিরুনীটি কোথায় ? উত্তর হল, খেজুর ফলের আবরণীতে 'বরযরওয়ান' কূপের একটি পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। অত:পর রসূলুল্লাহ (সাঃ) সে কূপে গেলেন এবং বললেন স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হয়েছে। অত:পর চিরুনীটি সেখান থেকে বের করে আনলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, আপনি ঘোষণা করলেন না কেন (যে, অমুক ব্যক্তি আমার উপর যাদু করেছে ?) রসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে রোগ মুক্ত করেছেন। আমি কারও জন্য কষ্টের কারণ হতে চাই না।(উদ্দেশ্য, একথা ঘোষনা করলে মুসলমানরা তাকে হত্যা করত অথবা কষ্ট দিত)। মসনদে আহমদের রেওয়ায়েতে আছে রসূলুল্লাহ (সাঃ)-র এই অসুখ ছয় মাস স্থায়ী হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা এগার আয়াত বিশিষ্ট এ দু'টি সূরা নাযিল করলেন। রসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রত্যেক গ্রন্থিতে এক আয়াত পাঠ করে তা খুলতে লাগলেন। গ্রন্থি খোলা সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তিনি অনুভব করলেন যেন একটি বোঝা নিজের উপর থেকে সরে গেছে। ---(ইবনে কাসীর)।
*হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) কোন রোগে আক্রান্ত হলে এই সূরাদ্বয় পাঠ করে হাতে ফু দিয়ে সর্বাঙ্গে বুলিয়ে নিতেন। আমার হাত তার পবিত্র হাতের বিকল্প হতে পারত না। তাই আমি এরুপ করতাম।---(ইবনে কাসীর)।
*হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক রাত্রিতে বৃষ্টি ও ভীষণ অন্ধকার ছিল। আমরা রসূলুল্লাহ (সাঃ) কে খুজতে বের হলাম। যখন তাকে পেলাম, তখন প্রথমেই তিনি বললেন বল। আমি আরয করলাম, কি বলব ? তিনি বললেন, সূরা ইখলাছ ও কুল আঊযু সূরাদ্বয়। সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো তিনবার পাঠ করলে তুমি প্রত্যেক কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে।---(মাযহারী)।
*১নং আয়াত এর শাব্দিক অর্থ বিদীর্ণ হওয়া। এখানে উদ্দেশ্য নিশি শেষে ভোর হওয়া। অন্য এক আয়াতে আল্লাহর গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে আল্লাহর সমস্ত গুণের মধ্য থেকে একে অবলম্বন করার রহস্য এই হতে পারে যে, রাত্রির অন্ধকার প্রায়ই অনিষ্ট ও বিপদাপদের কারণ হয়ে থাকে এবং ভোরের আলো সেই বিপদাপদের আশংকা দূর করে দেয়। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, যে তার কাছে আশ্রয় চাইবে, তিনি তার সকল মুসীবত দূর করে দেবেন।(মাযহারী)
*২নং আয়াতে আল্লামা ইবনে কাইয়্যেম (রহঃ) লিখেন শব্দটি দু’প্রকার বিষয়বস্তুকে শামিল করে এক. প্রত্যক্ষ অনিষ্ট ও বিপদ, যদ্ধারা মানুষ সরাসরি কষ্ট পায়, দুই. যা মুসীবত ও বিপদাপদের কারণ হয়ে থাকে যেমন কুফর ও শিরক। কুরআন ও হাদীসে যেসব বস্তু থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা আছে সেগুলো এই প্রকারদ্বয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেগুলো হয় নিজেই বিপদ, না হয় কোন বিপদের কারন। আয়াতের ভাষায় সমগ্র সৃষ্টির অনিষ্টই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কাজেই আশ্রয় গ্রহণের জন্য এ বাক্যটিই যথেষ্টে ছিল কিন্তু এস্থলে আরও তিনটি বিষয় আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রায়ই বিপদ ও মুসীবতের কারণ হয়ে থাকে।
*৩নং আয়াতের শব্দের অর্থ অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়া। আয়াতের অর্থ এই যে, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই রাত্রি থেকে যখন তার অন্ধকার গভীর হয়। রাত্রিবেলায় জিন, শয়তান, ইতরপ্রাণী কীট-প্রতঙ্গ ও চোর-ডাকাত বিচরণ করে এবং শত্রুরা আক্রমণ করে। যাদুর ক্রিয়াও রাত্রিতে বেশী হয়। তাই বিশেষভাবে রাত্রি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।
*৪নং আয়াতের অর্থ ফুঁ দেওয়া। যারা যাদু করে, তারা ডোর ইত্যাদিতে গিরা লাগিয়ে তাতে যাদুর মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেয়। যাদুর কাজ সাধারণত নারীরাই করে এবং জন্মগতভাবে এর সাথে তাদের সম্পর্কও বেশী। এছাড়া রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদুর ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরাদ্বয় অবতীর্ণ হয়েছে। সেই ঘটনায় ওলীদের কন্যারাই পিতার আদেশে রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করেছিল। যাদু থেকে আশ্রয় চাওয়ার কারণ এটাও হতে পারে যে, এর অনিষ্ট সর্বাধিক। কারণ মানুষ যাদুর কথা জানতে পারে না।
অজ্ঞতার কারণে তা দূর করতে সচেষ্ট হয় না। রোগ মনে করে চিকিৎসা করতে থাকে। ফলে কষ্ট বেড়ে যায়।
*৫নং আয়াতে বলা হয়েছে অর্থাৎ হিংসুক ও হিংসা। হিংসার কারণেই রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর উপর যাদু করা হয়েছিল। ইহুদী ও মুনাফিকরা মুসলমানদের উন্নতি দেখে হিংসার অনলে দগ্ধ হত। তারা সম্মুখ যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পেরে যাদুর মাধ্যমে হিংসার দাবানল নির্বাপিত করার প্রয়াস পায়। রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রতি হিংসা পোষণকারীর সংখ্যা জগতে অনেক। এ কারণেও বিশেষভাবে হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। কারও নিয়ামত ও সুখ দেখে দগ্ধ হওয়া ও তার অবসান কামনা করা। এই হিংসা হারাম ও মহাপাপ। এটাই আকাশে করা সর্বপ্রথম গুনাহ এবং এটাই পৃথিবীতে করা সর্বপ্রথম গুনাহ। আকাশে ইবলীস আদম (আঃ) এর প্রতি এবং পৃথিবীতে আদমপুত্র কাবীল তদীয় ভ্রাতা হাবীলের প্রতি হিংসা করেছে। (কুরতবী) কারও নিয়ামত ও সুখ দেখে নিজের জন্য তদ্রুপ নিয়ামত ও সুখ কামনা করা। এটা জায়েজ বরং উত্তম। এখানে তিনটি বিষয় থেকে বিশেষ প্রার্থনার কথা আছে। কিন্তু প্রথম ও তৃতীয় বিষয়ের সাথে বাড়তি কথা যুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিষয়ের সাথে কোন কিছু সংযুক্ত করা হয়নি। কারণ এই যে, যাদুর ক্ষতি ব্যাপক। কিন্তু রাত্রির ক্ষতি ব্যাপক নয় বরং রাত্রি যখন গভীর হয় তখনই ক্ষতির আশংকা দেখা দেয়। এমনিভাবে হিংসুক ব্যক্তি যে পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে প্রবৃত্ত না হয় সেই পর্যন্ত হিংসার ক্ষতি তার নিজের মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে সে যদি হিংসায় উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষের ক্ষতিসাধনে সচেষ্ট হয় তবেই প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাই প্রথম ও তৃতীয় বিষয়ের সাথে বাড়তি কথাগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
আল্লাহ ছুবহানুতায়ালার হেদায়েতের মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে জানুন
আল্লাহ ছুবহানুতায়ালার ভয় অন্তরে সৃষ্টি করে আমলের মাধ্যমে তাহার আনুগত্য করা। আমার ইউটিউব চ্যানেল লিংকঃ https://www.youtube.com/@Important.c
১১৪. সূরা নাস এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা নাস মদীনায় অবতীর্ণ হয়, আয়াত সংখ্যা ৬ ।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার (২) মানুষের অধিপতির, (৩) মানুষের মাবুদের (৪) তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রনা দেয় ও আত্মগোপন করে, (৫) যে কুমন্ত্রনা দেয় মানুষের অন্তরে (৬) জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
*সূরা নাসে পারলৌকিক আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। যেহেতু পরকালীন ক্ষতি গুরুতর, তাই এর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে কোরআন পাক সমাপ্ত করা হয়েছে। মানুষ আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলে পিছনে সরে যাওয়াই শয়তানের অভ্যাস। মানুষ গাফিল হলে শয়তান আবার অগ্রসর হয়। অতঃপর হুঁশিয়ার হয়ে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলে শয়তান আবার পশ্চাতে সরে যায়। এ কার্যধারাই অবিরাম অব্যাহত থাকে।
*রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, প্রত্যেক মানুষের অন্তরে দুটি গৃহ আছে। একটিতে ফেরেশতা ও অপরটিতে শয়তান বাস করে। (ফেরেশতা সৎ কাজে এবং শয়তান অসৎ কাজে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করে)। মানুষ যখন আল্লাহর জিকির করে, তখন শয়তান পিছনে সরে যায় এবং যখন জিকিরে থাকে না, তখন তার চঞ্চু মানুষের অন্তরে স্থাপন করে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে। (মাযহারী)
* শায়খ ইযযুদ্দীন (রহঃ) তদীয় গ্রন্থে বলেন, মানুষ শয়তানের অনিষ্ট বলে নফসের (মনের) কুমন্ত্রণা বোঝানো হয়েছে। কেননা জ্বিন শয়তান যেমন মানুষের অন্তরে কু-কাজের আগ্রহ সৃষ্টি করে তেমনি স্বয়ং মানুষের নফসও মন্দ কাজেরই আদেশ করে। একারনেই রসূলুল্লাহ (সাঃ) আপন নফসের অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা শিক্ষা দিয়েছেন। হাদীসে আছে হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই, আমার নফসের অনিষ্ট থেকে, শয়তানের অনিষ্ট থেকে এবং শিরক থেকেও।
*শয়তানী কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার গুরুত্ব অপরিসীমঃ- ইবনে কাসীর বলেন এ সূরার শিক্ষা এই যে, পালনকর্তা, অধিপতি, মাবুদ--- আল্লাহ্ তায়ালার এইগুণত্রয় উল্লেখ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা মানুষের উচিত। কেননা প্রত্যেক মানুষের সাথে একটি করে শয়তান লেগে আছে। সে প্রতি পদক্ষেপে মানুষকে ধ্বংশ ও বরবাদ করার চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকে। প্রথমে পাপ কাজের দিকে নিয়ে যায়। এতে সফল না হলে মানুষের সৎকর্ম ও ইবাদত বিনষ্ট করার জন্য রিয়া, নাম-যশ, গর্ব ও অহংকার অন্তরে সৃষ্টি করে দেয়। বিদ্বান লোকদের অন্তরে সত্য বিশ্বাস সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টির চেষ্টা করে। অতএব, শয়তানের অনিষ্ট থেকে সেই বাঁচতে পারে যাকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখেন ।
*হযরত আনাস (রাঃ) এর হাদীসে আছে, একবার রসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে এতেকাফরত ছিলেন। এক রাত্রিতে উম্মুল মু'মিনীন হযরত সফিয়্যা (রাঃ) তার সাথে সাক্ষাতের জন্য মসজিদে যান। ফেরার সময় রসূলুল্লাহ (সাঃ) ও তার সাথে রওয়ানা হলেন। গলিপথে চলার সময় দু'জন আনসারী সাহাবী সামনে পড়লে রসূলুল্লাহ (সাঃ) আওয়াজ দিলেন, তোমরা আস। আমার সাথে আমার সহধর্মিনী সফিয়্যা বিনতে-হুয়াই (রাঃ) রয়েছেন। সাহাবীদ্বয় সম্ভ্রমে আরয করলেন, ছুবহানাল্লাহ্ ইয়া রসূলুল্লাহ (সাঃ) (অর্থাৎ আপনি মনে করেছেন যে, আমরা কোন কুধারণা করব। রসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। কারণ, শয়তান মানুষের রক্তের সাথে তার শিরা-উপশিরায় প্রভাব বিস্তার করে। আমি আশংকা করলাম যে, শয়তান তোমাদের অন্তরে আমার সম্পর্কে কু-ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমি বলে দিয়েছি যে, আমার সাথে কোন বেগানা নারী নেই।
*সূরা নাসে যে বিষয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে, তা তো মাত্র একটি; অর্থাৎ কুমন্ত্রণা এবং যার আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে তার তিনটি বিশেষণ উল্লেখ করে দোয়া করা হয়েছে। এথেকে জানা যায় যে, শয়তানের অনিষ্ট সর্ববৃহৎ অনিষ্ট। প্রথমত এ কারণে যে, অন্য আপদ-বিপদের প্রতিক্রিয়া মানুষের দেহ ও পার্থিব বিষয়াদিতে প্রতিফলিত হয় কিন্তু শয়তানের অনিষ্ট মানুষের ইহকাল ও পরকাল উভয়কে বিশেষত পরকালকে বরবাদ করে দেয়। তাই এ ক্ষতি গুরুতর। দ্বিতীয়ত দুনিয়ার আপদ-বিপদের কিছু না কিছু বৈষয়িক প্রতিকারও মানুষের করায়ত্ত আছে এবং তা করা হয় থাকে কিন্তু শয়তানের মুকাবিলা করার কোন বৈষয়িক কৌশল মানুষের সাধ্যাতীত ব্যাপার। সে মানুষকে দেখে কিন্তু মানুষ তাকে দেখে না। সুতরাং এর প্রতিকার একমাত্র আল্লাহর যিকির ও তাঁর আশ্রয় গ্রহণ করা।
*মানুষের শত্রু মানুষও এবং শয়তানও। এই শত্রুদ্বয়ের আলাদা আলাদা প্রতিকারঃ- মানুষের শত্রু মানুষ এবং শয়তানও। আল্লাহ তায়ালা মানুষ শত্রুকে প্রথমে সচ্চরিত্র, উদার ব্যবহার, প্রতিশোধ বর্জন ও সবরের মাধ্যমে বশ করার শিক্ষা দিয়েছেন। যদি সে এত বিরত না হয় তবে তার সাথে জিহাদ ও যুদ্ধ করার আদেশ দান করেছেন। কিন্তু শয়তান শত্রুর মুকাবিলা কেবল আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার মাধ্যমে করার শিক্ষা দিয়েছেন। ইবনে কাসীর তাঁর তফসীরের ভূমিকায় তিনটি আয়াত উল্লেখ করেছেন। এসব আয়াতে মানুষের উপরোক্ত শত্রদ্বয়ের উল্লেখ করার পর মানুষ শত্রুর প্রতিরক্ষায় কেবল আশ্রয় প্রার্থনার সবক দেওয়া হয়েছে।
*পরিণতির বিচারে উভয় শত্রুর মুকাবিলার বিস্তর ব্যবধান রয়েছেঃ উপরে কুরআনী শিক্ষায় প্রথমে অনুগ্রহ ও সবর দ্বারা মানুষ শত্রুর প্রতিরক্ষা বর্ণিত হয়েছে। এতে সফল না হলে জিহাদ ও যুদ্ধ দ্বারা প্রতিরক্ষা করতে বলা হয়েছে। উভয় অবস্থায় মুকাবিলাকারী মুমিন কামিয়াবী থেকে বঞ্চিত নয়। সম্পূর্ণ অকৃতকার্যতা মুমিনের জন্য সম্ভবপর নয়। শত্রুর মুকাবিলায় বিজয় হলে তো তার কামিয়াবী সুস্পষ্টতই। পক্ষান্তরে যদি সে পরাজিত হয় অথবা নিহত হয় তবে পরকালের সওয়াব ও শাহাদাতের ফযীলত দুনিয়ার কামিয়াবী অপেক্ষাও বেশি পাবে। সারকথা মানুষ শত্রুর মুকাবিলায় হেরে যাওয়া মুমিনের জন্য ক্ষতির কথা নয়। কিন্তু শয়তানের খোশামোদ ও তাকে সন্তুষ্ট করা এবং গোনাহ তার মুকাবিলায় হেরে যাওয়া পরকালকে বরবাদ করাররই নামান্তর। এ কারণেই শয়তান শত্রুর প্রতিরক্ষার জন্য আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় নেওয়াই একমাত্র প্রতিকার। তাঁর স্মরনের সামনে শয়তানের প্রত্যেকটি কলাকৌশল মাকড়সার জালের ন্যায় দুর্বল।
*শয়তানী চক্রান্ত ক্ষণভঙ্গুরঃ উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এরুপ ধারণা করা উচিত নয় যে, তাহলে শয়তানের শক্তিই বৃহৎ। তার মুকাবিলা সুকঠিন। এহেন ধারনা দূর করার জন্য আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল। সূরা নহলে কোরআন পাঠ করার সময় আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করার আদেশ রয়েছে। সেখানে একথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, ঈমানদার আল্লাহর উপর ভরসাকারী অর্থাৎ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনাকারীর উপর শয়তানের কোন জোর চলে না। বলা হয়েছে তুমি যখন কুরআন পাঠ কর, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। যারা মুমিন ও আল্লাহর উপর ভরসা করে, তাদের উপর শয়তানের জোর চলে না। তার জোর তো কেবল তাদের উপরই চলে যারা তাকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করে ও তাকে অংশীদার মনে করে।
*কুরআনের সূচনা ও সমাপ্তির মিলঃ আল্লাহ তায়ালা সূরা ফাতেহার মাধ্যমে কুরআন পাক শুরু করেছেন যার সারমর্ম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করার পর তাঁর সাহায্য ও সরলপথে চলার তওফীক প্রার্থনা করা। আল্লাহ তায়ালার সাহায্য ও সরলপথের মধ্যেই মানুষের যাবতীয় ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কামিয়াবী নিহিত আছে। কিন্তু এ দুটি বিষয় অর্জনে এবং অর্জনের পর তা ব্যবহারে প্রতি পদক্ষেপে অভিশপ্ত শয়তানের চক্রান্ত ও কুমন্ত্রণার জাল বিছানো থাকে। তাই এজাল ছিন্ন করার কার্যকর পন্থা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ দ্বারা কুরআন পাক সমাপ্ত করা হয়েছে।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
১০১. সূরা কারেয়া এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা কারেয়া মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ১১।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ ১) করাঘাতকারী, ২) করাঘাতকারী কি ? ৩) করাঘাতকারী সম্পর্কে আপনি কি জানেন ? ৪) যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতংগের মত ৫) এবং পর্বতমালা হবে ধূনিত রঙীন পশমের মত। ৬) অতএব যার পাল্লা ভারী হবে, ৭) সে সুখী জীবন যাপন করবে ৮) আর যার পাল্লা হালকা হবে, ৯) তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। ১০) আপনি জানেন তা কি ? ১১) প্রজ্বলিত অগ্নি।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ- কিয়ামত যে অন্তরকে ভীতি এবং কানকে ভীষণ শব্দে আঘাত করবে, আর এ অবস্থা সেদিন হবে বিক্ষিপ্ত পতংগের মত (কয়েকটি বিষয়ের কারণে মানুষকে পতংগের সাথে তুলনা করা হয়েছে- এক. সংখ্যাধিক্যের জন্য সেদিন বিশ্বের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সমস্ত মানুষ এক ময়দানে সমবেত হবে।
দুই. দুর্বলতা ও শক্তি হীনতার জন্য। কারণ সব মানুষ তখন পতংগের মতই শক্তিহীন ও দুর্বল হবে। এ দুটি কারণ হাশরের সব মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে পাওয়া যাবে।
তৃতীয় কারণ এই যে, সব মানুষ অস্থির ও ব্যাকুল হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করবে যা পতংগদের বেলায় প্রত্যক্ষ করা যায়। অবশ্য এ অবস্থা মুমিনদের বেলায় হবে না। তারা প্রশান্ত মনে কবর থেকে উথিত হবে)। এবং পর্বতমালা হবে ধূনিত রঙ্গীন পশমের মত। (পর্বতমালার রঙ বিভিন্ন রুপ। যেহেতু এগুলো সেদিন উড়তে থাকবে ফলে বিভিন্ন রঙ এর পশমের মত দেখা যাবে। সেদিন মানুষের কর্ম ওজন করা হবে)। অতএব যার পাল্লা ভারী হবে সে সুখী জীবন যাপন করবে (সে হবে মুমিন। সে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে যাবে) এবং যার (ঈমানের) পাল্লা হালকা হবে (অর্থাৎ কাফির হবে) তার ঠিকানা হবে হাবিয়া। আপনি জানেন তা (অর্থাৎ হাবিয়া) কি ? (সেটা) এক প্রজ্বলিত অগ্নি। এ সূরায় আমলের ওজন ও তার হালকা এবং ভারী হওয়ার প্রেক্ষিতে জাহান্নাম অথবা জান্নাত লাভের বিষয় আলোচিত হয়েছে। এ সূরায় বাহ্যত প্রথম ওজন বোঝানো হয়েছে, যাতে প্রত্যেক মুমিনের পাল্লা ঈমানের কারণে ভারী হবে তার কর্ম যেমনই হোক। আর প্রত্যেক কাফিরের পাল্লা ঈমানের অভাবে হালকা হবে সে যদিও কিছু সৎকর্ম করে থাকে। তফসীরে মাযহারীতে আছে, কোরআন পাকে সাধারণভাবে কাফির ও সৎকর্মপরায়ণ মুমিনের শাস্তি ও প্রতিদান বর্ণনা করা হয়েছে। মুমিনদের মধ্যে যারা সৎ ও অসৎ মিশ্র করে কোরআন পাকে সাধারনভাবে দান-প্রদানের কোন উল্লেখ করা হয়নি। এক্ষেত্রে একথা স্মর্তব্য যে, কিয়ামতে মানুষের আমল ওজন করা হবে--গণনা করা হবে না। আমলের ওজন ইখলাস তথা আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুন্নতের সাথে সামঞ্জস্যের কারণে বেড়ে যায়। যার আমল আন্তরিকতাপূর্ণ ও সুন্নতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংখ্যায় কম হলেও তার আমলের ওজন বেশী হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সংখ্যায় তো নামায, রোযা, সদকা-খয়রাত, হজ্জ-ওমরা অনেক করে কিন্তু আন্তরিকতা ও সুন্নতের সাথে সামঞ্জস্য কম তার আমলের ওজন কম হবে।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
১০২. সূরা তাকাছুর এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা তাকাছুর মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৮।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফিল রাখে, (২) এমনকি তোমরা কবর স্থানে পৌঁছে যাও। (৩) এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে নেবে, (৪) অতঃপর এটা কখনও উচিত নয়। তোমরা সত্বরই জেনে নেবে। (৫) কখনওই নয়; যদি তোমরা নিশ্চিত জানতে ! (৬) তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে, (৭) অতঃপর তোমরা তা অবশ্যই দেখবে দিবা-প্রত্যয়ে, (৮) এরপর অবশ্যই সেদিন তোমরা নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ- আয়াতের মর্মার্থ এই যে, ধনসম্পদের প্রাচুর্য অথবা ধনসম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও বংশ-গোত্রের বড়াই তোমাদেরকে গাফিল ও উদাসীন করে রাখে, নিজেদের পরিণতি ও পরকালের হিসাব-নিকাশের কোন চিন্তা তোমরা কর না এবং এমনি অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু এসে যায়। আর মৃত্যুর পর তোমরা আযাবে গ্রেফতার হও। একথা বাহ্যত সাধারণ মানুষকে বলা হয়েছে, যারা ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ভালবাসায় অথবা অপরের সাথে বড়াই করায় এমন মত্ত হয়ে পড়ে যে, পরিণাম চিন্তা করার ফুরসতই পায় না।
*হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে শিখখীর (রাঃ) বলেন, আমি একদিন রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট পৌঁছে দেখলাম তিনি----তিলাওয়াত করে বলেছিলেন মানুষ বলে, আমার ধন, আমার ধন অথচ তোমার অংশ তো ততটুকুই, যতটুকু তুমি খেয়ে শেষ করে ফেল অথবা পরিধান করে ছিন্ন করে দাও অথবা সদকা করে সম্মুখে পাঠিয়ে দাও । এছাড়া যা আছে, তা তোমার হাত থেকে চলে যাবে--তুমি অপরের জন্য তা ছেড়ে যাবে। (ইবনে কাসীর, তিরমিযী, আহমদ)
*হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আদম সন্তানের যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে (তাতেই সন্তষ্ট হবে না।; বরং) দুটি উপত্যকা কামনা করবে। তার মুখ তো (কবরের) মাটি ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা ভর্তি করা সম্ভব নয়। যে আল্লাহর দিকে রজু করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন (বুখারী)
*হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, মূসা (আঃ) যখন তূর পর্বতে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্প্রদায় গোবৎসের পূজা করতে শুরু করছিল, তখন আল্লাহ তায়ালা তূর পর্বতেই তাঁকে অবহিত করেছিলেন যে, বনী ইসরাইলরা গোবৎসের পূজায় লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু মূসা (আঃ)-র মধ্যে এর তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি, যেমন ফিরে আসার পর স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার ফলে দেখা দিয়েছিল। তিনি ক্রোধে আত্মহারা হয়ে তওরাতের তক্তিগুলো হাত থেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। (মাযহারী)
*রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে সর্বপ্রথম তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। বলা হবে আমি কি তোমাকে সুস্বাস্থ্য দেইনি, আমি কি তোমাকে ঠাণ্ডা পানি পান করতে দেইনি ? (তিরমিযী)
*অন্য এক হাদীসে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর আদায় না করা পর্যন্ত হাশরের মাঠে কেউ স্বস্থান ত্যাগ করতে পারবে না। এক. সে তার জীবনের দিনগুলো কি কি কাজে নিঃশেষ করেছে ? দুই. সে তার যৌবনশক্তিকে কি কাজে ব্যয় করেছে ? তিন. সে যে সম্পদ উপার্জন করেছিল তা বৈধ পন্থায়, না অবৈধ পন্থায় উপার্জন করেছে ? চার. সে সেই ধনসম্পদ কোথায় কোথায় ব্যয় করেছে ? পাঁচ. আল্লাহ প্রদত্ত ইলম অনুযায়ী সে কতটুকু আমল করেছে ? (বুখারী)
*রসূলে করীম (সাঃ) একবার সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমাদের মধ্যে কারও এমন ক্ষমতা নেই যে, এক হাজার আয়াত পাঠ করবে। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন, হ্যাঁ এক হাজার আয়াত পাঠ করা শক্তি কয়জনের আছে ! তিনি বললেন, তোমাদের কেউ কি সূরা তাকাছুর পাঠ করতে পারবে না ? উল্লেখ্য এই যে, দৈনিক এই সূরা পাঠ করা এক হাজার আয়াত পাঠ করার সমান (মাযহারী)
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
১০৩. সূরা আছর এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা আছর মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৩।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) কসম যুগের, (২) নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; (৩) কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাগীদ করে সত্যের এবং করে সবরের।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ- *হযরত ওবায়দূল্লাহ্ ইবনে হিসন (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহাবীগণের মধ্যে দু'ব্যক্তি ছিল, তারা পরস্পর মিলে একজন অন্যজনকে সূরা আছর পাঠ করে না শুনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন হতেন না। (তিবরানী)
*ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেন, যদি মানুষ কেবল এ সূরাটি সম্পর্কেই চিন্তা করত তবে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। (ইবনে কাসীর)
*সূরা আছর কোরআন পাকের একটি সংক্ষিপ্ত সূরা, কিন্তু এমন অর্থপূর্ণ সূরা যে ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এর ভাষায় মানুষ এ সূরাটিকেই চিন্তা ভাবনা সহকারে পাঠ করলে তাদের ইহকাল ও পরকালের সংশোধনের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এ সূরায় আল্লাহ্ তায়ালা যুগের কসম করে বলেছেন যে, মানবজাতি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এবং এই ক্ষতির কবল থেকে শুধু তারাই মুক্ত যারা চারটি বিষয় নিষ্ঠার সাথে পালন করে- ঈমান, সৎকর্ম, অপরকে সত্যের উপদেশ এবং সবরের উপদেশ। দীন ও দুনিয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহা উপকার লাভ করার চার বিষয় সম্বলিত এ ব্যবস্থপত্রের প্রথম দু'টি বিষয় আত্মসংশোধন সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয় দু'টি বিষয় মুসলমানদের হিদায়ত ও সংশোধন সম্পর্কিত। চিন্তা করলে দেখা যায়, আয়ুষ্কালের সাল, মাস, সপ্তাহ, দিবারাত্র বরং ঘন্টা ও মিনিটই মানুষের একমাত্র পুঁজি, যার সাহায্যে সে ইহকাল ও পরকালের বিরাট এবং বিস্ময়কর মুনাফাও অর্জন করতে পারে এবং ভ্রান্ত পথে চললে এটাই তার জন্য বিপজ্জনকও হয়ে যেতে পারে। জনৈক আলিম বলেন, তোমার জীবন কতিপয় গুণাগুনতি শ্বাস-প্রশ্বাসের নাম। যখন একটি শ্বাস অতিবাহিত হয়ে যায়, তখন তোমার বয়সের একটি অংশ হ্রাস পায়। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে তার আয়ুষ্কালের অমূল্য পুঁজি দিয়ে একটি ব্যবসায়ে নিয়োজিত করে দিয়েছেন, যাতে সে বিবেকবুদ্ধি খাটিয়ে এ পুঁজিকে খাঁটি লাভ-দায়ক কাজে লাগাতে পারে। যদি সে লাভদায়ক কাজে এ পুঁজিকে বিনিয়োগ করে, তবে মুনাফার কোন অন্ত থাকে না। পক্ষান্তরে যদি সে এই পুঁজি কোন ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করে, তবে মুনাফা দূরের কথা, পুঁজিই বিনষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর কেবল মুনাফা ও পুঁজি বিনষ্ট হয়েই ব্যাপার শেষ হয়ে যায় না বরং তার উপর শত শত অপরাধের শাস্তি আরোপিত হয়। কেউ যদি এ পুঁজিকে লাভজনক অথবা ক্ষতিকর কোন কাজেই ব্যবহার না করে, তবে এ ক্ষতি তো অবশ্যম্ভাবী যে, তার মুনাফা ও পুঁজি উভয়ই বিনষ্ট হল। এটা নিছক কবিসুলভ কল্পনাই নয়, বরং এক হাদীসেও এ সমর্থন পাওয়া যায়। রসূল (সঃ) বলেন, প্রাতঃকালে উঠে তার প্রাণের পুঁজি ব্যবসায়ে নিয়োজিত করে। অতঃপর কেউ এ পুঁজিকে লোকসান থেকে মুক্ত করে নেয় এবং ধ্বংস করে দেয়। উপরোক্ত দু’রকম উপদেশ প্রকৃতপক্ষে এই ওসীয়্যতেরই দু’টি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায় সত্যের উপদেশ এবং দ্বিতীয় অধ্যায় সবরের উপদেশ। এখন এ দু’টি শব্দের কয়েক রকম অর্থ হতে পারে---এক. সত্যের অর্থ বিশুদ্ধ বিশ্বাস ও সৎ কর্মের সমষ্টি আর সবরের অর্থ যাবতীয় গোনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা। অতএব প্রথম শব্দের সারমর্ম হল ’আমর বিল মারুফ’ তথা সৎ কাজের আদেশ করা এবং দ্বিতীয় শব্দের সারমর্ম হল ‘নিহী আনিল মুনকার’ তথা মন্দ কাজে নিষেধ করা। এখন সমষ্টির সারমর্ম এই দাঁড়ায় যে, নিজে যে ঈমান ও কর্ম অবল্বন করেছে,অপরকেও তার উপদেশ দেয়া। দুই. সত্যের অর্থ বিশুদ্ধ বিশ্বাস এবং সবরের অর্থ সৎ কাজ করা এবং মন্দ কাজ থেকে বেঁঁচে থাকা। কেননা, সবরের আক্ষরিক অর্থ নিজেকে বাধা দেওয়া ও অনুবতী করা। এ অনুবতী করার মধ্যে সৎ কর্ম সম্পাদন এবং গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করা উভয়ই শামিল। এ সূরায় মুসলমানদের প্রতি একটি বড় নির্দেশ এই যে, নিজেদের ধর্মকে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী করে নেওয়া যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী, ততটুকুই জরুরী অন্য মুসলমানদেরকেও ঈমান ও সৎ কর্মের প্রতি আহবান করার সাধ্যমত চেষ্টা করা। নতুবা কেবল নিজেদের আমল মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে না, বিশেষত আপন পরিবার-পরিজন বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কুকর্ম থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা আপন মুক্তির পথ বন্ধ করার নামান্তর, যদিও নিজে পুরোপুরি সৎকর্ম পরায়ণ হয়। এ কারণেই কুরআন ও হাদীসে প্রত্যেক মুসলমানের প্রতি সাধ্যমত সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ফরয করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারন মুসলমান এমনকি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি পর্যন্ত উদাসীনতায় লিপ্ত রয়েছে। তারা নিজেদের আমলকেই যথেষ্ট মনে করে বসে আছে, সন্তান-সন্ততি কি করছে, সে দিকে ভ্রুক্ষেপও নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী আমল করার তওফীক দান করুন। আমীন।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
১০৪. সূরা হুমাযা এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা হুমাযা মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৯।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ, (২) যে অর্থ সঞ্চিত করে ও গণনা করে। (৩) সে মনে করে যে, তার অর্থ চিরকাল তার সাথে থাকবে! (৪) কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে পিষ্টকারীর মধ্যে। (৫) আপনি কি জানেন, পিষ্টকারী কি? (৬) এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি,(৭) যা হ্রদয় পর্যন্ত পোঁছবে। (৮) এতে তাদেরকে বেঁধে দেওয়া হবে, (৯) লম্বা লম্বা খুঁটিতে।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ- এ সূরায় তিনটি জঘন্য গোনাহের শাস্তি ও তার তীব্রতা বর্ণিত হয়েছে। গোনাহ তিনটি হচ্ছে প্রথমোক্ত শব্দদ্বয় কয়েকটি অর্থে ব্যবহ্রত হয়। অধিকাংশ তফসীরকারকের মতে এর অর্থ গীবত অর্থাৎ পশ্চাতে পরনিন্দা করা এবং এর অর্থ সামনাসামনি দোষারোপ করা ও মন্দ বলা। এ দু’টি কাজই জঘন্য গোনাহ। পশ্চাতে পরনিন্দার শাস্তির কথা কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এর কারণ এরুপ হতে পারে যে, এ গোনাহে মশগুল হওয়ার পথে সামনে কোন বাধা থাকে না। যে এতে মশগুল হয়, সে কেবল এগিয়েই চলে। ফলে গোনাহ বৃহৎ থেকে বৃহত্তর ও অধিকতর হতে থাকে। সম্মুখের নিন্দা এরুপ নয়। এতে প্রতিপক্ষও বাধা দিতে প্রস্তুত থাকে। ফলে গোনাহ দীর্ঘ হয় না। এছাড়া কারও পশ্চাতে নিন্দা করা একারণেও বড় অন্যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানতেও পারে না যে, তার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ উথাপন করা হচ্ছে। ফলে সে সাফাই পেশ করার সুযোগ পায় না।
*রসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম তারা, যারা পরোক্ষ নিন্দা করে, বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে এবং নিরপরাধ লোকদের দোষ খুুঁজে ফিরে।
যেসব বদভ্যাসের কারণে আয়াতে শাস্তির কথা উচ্চারণ করা হয়েছে, তন্মধ্যে তৃতীয়টি হচ্ছে অর্থলিপ্সা। আয়াতে একে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে---অর্থলিপ্সার কারণে সে তা বার বার গণনা করে। অন্যান্য আয়াত ও হাদীস সাক্ষ্য দেয় যে, অর্থ সঞ্চয় হবে, যাতে জরুরী হক আদায় করা না হয় কিংবা গর্ব ও অহমিকা লক্ষ্য হয় কিংবা লালসার কারণে দ্বীনের জরুরী কাজ বিঘ্নিত হয়।
জাহান্নামের এই অগ্নি হ্রদয়কে পর্যন্ত গ্রাস করবে। প্রত্যেক অগ্নির এটাও বৈশিষ্ট্য। যা কিছু তাতে পতিত হয়, তার সকল অংশ জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। মানুষ তাতে নিক্ষিপ্ত হলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ হ্রদয়ও জ্বলে যাবে। এখানে জাহান্নামের অগ্নির এই বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার কারণ এই যে, দুনিয়ার অগ্নি মানুষের দেহে লাগলে হ্রদয় পর্যন্ত পোঁছার আগেই মানুষের মৃত্যু হয়ে যায়। জাহান্নামে মৃত্যু নেই।
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
১০৫. সূরা ফীল এর আয়াতের অর্থ ও কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ-
সূরা ফীল মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৫।
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুঃ-
আয়াতের অর্থঃ (১) আপনি কি দেখেন নি আপনার পালনকর্তা হস্তীবাহিনীর সাথে কিরুপ ব্যবহার করেছেন ? (২) তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন নি ? (৩) তিনি তাদের উপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী, (৪) যারা তাদের উপর পাথরের কংকর নিক্ষেপ করছিল। (৫) অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দেন।
কিছু সংক্ষিপ্ত তফসীরঃ- হাদীসবিদ ও ইতিহাসবিদ ইবনে কাসীরের ভাষ্য এরুপঃ আরবের ইয়ামেন প্রদেশ মুশরিক, ‘হেমইয়ারী’ রাজন্যবর্গের অধিকারভুক্ত ছিল। তাদের সর্বশেষ রাজা ছিলেন ’যু-নওয়াস’। রাজা ‘যু-নওয়াস’ তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন। তিনি একটি দীর্ঘ ও প্রশস্ত গর্ত খনন করে তা অগ্নিতে ভর্তি করে দেন। অতঃপর যত খৃস্টান পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এক আল্লাহর ইবাদত করত, তাদেরকে সেই গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেন। এরুপ নির্যাতিতদের সংখ্যা ছিল বিশ হাজারের কাছাকাছি।এই গর্তের কথাই সূরা বুরুজে ‘আসহাবুল-উখদূদে’র নামে ব্যক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে দু’ব্যক্তি কোনরুপে অত্যাচারীদের কবল থেকে পলায়ন করতে সক্ষম হয়। তারা সিরিয়ার রোমক শাসকের দরবারে যেয়ে খৃস্টানদের প্রতি রাজা যু-নওয়াসের লোমহর্ষক অত্যাচারের কাহিনী বিবৃত করল। রোমক শাসক ইয়ামেনের নিকটবর্তী আবিসিনিয়ার খৃস্টান সম্রাটের কাছে এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর বিরাট সৈন্যবাহিনী, দুই. সেনানায়ক আরবাত ও আবরাহার নেতৃত্বে রাজা যু-নওয়াসের মুকাবিলায় পাঠিয়ে দিলেন। আবিসিনিয়ার সেনাবাহিনী ইয়ামেনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং সমগ্র ইয়ামেনকে হেমইয়ারীদের কবল থেকে মুক্ত করল। রাজা যু-নওয়াস পলায়ন করলেন এবং সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করলেন। এভাবে আরবাত ও আবরাহার মাধ্যমে ইয়ামেন আবিসিনিয়া সম্রাটের করতলগত হল। এরপর আরবাত ও আবরাহার মধ্যে ক্ষমতার লড়াই হল এবং আরবাত নিহত হল। আবিসিনিয়া সম্রাট বিজয়ী আবরাহাকে ইয়ামেনের শাসক নিযুক্ত করলেন। ইয়ামেন অধিকার করার পর আবরাহার ইচ্ছা হল যে, সে তথায় এমন একটি বিশাল সুরম্য গীর্জা নির্মাণ করবে, যার নযীর পৃথিবীতে নেই। এতে তার লক্ষ্য ছিল এই যে, ইয়ামেনের আরব বাসিন্দারা প্রতি বৎসর হজ্জ করার জন্য মক্কায় গমন করে এবং বায়তুল্লাহর তওয়াফ করে। তারা এই গীর্জার মাহাত্ম্য ও জাঁকজমকে অভিভূত হয়ে বায়তুল্লাহর পরিবর্তে এই গীর্জায় আগমন করবে। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সে একটি বিরাট সুরম্য গীর্জা নির্মাণ করল। নিচে দাঁড়িয়ে কেউ এই গীর্জার উচ্চতা পরিমাপ করতে পারত না। স্বর্ণ-রোপ্য ও মূল্যবান হীরা-জহরত দ্বারা কারুকার্যখচিত এই গীর্জা নির্মাণ করার পর সে ঘোষণা করল এখন থেকে ইয়ামেনের কোন বাসিন্দা হজ্জের জন্য কাবাগৃহে যেতে পারবে না। এর পরিবর্তে তার এই গীর্জায় ইবাদত করবে। আরবে যদিও পৌত্তলিকতার জোর বেশী ছিল কিন্তু দীনে ইবরাহীম এবং কাবার মাহাত্ম্য ও মহব্বত তাদের অন্তরে গ্রথিত ছিল। তাই আদনান, কাহতান ও কোরায়েশ উপজাতি-সমূহের মধ্যে এই ঘোষণার ফলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তীব্রতর হয়ে উঠল। সে মতে তাদেরই কেউ রাত্রির অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে গীর্জায় প্রবেশ করে প্রস্রাব-পায়খানা করল। কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, তাদের এক যাযাবর গোত্র নিজেদের প্রয়োজনে গীর্জার সন্নিকটে অগ্নি প্রজ্বলিত করেছিল। সেই অগ্নি গীর্জায় লেগে যায় এবং গীর্জার প্রভূত ক্ষতি হয়।
আবরাহাকে সংবাদ দেওয়া হল যে, জনৈক কোরায়শী এই দুষ্কর্ম করেছে। তখন সে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে শপথ করল আমি কোরায়েশদের কাবাগৃহ নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষান্ত হব না। অতঃপর সে এর প্রস্তুতি শুরু করল এবং আবিসিনিয়া সম্রাটের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করল। সম্রাট কেবল অনুমতিই দিলেন না বরং তার মাহমুদ নামক খ্যাতনামা হস্তীটিও আবরাহার সাহায্যার্থে পাঠিয়ে দিলেন। কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে, এই হস্তীটি এমন বিশালকায় ছিল যে, এর সমতুল্য সচরাচর দৃষ্টিগোচর হতো না। এছাড়া আরও আটটি হাতী এই বাহিনীর জন্য সম্রাটের পক্ষ থেকে প্রেরণ করা হল। এতসব হাতী প্রেরণ করার উদ্দেশ্য ছিল কাবাগৃহ ভূমিসাৎ করার কাজে হাতী ব্যবহার করা। পরিকল্পনা ছিল এই যে, কাবাগৃহের স্তম্ভে লোহার মজবুত ও লম্বা শিকল বেঁধে দেওয়া হবে। অতঃপর সেসব শিকল হাতীর গলায় বেঁধে হাঁকিয়ে দেওয়া হবে। ফলে সমগ্র কাবাগৃহ (নাউযুবিল্লাহ্) মাটিতে ধসে পড়বে।
আরবে এই আক্রমণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র আরব মুকাবিলার জন্য তৈরী হয়ে গেল। ইয়ামেনী আরবদের মধ্য থেকে যুনকর নামক এক ব্যক্তির নেতৃত্বে আরবরা আবরাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ছিল আবরাহার পরাজয় ও লাঞ্ছনা বিশ্ববাসীর জন্য একটা শিক্ষণীয় বিষয়রুপে তুলে ধরা। তাই আরবরা যুদ্ধে সফল হতে পারল না। আবরাহা তাদেরকে পরাজিত করে যুনকরকে বন্দী করল। অতঃপর সে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে ‘খাসআম’ গোত্রের কাছে উপনীত হলে গোত্র সরদার নুফায়েল ইবনে হাবীব তার মুকাবিলায় অবতীর্ণ হল। কিন্তু আবরাহার লশকর তাকেও পরাজিত ও বন্দী করল। আবরাহা নুফায়েলকে হত্যা না করে পথপ্রদর্শকের কাজে নিয়োজিত করল। অতঃপর এই সেনাবাহিনী তায়েফের নিকটবর্তী হলে তথাকার সকীফ গোত্র আবরাহাকে বাধা দিল না। কারণ তারা বিগত দু’টি যুদ্ধে আবরাহার বিজয় ও আরবদের পরাজয় ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল। তারা আবরাহার সাথে সাক্ষাৎ করে এই মর্মে এক শান্তিচুক্তিও সম্পাদন করল যে, তারা আবরাহার সামনে প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে না। যদি তায়েফে নির্মিত তাদের লাত নামক মূর্তির মন্দির অক্ষত থাকে। উপরন্তু তারা পথপ্রদর্শনের জন্য তাদের সরদার আবূ রেগালকেও আবরাহার সঙ্গে দিয়ে দেবে। আবরাহা এতে সম্মত হয়ে আবূ রেগালকে সাথে নিয়ে মক্কার অদূরে ’মাগমাস’ নামক স্থানে পৌঁছে গেল। সেখানে কোরায়েশ গোত্রের উট-চারণ ভূমি অবস্থিত ছিল। আবরাহা সর্বপ্রথম সেখানে হামলা চালিয়ে সমস্ত উট বন্দী করে নিয়ে এল। এতে রসূলে করীম (সাঃ) এর পিতামহ আবদুল মোত্তালিবেরও দুই শত উট ছিল। এখান থেকে আবরাহা বিশেষ দূত মারাফত মক্কা শহরে কোরায়েশ নেতাদের কাছে বলে পাঠাল যে, আমরা কোরায়েশদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই না। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে কাবাগৃহ ভূমিসাৎ করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বাধা না দিলে কোরায়েশদের কোন ক্ষতি করা হবে না। বিশেষ দূত ‘হানাত’ এই পয়গাম নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলে সবাই তাকে প্রধান কোরায়েশ নেতা আবদুল মোত্তালিবের ঠিকানা বলে দিল। হানাত তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করে আবরাহার পয়গাম পৌঁছে দিল। ইবনে ইসহাক (রঃ) এর বর্ণনা মতে আবদুল মোত্তালিবের প্রত্যুত্তরে বললেন, আমরাও আবরাহার মুকাবিলায় যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ইচ্ছা রাখি না। মুকাবিলা করার যথেষ্ট শক্তিও আমাদের নেই। তবে একথা বলে দিচ্ছি যে, এটা আল্লাহর ঘর, তাঁর খলীল ইবরাহীম (আঃ) এর হাতে নির্মিত। আল্লাহ তায়ালা নিজেই এর সংরক্ষণের যিম্মাদার। আবরাহা আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাইলে করুক এবং দেখুক আল্লাহ কি করেন। হানাত বলল, তাহলে আপনি আমার সাথে চলুন। আমি আবরাহার সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিবে।
আবরাহা আবদুল মোত্তালিবের সুদর্শন সৌম্য চেহারা দেখে সিংহাসন ছেড়ে নিচে উপবেশন করল এবং আবদুল মোত্তালিবকে সাথে বসালো। অতঃপর দোভাষীর মাধ্যমে আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করল। আবদুল মোত্তালিব বললেন, আমার প্রয়োজন এতটুকুই যে আমার কিছু উট আপনার সৈন্যরা নিয়ে এসেছে। সেগুলো ছেড়ে দিন। আবরাহা বলল আমি প্রথম যখন আপনাকে দেখলাম তখন আমার মনে আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ জাগ্রত হয়েছিল। কিন্তু আপনার কথাবার্তা
শুনে তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। আপনি আমার কাছে কেবল দুই শত উটের কথাই বলেছেন। আপনি কি জানেন না যে, আমি আপনাদের কাবা তথা আপনাদের দীন-ধর্মকে ভূমিসাৎ করতে এসেছি ? আপনি এ সম্পর্কে
কোন কথাই বললেন না ! আশ্চর্যের বিষয় বটে। আবদুল মোত্তালিব জওয়াব দিলেন, উটের মালিক আমি তাই উটের কথাই চিন্তা করেছি। আমি কাবা গৃহের মালিক নই। এর মালিক একজন মহান সত্তা। তিনি জানেন তাঁর এ ঘরকে কিরুপে রক্ষা করতে হবে। আবরাহা বলল, আপনার আল্লাহ একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মোত্তালিব বললেন, তাহলে আপনি যা ইচ্ছা করুন। কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে যে, আবদুল মোত্তালিবের সাথে আরও কয়েকজন কোরায়েশ নেতা আবরাহার দরবারে গমন করেছিলেন। তাঁরা আবরাহার কাছে এই প্রস্তাব রাখলেন যে, আপনি আল্লাহর ঘরে হস্তক্ষেপ না করলে আমরা সমগ্র উপত্যকার এক তৃতীয়াংশ ফসল আপনাকে খেরাজ প্রদান করব। কিন্তু আবরাহা এ প্রস্তাব মানতে সম্মত হল না। আবদুল মোত্তালিব তাঁর উট নিয়ে শহরে ফিরে এলেন। অতঃপর তিনি বায়তুল্লাহর চৌকাঠ ধরে দোয়ায় মশগুল হলেন। কোরায়েশ গোত্রের বহু লোকজন দোয়ায় তাঁর সাথে শরীক হল। তারা বলল হে আল্লাহ আবরাহার বিরাট বাহিনীর মুকাবিলা করার সাধ্য আমাদের নেই। আপনিই আপনার ঘরের হিফাযতের ব্যবস্থা করুন। কাকুতি-মিনতি সহকারে দোয়া করার পর আবদুল মোত্তালিব সঙ্গীদেরকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়লেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আবরাহার বাহিনীর উপর আল্লাহর গযব পতিত হবে। প্রতূষ্যে আবরাহা কাবা ঘর আক্রমণের প্রস্তুতি নিল এবং মাহমুদ নামক প্রধান হস্তীটিকে অগ্রে চলার ব্যবস্থা গ্রহণ করল। বন্দী নুফায়েল ইবনে হাবীব সম্মুখে অগ্রসর হয়ে হস্তীর কান ধরে বিড় বিড় করে বলতে লাগল তুই যেখান থেকে এসেছিস সেখানেই নিরাপদে চলে যা ।কেননা তুই এখন আল্লাহর সংরক্ষিত শহরে আছিস। অতঃপর সে হাতীর কান ছেড়ে দিল। হাতী একথা শুনেই বসে পড়ল। চালকরা তাকে আপ্রাণ চেষ্টা সহকারে উঠাতে চাইল। কিন্তু সে আপন জায়গা থেকে একবিন্দুও সরল না। বড় বড় লৌহ শলাকা দ্বারা পিটানো হল, নাকের ভিতরে লোহার শিক ঢুকিয়ে দেওয়া হল কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। সে দণ্ডায়মান হল না। তখন তারা তাকে ইয়ামেনের দিকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। সে তৎক্ষণাৎ উঠে পড়ল। অতঃপর সিরিয়ার দিকে চালাতে চাইলে চলতে চলতে লাগল। এরপর পূর্ব দিকেও কিছুদূর চলল। এসব দিকে চালানোর পর আবার যখন মক্কার দিকে চালানো হল তখন পূর্ববৎ বসে পড়ল।
এখানে তো আল্লাহর কুদরতের এই লীলাখেলা চলছিলই অপরদিকে সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এক ধরনের পাখী সারিবদ্ধভাবে উড়ে আসতে দেখা গেল। এগুলির প্রত্যেকটির কাছে ছোলা অথবা মসুরের সমান তিনটি করে কংকর ছিল একটি চঞ্চুতে ও দুটি দুই থাবায়। ওয়াকেদী (রঃ) বর্ণনা করেন, পাখীগুলো অদ্ভুত ধরনের ছিল যা ইতিপূর্বে কখনও দেখা যায়নি। দেখতে দেখতে সেগুলি আবরাহার বাহিনীর উপরিভাগ ছেয়ে ফেলল এবং বাহিনীর উপর কংকর নিক্ষেপ করতে লাগল। প্রত্যেকটি কংকর সেই কাজ করল যা বন্দুকের গুলিতেও করতে পারে না। কংকর যে ব্যক্তির উপর পতিত হত তাকে এপার-ওপার ছিদ্র করে মাটিতে পুঁতে যেত। এই আযাব দেখে সব হাতী ছুটাছুটি করে পালিয়ে গেল। একটিমাত্র হাতী ময়দানে ছিল যা কংকরের আঘাতে নিহত হল। বাহিনীর সব মানুষই অকুস্থলে প্রাণ হারায়নি বরং তারা বিভিন্ন দিকে পলায়ন করল এবং পথিমধ্যে মাটিতে পড়ে পড়ে মৃত্যুমুখে পতিত হল। আবরাহাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল। তাই সে তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করেনি। কিন্তু তার দেহে মারাত্মক বিষ সংক্রমিত হয়েছিল। ফলে দেহের এক একটি গ্রন্থি পচে-গলে খসে পড়তে লাগল। এমতাবস্থায়ই সে ইয়ামেনে নীত হল। রাজধানী ’সান’আয়’ পৌঁছার পর তার সমস্ত শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সে মৃত্যুমুখে পতিত হল। আবরাহার হস্তী মাহমুদের সাথে দু’জন চালক মক্কাতেই রয়ে গেল। তারা অন্ধ ও বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (রঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছেন, আমি এই দু’জন চালককে অন্ধ ও বিকলাঙ্গ অবস্থায় দেখেছি। হযরত আয়েশা (রাঃ) -র ভগিনী আসমা বলেন, আমি এই বিকলাঙ্গ অন্ধদ্বয়কে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখেছি। হস্তীবাহিনীর এই ঘটনা সম্পর্কেই আলোচ্য সূরায় রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)- কে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, আপনি কি দেখেননি বলা হয়েছে অথচ এটা রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর জন্মের কিছুদিন পূর্বেকার ঘটনা। কাজেই দেখার কোন প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু যে ঘটনা এরুপ নিশ্চিত যে, তা ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয় সেই ঘটনার জ্ঞানকেও ’দেখা’ বলে ব্যক্ত করা হয়। যেন এটা চাক্ষুষ ঘটনা।
হস্তী বাহিনীর এই অভূতপূর্ব ঘটনা সমগ্র আরবের অন্তরে কোরায়শদের মাহাত্ম্য আরও বাড়িয়ে দিল। এখন সবাই স্বীকার করতে লাগল যে, তারা বাস্তবিকই আল্লাহ ভক্ত। তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ্ স্বয়ং তাদের শত্রুকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। (কুরতুবী)
[হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ)। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত। তফসীরে মা'আরেফুল কোরআন, অষ্টম খন্ড থেকে সংগৃহীত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত।]
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Website
Address
Barishal