08/03/2016
এসএম কাওসার,বগুড়া ব্যুরো
ফকির লালন সাঁইয়ের সহজ মানুষ তো সামান্য মানুষ। আর এই সামান্য তুচ্ছ অর্থে নয়; যা সব কিছুকে সমান করে তাই সামান্য। ইংরেজিতে বলে ইউনিভার্সেল ম্যান। সামান্যের বিপরীত অর্থ বিশেষ বা পার্টিকুলার। আর যিনি লালনভক্ত তিনি বিশেষ থাকবেন কেন, তিনি হবেন সামান্য। সহজ বা সামান্য মানুষ জাগতিক সম্পদকে তুচ্ছজ্ঞানে বিলিয়ে দেন সমগ্রের মাঝে। এমনই এক সহজ মানুষ বগুড়ার মোটর শ্রমিক ইকবাল হোসেন বল।
বগুড়া-কাহালু সড়কের শহরদীঘি এলাকার এই লালনভক্ত নিজের শেষ সম্বল পৈতৃক ভিটায় প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি পাঠশালা। ১৬ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা 'বগুড়া লালন স্কুল' নামে এই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এলাকার গরিব পরিবারের সন্তানদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
২০০৯ সালে নিজ বাড়িতে প্রথম গড়ে তোলেন লালন একাডেমি। প্রতি বছর এখানে হয় লালন মেলা। উৎসব চলে পাঁচ দিনব্যাপী। পরের বছরই প্রতিষ্ঠা করেন লালন স্কুল। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা বিদ্যালয়টি তিনজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এখন পাঁচ ক্লাস মিলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫৪। শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। এখানকার সব শিক্ষার্থীই সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও গরিব ঘরের। বিদ্যালয়টিতে পাঁচটি শ্রেণীকক্ষ ছাড়াও আছে একটি অফিস ও একটি সঙ্গীতচর্চা কক্ষ।
ইকবাল হোসেনের এই পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের গতানুগতিক পাঠদানে সীমাবদ্ধ নেই; সবাইকে বাধ্যতামূলক লালন সঙ্গীতেরও চর্চা করতে হয়। ধারণ করতে হয় লালনের মানবধর্ম। প্রতি শুক্রবার হয় লালন সঙ্গীতের ক্লাস।
ইতিমধ্যে ওই বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) দিয়ে বের হয়েছে দুটি ব্যাচ। প্রথম ব্যাচের রিতা খাতুন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে উর্ত্তীণ হয়। এখানকার শিক্ষার্থীদের বিনোদন বলতে লালনচর্চা; তাদের নেই তেমন চাওয়া-পাওয়া; শিক্ষকদেরও তাই। বিদ্যালয়ের প্রধান
শিক্ষক শারমিন আক্তার বলেন, বিদ্যালয়টি চলছে ব্যক্তিগত আর্থিক সহায়তায়, নেই সরকারি কোনো অনুদান। শিক্ষকরা স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব নিয়েই এখানে পাঠদান করছেন। তবে তাদের মাসে সামান্য পরিমাণে সম্মানি দেওয়া হয়। তবুও বিদ্যালয়টি চালাতে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এ টাকার জোগান দেন প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সদস্যরা। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে লালন সঙ্গীত পরিবেশন করেও কিছু অর্থ পেয়ে থাকে। এভাবেই চলছে প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রতিষ্ঠানটি শুরুর সময় পরিদর্শনে এসেছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার রঞ্জিত মিত্র। তিনি প্রতিষ্ঠানটি দেখে মুগ্ধ হয়ে পরিদর্শন বইতে এর সাফল্য কামনা করে মন্তব্য লেখেন।
এখানকার বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, লালন একাডেমির সঙ্গে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করায় এলাকার গরিব শিশুরা পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি বছর লালন উৎসবের সময় এখানকার ঘরে ঘরে উৎসব চলে। বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বজনরা বেড়াতে আসেন।
প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা-টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বগুড়া জেলা সভাপতি ডা. শামির হোসেন মিশুসহ ১০ জন। সাধারণ সদস্য রয়েছেন ৪৩ জন। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল হোসেন বল এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন অ্যাডভোকেট নুরুল হুদা হেদায়েত।
সুন্দর মনোরম পরিবেশে গড়ে তোলা এই পাঠশালা ও লালন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল হোসেন বল জানান, শৈশব থেকেই তিনি লালনভক্ত। সময় সুযোগ পেলেই ছুটে যান কুষ্টিয়ায় লালন সাঁইয়ের আখড়ায়। সেখানেই পরিচয় ঘটে ফরিদা পারভীনের সঙ্গে। ফরিদা পারভীনকেই প্রথম বগুড়ায় লালন একাডেমি ও লালন স্কুল প্রতিষ্ঠার আগ্রহের কথা জানান। জমি কোথায় পাওয়া যাবে_ ফরিদা পারভীনের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তার শেষ সম্বল ভিটেমাটি দেওয়ার কথা বলেন। পরে ফরিদা পারভীন জায়গা পরিদর্শন করে সম্মতি দিলে গড়ে তোলা হয় প্রথমে লালন একাডেমি, পরে পাঠশালা।
ইকবাল হোসেন আরও বলেন, প্রতি বছর জানুয়ারিতে পাঁচ দিনব্যাপী লালন উৎসব হয়। উৎসবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসেন। দর্শনার্থী ও অতিথিরা এসে বিদ্যালয় ও একাডেমি দেখে বাহবা দেন। এটাই আমার বড় পাওয়া।
ফকির লালন সাঁইয়ের সহজ মানুষ তো সামান্য মানুষ। আর এই সামান্য তুচ্ছ অর্থে নয়; যা সব কিছুকে সমান করে তাই