17/11/2025
মেরুদণ্ডের ইতিকথা
ব্রিটিশ শাসনের সময় এই সাব কন্টিনেন্টে, এক ব্রিটিশ অফিসার, কোনো এক বাদানুবাদের মুহূর্তে এক ভারতীয় যুবকের মুখে চড় মারে। সাথে সাথে যুবকটিও তাঁর সমস্ত শক্তিতে বৃটিশ অফিসারকে এতো জোরে চড় মারে, যে ঐ অফিসার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
এই অপমানে হতবাক হয়ে যাওয়া অফিসার ভাবলেন সামান্য এক ভারতীয় যুবক কীভাবে এমন এক সাম্রাজ্যের সেনা অফিসারকে চড় মারল যে সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যায় না।
তিনি দ্রুত তার পোস্টে গিয়ে ওই ভারতীয়কে কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য দাবী করলেন।
কিন্তু উচ্চপদস্থ কমান্ডার তাকে শান্ত করে বললেন ভারতীয় লোকটিকে শাস্তি না দিয়ে বরং তাকে পুরষ্কৃত করতে। আর পুরষ্কার হিসাবে তাকে দশ হাজার রুপি উপহার দিতে।
অফিসার ঘৃণায় চিৎকার করে বললেন এটা শুধু আমার, আপনার অপমান না। বরং এটা বৃটিশ মহারাণীরও অপমান। আর আপনি বলছেন তাকে শাস্তি না দিয়ে আরো পুরষ্কৃত করতে।
কমাণ্ডার এবার বললেন- এটা একটি সামরিক আদেশ আর তুমি দেরি না করে এ আদেশ পালন করবে।
জুনিয়র অফিসার তার কমান্ডারের আদেশ মেনে দশ হাজার রুপি সাথে নিয়ে ওই ভারতীয়ের কাছে গিয়ে বললেন- অনুগ্রহ করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আর এই দশ হাজার রুপি উপহার হিসাবে গ্রহণ করুন।
ভারতীয় যুবক উপহার গ্রহণ করলেন এবং ভুলে গেলেন যে তাকে তার দেশের মাটিতে এক ঔপনিবেশ সেনা অফিসার দ্বারা থাপ্পড় মারা হয়েছে।
সেই সময়ে দশ হাজার রুপি অনেক বড় অর্থ। ঐ অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে জীবনের মান উন্নত করে বিত্তশালী হয়ে ওঠেন। আগে ছিলেন একজন সাধারণ যুবক। এখন সমাজে বেশ প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি।
অনেক বছর পর সেই ইংরেজ কমান্ডার তার জুনিয়র অফিসারকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন- তুমি কি সেই ভারতীয়কে মনে রেখেছো- যে তোমাকে চড় মেরেছিলো?
অফিসার বলল: সেই অপমান আমি ভুলি কেমন করে?
কমান্ডার বললেন: এখন সময় এসেছে। তুমি তাকে খুঁজে বের করো এবং জনসম্মুখে তাকে সজোরে চড় মেরে এসো।
অফিসার বলল: সেটা কিভাবে সম্ভব। যে গরীব থাকা অবস্থায় আঘাতের পাল্টা জবাব দিয়েছিলো। আর এখন তো সে বিত্তবান, সেতো আমাকে মেরেই ফেলবে।
কমান্ডার বললেন: আমি যা বলছি তাই করো। এটা তোমার প্রতি আদেশ! জুনিয়র অফিসারকে আদেশ মানতে হয়, তিনি সেই ভারতীর কাছে গেলেন এবং খুর জোরে তাকে থাপ্পড় মারলেন।
কিন্তু এবার ঘটলো সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।
ভারতীয় যুবকের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। এমনকি সাহস করে অফিসারের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারলো না। অফিসার অবাক হয়ে ফিরে এসে তার কমান্ডারের কাছে গেলো। কমান্ডার বললেন: আমি তোমার মুখে বিস্ময়ের ছাপ দেখছি, তুমি এতো বিস্মিত কেন?
অফিসার বলল, যখন সে দরিদ্র ছিলো তখন সে পাল্টা আঘাত করেছিলো। কিন্তু আজ যখন সে বিত্তশালী হয়েছে তখন সে চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারলো না। এটা কেমন করে সম্ভব!
ইংরেজ কমান্ডার ধীরভাবে বললেন: প্রথমবার তার কাছে তার সম্মান ছাড়া আর কিছু ছিল না। সে সেটাকেই সবচেয়ে মূল্যবান মনে করেছিল এবং তা রক্ষার করার জন্য সে মৃত্যু ঝুকি নিয়েও লড়েছিলো। আর এখন সে আর সেটা রক্ষার চেষ্টা করে নি। কারণ তার কাছে এখন তার সম্মানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে বিত্ত। যেদিন সে দশ হাজার রুপি উপহার হিসাবে গ্রহণ করেছে সেদিনই সে তার মর্যাদা, আত্ম সম্মানবোধ রুপির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
আর বিত্তের কাছে মানুষের আত্ম সম্মানবোধ যখন বিক্রি হয়ে যায় তখন যে কোন মানুষের মেরুদণ্ডও বাঁকা হয়ে যায়।
আসুন আত্মসম্মানবোধ বজায় রাখি।
দেশের বাইরে গিয়ে নিরাপদে আছি ভেবে, পদ-অর্থ, উপহার/সুবিধা কিংবা কোনো কিছুর লোভে নিজেকে অন্য দেশ - অন্যায় প্রক্রিয়া - অন্যায্য দাবির কাছে
বিক্রি না করে নিজের মেরুদণ্ড সোজাসুজি শক্তভাবে দৃঢ় রাখি!
(সংগৃহীত)