16/08/2015
আমরা কি করি আর আমাদের কি করা উচিত - কি আশা করি আর কি পাই
-------------------------------------------------------------------------
আমরা যখন ছাত্র / ছাত্রী - আমরা চাই কি ভাবে যত কম লেখা-পড়া করে সর্বোচ্চ ভালো ফল পাওয়া যায়। এই জন্য আমরা স্যারের পিছনে সাজেশন এর জন্য ঘুর ঘুর করি। মোটামুটি একটা সাজেশন পেলে কিভাবে একটাকে আরো সংক্ষিপ্ত করা যায় উঠে পড়ে লেগে যাই। এর জন্য বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করে কি ভাবে স্যারকে বুঝিয়ে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র বের করা যায় তার পায়তারা করতে থাকি। প্রয়োজনে হাজার পাচেক টাকাও খরচ করি। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি এই ভাবে লেখা-পড়া শেষ করার পর আমাদের ব্রেইন নামক থলিতে কতটুকু জ্ঞান জমা করতে পারলাম।
সবাই জানে মুহিববুল্লাহ (উদাহরণ স্বরূপ) ভালো ছাত্র। সব বিষয়এ এ+ পেয়েছে। মুহিববুল্লাহ ভালো ভাবেই জানে যে ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায়, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় কিংবা ইনজিনিয়াড়িং ভর্তি পরীক্ষায় টিকতে হলে যে জ্ঞান থাকা দরকার তা তার নেই, তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। বরাবর যেভাবে সে এ+ পেয়েছে , এখানেও সে সেইরকম কিছু একটা পথ বের করে ফেলবে। কারণ এই একটি কৌশল সে বিগত পাচ বছর খুব ভালো ভাবে প্রয়োগ করেছে এবং ফলও পেয়েছে দারুন। এলাকার লোক বলে ছেলেটার কি মেধাবী দেখছ ! লেখা-পড়ার তেমন খবর নাই, সারাদিন খেলা-ধুলা আর বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা। তারপরও কিভাবে সে এ+ পেয়ে যাচ্ছে (আমি খুব কমই এ+ পেতাম, কারণ ঝোপ বুঝে কোপ মারতে পারতাম না, পরীক্ষায় কোনটা আসবে সেটা নিয়া কখনো ভাবিনাই, বরং প্রতিটা চাপ্টার ভালো ভাবে বুঝার চেষ্টা বেশি করেছিলাম। তাই ফলাফল তাত্ক্ষণিক না পেলেও আজ ১০ বত্সর পর আমি নিজেকে যতটা ভাগ্যবান মনে করছি, ততটা আমার ডাক্তার কিনবা ইনজিনিয়ার বন্ধুটি নয়)?
মিথ্যা খ্যাতির যে কি বিরম্বনা হয় তা বোধ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর "উকিল দুকরি" নাটকের মত এত সুন্দর করে আর কেউ বলছে কি না আমার জানা নাই। অথচ আমরা কি মন্ত্রী, কি শিক্ষক আর কি শিক্ষার্থী, সর্ব ক্ষেত্রেই যত কম কাজ করে যত বেশি প্রচার করা যায় বেস্ত হয়ে যাই, এতে করে আমরা আমাদেরকেই যে জ্যান্ত মূর্তি বানাচ্ছি সে দিকে কোনো খেয়াল নাই।
"সহজ" শব্দটা যতটা সহজ মনে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর ফলাফল ঠিক এর উল্টো হয় অর্থাত "কঠিন" হয় এবং আপনি একটা সহজ পথ অবলম্বন করে ইতিমধ্যে একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন অথবা পড়েছেন, এটা উপলব্ধি করতে অনকে সময় লেগে যায়। এই "সহজ" শব্দটা "কঠিন" শব্দে রুপান্তরিত হওয়ার প্রধান কারণ হল সবাই একই কাজ, একত্রে, একই নিয়মে সহজে করতে চায় এবং তা প্রতিযোগিতার সাথে করতে চায়। ঠিক তখনই "কঠিন" নামক শব্দটা হাসতে হাসতে এসে সামনে হাজির হয়। একটা ভালো উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হয়।
একটা সময় ছিল যখন মানুষ একটা গাড়ির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকত। যাদের যথেষ্ট টাকা পয়সা আছে তারা ভাবলো এইভাবে আর চলা যায় না। একটা প্রাইভেট গাড়ি দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ - একটা গাড়ি কিনে ফেলল। এখন সে খুব সহজেই মাত্র কয়েক মিনিটে যেকোনো জায়গায় চলে যায়। এখন জীবনটা কত সহজ মনে হয়। তাদের এই সহজ যাতায়েত দেখে অনকেই এই সহজ পদ্ধতি অর্থাত গাড়ি কেনা শুরু করলো। যারা গাড়ি বিক্রি করে তারা প্রচুর গাড়ি আমদানি করে সহজে ধনী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। ৩০-৬০ লক্ষ্য টাকার গাড়ি সবার পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাই তারা গ্রাহকদের জন্য সহজ পন্থা বাতলে দিল। ব্যাঙ্ক লোন নিতে হবে। ২০,০০০ টাকা বা তার বেশি বেতন দেখাতে পারলে কিস্তিতে গাড়ি পওয়া যাবে। এতে করে ব্যাংকও সহজে অনেক টাকা কামাইতে পারে। সরকার, ব্যাঙ্ক এবং গাড়ি বিক্রেতারা গাড়ি কেনার বিষয়টা এত সহজ করে দিল যে এর পরও যদি কেউ আমার মত গাড়ি কিনতে না পারে তাহলে সে হয় ফকির, না হয় কিপ্টা, আর না হয় সে অসামাজিক। তাই সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে আমরা গাড়ি কিনছি। কতটা প্রয়োজন তা মোটেই ভাবছি না। তাই সবাই একটা কথা সহজে মেনে নিয়েছে আর তা হলো যত বেশি গাড়ি তত বেশি মর্যাদা। গাড়ির চাপে বর্তমানে আমরা যে সুবিধা ও অসুবিধা দেখছি আর ভোগ করছি আজ একটু খতিয়ে দেখা দরকার :
- যেখানে হেটে গেলে সময় লাগে ৫ মিনিট, সেখানে গাড়িতে গেলে লাগে ৩০ মিনিট।
- যে রুগীর বাসা থেকে হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা নিয়ে ১ ঘন্টার মধ্যে বাসায় ফেরার কথা, সে রাস্তাতেই মারা যাচ্ছে।
- ফায়ার সার্ভিসের দল যখন আধা ঘন্টার মধ্যে প্রায় অক্ষত অবস্থায় ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণ করার কথা, আশেপাশের কিংবা গোটা এলাকা ধংশ হওয়ার আগ পর্যন্ত পৌছতে পারা না।
- কাজ সেরে ১ ঘন্টার মধ্যে বাসায় থাকার কথা, সারাদিন লেগে যায়, সাথে খরচ বেড়ে যায়।
- ১ লক্ষ্য গাড়ি জ্যামে আটকে থেকে ১ লক্ষ্য লিটার গ্যাস, তেল পুরে ফেলছে প্রতি ঘন্টায় অথচ কোনো ফল নেই
- সুস্থ মানুষ দ্রুত অসুস্থ হচ্ছে আর অসুস্থ মানুষ হার্ট এটাক, ব্রেন স্টক এ দ্রুত মারা যাচ্ছে
- যেখানে এক গাড়ি ছাড়া আপনি কত স্বাধীন ছিলেন, এখন পরাধীন হয়ে (গাড়ি, ড্রাইভার) চিন্তাযুক্ত জীবন যাপন করছেন
- গাড়িতে গ্যাস অপচয় এর ফলে বাসা-বাড়িতে গ্যাস থাকে না, দিনে দিনে দাম বাড়ছে।
- জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়, আর আমরা বেশি দাম দিয়ে পণ্য ক্রয় করি
এইভাবে তালিকা তৈরী করলে আরো অনেক বড় করা যাবে। আমার তালিকা করার মূল উদ্দেশ্য না। আপনি আপনার যাতায়েত বব্যবস্থাকে যত সহজ করেছিলেন, গুটিকয়েক স্বার্থ সন্ধানী লোক আপনাকে গাড়ি কেনার জন্য যে সহজ পথ বাতলে দিয়েছিল, এখন আপনি নিজেই ভাবুন আপনার এই সহজ ব্যক্তি স্বার্থ আজ জাতীয় স্বার্থকে কতটা ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। অথচ আপনিও সুখী নাই। এখন এই সর্ব লোকের বাক্তি স্বার্থের "সহজ" শব্দটা আজ বরই "কঠিন" শব্দে পরিনত হয়েছে। যে ব্যাঙ্ক, যে গাড়ি বিক্রেতা, যে মন্ত্রী, যে বিজ্ঞাপন দাতা, যে অভিনয় শিল্পী, যে মিডিয়া আপনার কাছে একটা গাড়ি বিক্রি করে সহজে ধনী হয়েছেন, তারাও কিন্তু প্রতিদিন এই কঠিন সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন। (মুহিব্বুল্লাহ)