24/09/2024
তামিম রায়হান ভাই! আপনাকে ধন্যবাদ। ...................................
ফেসবুকে আমার নতুন এই প্রোফাইলে বন্ধুতালিকায় যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। এঁদের মধ্যে অনেকেই কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী। যখনই ফেসবুকে নিউজফিড স্ক্রল করি, এই আধুনিকমনা কওমি প্রজন্মের কর্মকান্ড দেখে অবাক হই। এমন দেখা থেকে আজকের এই লেখা।
দেশে চলমান পরিস্থিতিতে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার এমন কোনো বিষয় নেই, যেটা নিয়ে তারা স্ট্যাটাস দিচ্ছেন না বা অন্যের লেখা কপি-পেস্ট করছেন না। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, ফ্যাসিবাদ, বিপ্লব, ইসলামি শাসন, বায়তুল মোকাররমের খতিব, ধর্ম উপদেষ্টা, ইসলামি অঙ্গনের নেতাদের কারও সুনাম, কারও বদনাম- কিছুই বাদ যাচ্ছে না। যেন এঁদের প্রত্যেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনীতির গবেষক, একেকজন ভবিষ্যতে দেশের সচিব বা মন্ত্রী হবেন, কাজেই এখন থেকে প্রত্যেকটা বিষয়ে কথা বলার গুরুদায়িত্ব তাদের কাঁধে অর্পিত।
অথচ যুগচাহিদার আলোকে নিজেদের পড়াশোনা ও যোগ্যতার মান উন্নয়ন, সার্টিফিকেটের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন, বিদেশে উচ্চতর পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধাসহ কত অবহেলিত বিষয় পড়ে আছে, যেগুলো নিয়ে নিজেদের জন্য এবং নিজেদের স্বার্থে সবার আগে একসাথে চিন্তা-ভাবনা এবং মতবিনিময় ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন, সেসব নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
আজকের কওমি প্রজন্ম নিজেদের অজান্তে কোন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে ছুটছে, কে তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সোশ্যাল মাধ্যম ও রাজপথে তারা কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এসব করে কাজের কাজ কতটুকু হচ্ছে, এগুলো নিয়ে কোনো আত্মসমালোচনা নেই, উদ্যোগও নেই।
এই আত্মসমালোচনার অভাবে আত্মবিভোর তরুণরা এখন ফেসবুকে পছন্দের নেতা বা সেলিব্রেটির পোস্টে লাইক, শেয়ার এবং মাশাল্লাহ-আলহামদুল্লিাহ কমেন্ট, আর ফেসবুকের বাইরে কোথাও কোনো বক্তা বা নেতার আগমন উপলক্ষে ব্যাপক উপস্থিতির শোডাউন- এগুলোকেই নিজেদের আত্মতৃপ্তির জায়গা ভেবে পুলকিত।
অহেতুক প্রশংসা অথবা অনর্থক নিন্দা ছাড়া কোথাও কোনো রকমের সৃজনশীল লেখালেখি ও আলোচনা অথবা যৌক্তিক প্রশ্ন ও সমালোচনার জ্ঞানভিত্তিক চর্চায় আগ্রহ আজ শূন্যের কোঠায়। দেশের প্রথম সারির কোনো গণমাধ্যম বা সেলিব্রেটি তাদেরকে নিয়ে কিছু ভালো লিখল কিনা, এটিকেই তারা নিজেদের সার্টিফিকেট বা মূল্যায়ন ভেবে খুশি হয়ে যান।
এই বাস্তবতায় কখনো মনে হয়, কওমির এই প্রজন্মের জ্ঞানের সীমানা যেন দিনদিন ছোট হচ্ছে, চিন্তার জগত সংকীর্ণ হয়ে আসছে- ফলে ফেসবুকের ক্যাচালের বাইরেও যে সুবিশাল এক কর্মক্ষেত্র এবং সেখানে করণীয় অনেক কিছু বাকি আছে- সেটা অনেকেই ভুলতে বসেছে।
চারপাশে সবকিছুই আমার পছন্দের হতে হবে, সবকিছু নিয়ে আমাকে কথা বলতেই হবে, কাউকে অপছন্দ হলেই তাকে টেনে নিচে নামিয়ে ফেলতে হবে- এসব মোটেও যে বাস্তবসম্মত এবং প্রয়োজনীয়ও নয়, সেটি বলার যেন কেউ নেই। এমনকি এই ফেসবুকে যে কোনো ইস্যুতে কিছু শেয়ার বা কপি-পেস্ট করার আগে সেটি সত্য কিংবা বাস্তব কিনা, অথবা এটি নিজেদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কিনা, এটুকু ভেবে দেখার সময়, খুঁজে দেখার ধৈর্য এবং যাচাইয়ের ইচ্ছা- কিছুই নেই।
এমন কেউ নেই যে আজ ডেকে বলবে, চারপাশে প্রতিনিয়ত নানারকম বিষয় ঘটতে থাকবে, যেগুলো নিয়ে আমাদের কথা বলার প্রয়োজন নেই। এমন অনেক কিছু থাকতে পারে যা আমার পছন্দ হবে না, তাই বলে সেটির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগারও কোনো দরকার নেই। কী নিয়ে কথা বলা উচিত এবং কিসের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত বা দাবি-দাওয়া প্রকাশ করা উচিত, সেটির অন্তত একটি নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও বুদ্ধিভিত্তিক বৃত্ত থাকা উচিত।
আজকের এই সময়ে আমাদের প্রধান কাজ হওয়ার কথা দেশ ও সমাজে নিজেদের প্রভাবশালী এবং সম্মানজনক অবস্থান তৈরির দিকে নজর দেওয়া, নিজেদের জ্ঞান ও যোগ্যতাকে বহুমুখী করে কর্মক্ষেত্রকে ব্যাপকবিস্তৃত করার জন্য কী কী প্রয়োজন, সেসব খুঁজে বের করা।
ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশে এখন নিজেদের ডানা মেলার সময়। এই সময়ে যদি নিজেদের ‘ভালো’ এবং ‘উচিতকর্ম’ নিজেরা না বুঝি, তবে আর কেউ কোনোকালে তা বুঝাতে পারবে না।
এই কথাগুলো খুব করে বলা দরকার।