18/04/2026
তায়াম্মুম: বিধান ও পদ্ধতি
পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন পানি পাওয়া যায় না বা পানি ব্যবহারে জীবনের ঝুঁকি থাকে, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য তায়াম্মুমের বিধান রেখেছেন।
📖কুরআন মাজীদের বিধান
📍আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তায়াম্মুমের অনুমতি প্রদান করে ইরশাদ করেছেন:
وَاِنۡ كُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤى اَوۡ عَلٰى سَفَرٍ اَوۡ جَآءَ اَحَدٌ مِّنۡكُمۡ مِّنَ الۡغَآئِطِ اَوۡ لٰمَسۡتُمُ النِّسَآءَ فَلَمۡ تَجِدُوۡا مَآءً فَتَيَمَّمُوۡا صَعِيۡدًا طَيِّبًا فَامۡسَحُوۡا بِوُجُوۡهِكُمۡ وَاَيۡدِيۡكُمۡ مِّنۡهُ
অনুবাদ: "আর যদি তোমরা অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা থেকে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মাসেহ করো।" (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৬)
📖হাদিস শরীফের বর্ণনা
📍রাসূলুল্লাহ (সা.) তায়াম্মুমের গুরুত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا
অনুবাদ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমার জন্য সমগ্র জমিনকে সিজদাহ করার স্থান (মসজিদ) এবং পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম (মাটি) করা হয়েছে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
📍তায়াম্মুমের পদ্ধতি সম্পর্কে আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) থেকে বর্ণিত:
ضَرَبَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدَيْهِ الْأَرْضَ، وَنَفَخَ فِيهِمَا، ثُمَّ مَسَحَ بِهِمَا وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ
অনুবাদ: "নবী করীম (সা.) তাঁর দুই হাত মাটিতে মারলেন এবং তাতে ফুঁ দিলেন। অতঃপর তা দিয়ে তাঁর মুখমন্ডল ও উভয় হাতের কবজি পর্যন্ত মাসেহ করলেন।" (সহীহ বুখারী)
🔴তায়াম্মুমের সঠিক পদ্ধতি
তায়াম্মুম করার জন্য ধারাবাহিক নিচের কাজগুলো করতে হয়:
১. নিয়ত করা: মনে মনে এই সংকল্প করা যে, আমি পবিত্রতা অর্জনের জন্য তায়াম্মুম করছি।
২. বিসমিল্লাহ বলা: তায়াম্মুমের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নাত।
৩. মাটিতে হাত মারা: দুই হাতের তালু খুলে পবিত্র মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তু (যেমন পাথর, বালু) এর উপর একবার আঘাত করা।
৪. ফুঁ দেওয়া: হাতে অতিরিক্ত ধুলাবালি লেগে থাকলে তা ফুঁ দিয়ে ঝেড়ে ফেলা।
৫. মুখমন্ডল মাসেহ করা: দুই হাত দিয়ে পুরো মুখমন্ডল একবার এমনভাবে ঘষা যাতে কোনো অংশ বাদ না থাকে।
৬. হাত মাসেহ করা: এরপর বাম হাত দিয়ে ডান হাতের কবজি পর্যন্ত এবং ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কবজি পর্যন্ত মাসেহ করা। (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী কনুই পর্যন্ত মাসেহ করা জরুরি)।
🔴ইমামগণের অভিমত
তায়াম্মুমের কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে ইমামগণের মধ্যে সামান্য মতপার্থক্য রয়েছে, যা উম্মতের জন্য রহমত স্বরূপ:
⬜ইমাম আবু হানিফা (রহ.): তাঁর মতে, তায়াম্মুমের জন্য দুইবার মাটিতে হাত মারা জরুরি—একবার মুখমন্ডলের জন্য এবং একবার উভয় হাতের কনুই পর্যন্ত মাসেহ করার জন্য। এছাড়া মাটি ছাড়াও মাটি জাতীয় বস্তু যেমন পাথর বা চুন দিয়েও তায়াম্মুম বৈধ।
⬜ইমাম শাফেয়ী (রহ.): তাঁর মতে, তায়াম্মুমের জন্য অবশ্যই এমন মাটি হতে হবে যাতে ধুলাবালি ওড়ার ক্ষমতা থাকে। ধুলোহীন পাথর বা বালু দিয়ে তাঁর মতে তায়াম্মুম হবে না।
ইমাম মালিক (রহ.): তাঁর মতে, জমিনের উপরিভাগে যা কিছু প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান (যেমন মাটি, পাথর, ঘাস ইত্যাদি), তার ওপর তায়াম্মুম করা জায়েজ।
⬜ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): তাঁর শক্তিশালী মত অনুযায়ী, তায়াম্মুমে একবার মাটিতে হাত মেরে মুখ ও কবজি পর্যন্ত মাসেহ করাই যথেষ্ট, যেমনটি আম্মার (রা.) এর হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে।
🔴কখন তায়াম্মুম করা যাবে?
✓নিকটস্থ স্থানে পানি না পাওয়া গেলে।
✓পানি ব্যবহারে রোগ বেড়ে যাওয়ার বা জীবন নাশের আশঙ্কা থাকলে।
✓পানি অত্যন্ত শীতল হওয়ার কারণে মৃত্যু ঝুঁকি থাকলে এবং পানি গরম করার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে।
✓পথিমধ্যে দুশমন বা হিংস্র প্রাণীর ভয় থাকলে।