16/09/2025
অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণঃ আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরী
এই সাধারণ সতর্কতাগুলো মেনে চলুন:
🐄 পশুকে টিকা দিন: আপনার গবাদিপশুকে বছরে একবার অ্যানথ্রাক্সের টিকা দিন।
❌ অসুস্থ পশু থেকে দূরে থাকুন: অসুস্থ বা হঠাৎ মারা যাওয়া পশুর সংস্পর্শে আসবেন না এবং এর মাংস খাবেন না।
🔥 মাংস ভালোভাবে রান্না করুন: মাংস সবসময় উচ্চ তাপে ভালোভাবে সিদ্ধ করে খান।
👨⚕️ লক্ষণ দেখলে চিকিৎসা নিন: ত্বকে অস্বাভাবিক কালো ঘা দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
রংপুরের পীরগাছায় পশু থেকে মানবদেহে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পরার সম্ভাব্য ঘটনাটি পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) থেকে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পর্যন্ত সকল বিশেষজ্ঞ সংস্থাই এই অ্যানথ্রাক্স সম্পর্কে বারবার সচেতন করে আসছে। আসুন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে জেনে নিই কীভাবে এই বিপদ থেকে আমরা সুরক্ষিত থাকতে পারি।
অ্যানথ্রাক্স আসলে কী?
অ্যানথ্রাক্স হলো ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস (𝘉𝘢𝘤𝘪𝘭𝘭𝘶𝘴 𝘢𝘯𝘵𝘩𝘳𝘢𝘤𝘪𝘴) নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্ট মারাত্মক সংক্রামক রোগ। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর তথ্যমতে, এই ব্যাকটেরিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ হলো এর স্পোর (spore) বা জীবাণুর গুটি। এই স্পোরগুলো নিজেদের চারপাশে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করতে পারে, যার ফলে এরা মাটি, পানি বা পশুর পশমে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দশকের পর দশক টিকে থাকতে পারে।
বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে বন্যার পর যখন পানি নেমে যায়, তখন মাটির গভীর থেকে এই ঘুমন্ত জীবাণুগুলো উপরে উঠে আসে এবং ঘাসের উপর ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব পশু স্বাস্থ্য সংস্থা (World Organisation for Animal Health - WOAH)-এর মতে, গরু, ছাগল বা ভেড়ার মতো তৃণভোজী পশুরা সেই ঘাস খাওয়ার সময় অজান্তেই এই জীবাণু খেয়ে ফেলে এবং আক্রান্ত হয়। এরপরই শুরু হয় মানুষের জন্য আসল বিপদ।
যেভাবে রোগ ছড়াতে পারেঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছে:
১. ত্বকের মাধ্যমে সংক্রমণ (Cutaneous Anthrax): প্রায় ৯৫% সংক্রমণ এভাবেই হয়। অসুস্থ পশুর মাংস কাটা, চামড়া ছাড়ানো বা পশম নাড়াচাড়া করার সময় শরীরের সামান্য কাটাছেঁড়া দিয়েও জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। এর প্রথম লক্ষণ হলো পোকার কামড়ের মতো একটি ফুসকুড়ি, যা দ্রুত একটি ব্যথাহীন ফোসকায় পরিণত হয়। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফোসকাটি ফেটে গিয়ে একটি কালো শুকনো ঘা (Black Eschar) সৃষ্টি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এই কালো দাগটিই অ্যানথ্রাক্স শনাক্তকরণের সবচেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ।
২. অসুস্থ পশুর মাংস খেলে (Gastrointestinal Anthrax): এটি তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। ভালোভাবে সিদ্ধ না করে আক্রান্ত পশুর মাংস খেলে পেটে তীব্র ব্যথা, রক্তবমি এবং রক্তাক্ত ডায়রিয়া দেখা দেয়। CDC-এর তথ্যমতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এক্ষেত্রে মৃত্যুহার ২৫% থেকে ৬০% পর্যন্ত হতে পারে।
৩. শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে (Inhalational Anthrax): এটি বিরল কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক। আক্রান্ত পশুর লোম বা চামড়া থেকে উড়ে আসা স্পোর শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করলে এর লক্ষণ দেখা দেয়। প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ সর্দি-কাশির মতো হলেও তা দ্রুত মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ও শকে পরিণত হয় এবং মৃত্যু প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
পরামর্শঃ
ক. পশুপালকদের জন্য অবশ্য পালনীয়ঃ টিকাদান সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ:
১. DLS এবং WOAH উভয় সংস্থাই অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধের প্রধান উপায় হিসেবে গবাদিপশুর নিয়মিত টিকাদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বছরে একবার আপনার সকল গবাদিপশুকে (গরু, ছাগল) অবশ্যই অ্যানথ্রাক্সের টিকা দিন।
২. হঠাৎ মারা যাওয়া পশুই বিপদের চিহ্ন: কোনো পশু হঠাৎ মারা গেলে বা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে, কখনোই সেই পশুকে জবাই করবেন না। কসাইয়ের ছুরিই হতে পারে আপনার বা আপনার প্রতিবেশীর মৃত্যুর কারণ।
৩. নিরাপদ সৎকার (WOAH-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী): মৃত পশুকে খোলা জায়গায় না ফেলে রেখে দ্রুত প্রাণিসম্পদ অফিসে খবর দিন। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী, পশুটিকে মাটির অন্তত ৬ ফুট গভীরে পুঁতে ফেলুন এবং পোঁতার আগে ও পরে জীবাণুনাশক, যেমন—চুন বা ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন। এটি মাটির জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করবে।
খ. সাধারণ মানুষের জন্য সুরক্ষার উপায়:
১. মাংস কেনার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা: অসুস্থ, দুর্বল বা অস্বাভাবিক কম দামের মাংস কেনা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। জবাই করার আগে পশুটি সুস্থ ছিল কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
২. সঠিকভাবে রান্না করুন: মাংস সব সময় উচ্চতাপে (কমপক্ষে ৭০° সেলসিয়াস/১৬০° ফারেনহাইট) এবং ভালোভাবে সিদ্ধ করে রান্না করুন।
৩. লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা নয়: ত্বকে উপরে বর্ণিত কালো ঘা বা অন্য কোনো লক্ষণ দেখা দিলে এবং সম্প্রতি পশু জবাই বা মাংস নাড়াচাড়ার ইতিহাস থাকলে এক মুহূর্তও দেরি না করে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান।
আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকুন।
-লেখাঃ গবেষণা কর্মকর্তা, আইসিডিডিআর,বি