20/09/2026
আশা করি আপনারা সবাই ভিডিওটি এতোক্ষনে দেখে ফেলেছেন।
ছেলেটি নাকি বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু ভিডিওতে তার বন্ধুদের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং দেখা যাচ্ছে, সে একটি মার্কেটে গিয়ে অপেক্ষা করছে এবং প্রকাশ্যে তার ফোনটা বের করে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছিল। ফোন ব্যবহার করার ভঙ্গি দেখে মনে হয় না যে ফোনটা অন্য কারো, সে বাসা থেকে লুকিয়ে নিয়ে এসেছে!
এরপর তার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়, ক্যাপ পরা একটি ছেলে ফোনে কিছু একটা দেখতে দেখতে অথবা মেসেজ পড়তে পড়তে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিজেদের মধ্যে হ্যান্ডশেক করে। তারপর দেখা যায় ছেলেটি তার ফোন পকেটে ঢোকায়।
এরপর তাদের মধ্যে হয়ত কয়েক সেকেন্ড কিছু কথা হয়। ক্যাপ পরা ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকায়। কিছুটা আড়ষ্টতা, কিছুটা লুকানোর চেষ্টা তার অঙ্গভঙ্গিতে। আর ছোট বাচ্চাটি সহজ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষন পরই ক্যাপ পরা ছেলেটি বের হয়ে যায় এবং এই ছেলেটিও স্বচ্ছন্দে তার পেছনে পেছনে হাঁটা শুরু করে।
ক্লাস সেভেনে পড়া ১৩ বছর বয়সী ছেলেরা সাধারণত আরেকটু লম্বা চওড়া হয় কিন্তু এই বাচ্চাটি বয়সের তুলনায় সাইজে সম্ভবত একটু ছোটখাটো এবং দেখতেও শিশুশুলভ। তাই খুব সহজেই অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, ছেলেটিকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বের হতে দেখা গেছে। ভিডিওর ওই অংশটুকু দেখে অন্তত এমন মনে হয়নি যে তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কিংবা সে তখন বুঝতেই পারছে না কার সঙ্গে যাচ্ছে।
এই ছেলেটি তার সহপাঠী বলে মনে হচ্ছে না। পারিবারিকভাবেও পরিচিত কেউ বলে জানা যাচ্ছে না। তাহলে একজন কিশোরের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হলো কীভাবে? কে আগে যোগাযোগ করেছিল? কীভাবে তার বিশ্বাস অর্জন করা হয়েছিল? তাদের কি আগে থেকেই কোথাও দেখা হয়েছিল?
অনলাইনে কিছু গেমস আছে। সেখানে অপরিচিত লোকদের সাথে গেমসে পার্টিসিপেট করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। এখানেও অনেক সময় ফাঁদ পাতা হয়।
আর মায়ের আইফোন সঙ্গে নিয়ে আসার বিষয়টিতেও বিভ্রান্তি আছে অনেকের। আজকাল সবাই তাদের ফোন লক করে রাখে। আর যদি মায়ের ফোন হয় তাহলে সেখানে whatsapp অথবা মেসেঞ্জার এর অ্যাক্সেস সে কিভাবে পেল যে একজন অপরিচিত লোকের সাথে সে পরিচিত হয়ে গেল! আবার মেসেজ দিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসছে নির্দিষ্ট স্থানে?
এমনও হতে পারে শুধু আইফোন না, এখানে পারিবারিক পূর্ব শত্রুতারও ঘটনা থাকতে পারে। অনেকে বলছে বাচ্চাটাকে খুব সম্ভবত সকালে মেরে ফেলা হয়েছে কারণ রাতে মারলে শেয়াল বা অন্য কোন প্রাণী লা শ অক্ষত রাখত না।
ঘটনা যাই হোক, এই ভিডিওটি সকল অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হতে পারে।
তেরো বছরের একটি ছেলে একেবারে ছোট শিশু নয় যে তাকে সারাক্ষণ কোলে করে রাখা যাবে। আবার বাবা-মায়ের পক্ষেও ২৪ ঘণ্টা সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। সন্তানকে নিরাপদ রাখতে হলে শুধু নজরদারি নয়, তাকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখানোও জরুরি। কে বন্ধু, কে অপরিচিত, অনলাইনে বা বাস্তবে কেউ কীভাবে বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, কোথায় না বলতে হবে, কখন দ্রুত বাবা-মাকে জানাতে হবে, এসব শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে।
একটা সময় আমরা ভাবতাম, বিপদ মানেই অপরিচিত কেউ এসে শিশুকে ধরে নিয়ে যাবে। এখন বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বিপদ অনেক সময় বন্ধুত্বের মুখোশ পরে আসে, পরিচিতির সূত্র ধরে আসে, কখনো অনলাইন যোগাযোগের মধ্য দিয়ে আসে। শিশুর কাছে অপরিচিত একজন মানুষকে পরিচিত করে তোলার সবচেয়ে সহজ রাস্তাই এখন একটি মোবাইল ফোন।
আরেকটি বিষয় নিয়েও ভাবা দরকার। শিশুর হাতে আমরা কী দিচ্ছি? কেন দিচ্ছি?
দামি আইফোন হোক বা অন্য কোনো স্মার্টফোন, শিশুর প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্যবান জিনিস তার নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি সাধারণ বাটন ফোন নিয়েও ছিনতাই বা সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগেই কানে থাকা এক জোড়া দুলের জন্য একটি শিশুকে হ ত্যা করার খবর আমরা দেখেছি। শিশুর গায়ের অলংকার থেকে শুরু করে হাতে থাকা ফোন, যেকোনো কিছুই তাকে অপরাধীর লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
আমাদের দেশের বাস্তবতাও আগের মতো নেই। পনেরো-বিশ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। প্রযুক্তি বেড়েছে, মানুষের চলাফেরা বেড়েছে, যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে, সঙ্গে অপরাধের ধরনও বদলেছে।
ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা আমরা জানি না। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত, শুধু আমার বাচ্চা ভালো, সে কোনো ভুল করবে না, এই বিশ্বাস দিয়ে এখন আর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
সন্তানকে বাস্তবতা বুঝিয়ে বড় করতে হবে। তাকে বিশ্বাস করতে হবে, আবার সেই বিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ববোধও তৈরি করতে হবে।
কারণ বাবা-মা সন্তানের চারপাশে দেয়াল তুলে রাখতে পারবেন না সারাজীবন। একদিন তাকে সেই দেয়ালের বাইরে একাই হাঁটতেই হবে। নিরাপদে ফিরতে হলে তখন শুধু বাবা-মায়ের নয়, সন্তানের নিজের চোখও খোলা থাকতে হবে, রাখতে হবে।