04/12/2025
জান, আমার ওয়াইফের লাঙ্গলবন্দে পুণ্যস্নান করার যেই বায়না, হেইডা আমার কানে খালি যুক্তির দেয়াল থেইকা বারি খাইত। আমি তো এই 'বিশ্বাস-টিশ্বাস'-এর ধারেকাছেও যাইতাম না। তয়, তার মুখের দিকে তাকাইয়া, আর সে যেইভাবে নদীর তরি মন খারাপ কইরা থাকতো, তাতে রাজি না হইয়া পারলাম না।
শীতের শেষে, চৈত্র মাসের সেই অষ্টমী তিথির ভিড়ে আমরা লাঙ্গলবন্দে নামলাম। চারিদিকে পূজার গন্ধ, শঙ্খের আওয়াজ আর মানুষের কলরব। ব্রহ্মপুত্র নদ সেইদিন বহুত শান্ত আর সুন্দর লাগতাছিল।
আমি ওয়াইফরে ধইরা বারবার কইলাম, "খালি ঘুরবা। আর কিছু না। গোসলের কোনো চান্স নাই, বুঝছো?" সে মাথা নাইচা দিলো, কিন্তু তার চোখ দুইটা খালি নদীর পানির লগে কথা কইতাছিল। আমরা ঘুরলাম, ঘাটের পাশে বইসা কত কী খাইলাম। নদীর শান্ত ঢেউগুলা দেখতাছি—কিন্তু ওয়াইফের মনের ভিতরের ঢেউ থামে না।
খানিক পরে, ওয়াইফ আমারে নিয়া যেই মিনতি করলো, হেইডা ফিরাইতে পারলাম না। চোখগুলা ছলছল কইরা কইলো, "আমার এতদূর আসাডা কি বৃথা যাইবো? গোসল না করি, খালি এক চিলিক জল ধইরা হাত-মুখডা ধুই? একটু ছোঁয়া লাগাই?"
আমি কইলাম, "আচ্ছা, ঠিক আছে। খালি হাত-মুখ ধুয়ে আইসো।"
সে সিঁড়ির একদম কিনারে গেল। ব্রহ্মপুত্রের জল তার পায়ের কাছে আছড়াইয়া পড়তাছে। যেই না সে হাত বাড়াইছে পবিত্র জল স্পর্শ করার তরি, সেই মুহূর্তেই... পা পিছলাইয়া গেল!
আমি কিছু বুঝার আগেই ধপাস! আমার ওয়াইফ হাঁটু-সমান পানির মইধ্যে পইড়া গেল! তার পরনের শাড়ি, চুল—সব ভিইজা এক্কেরে নদীর জল হইয়া গেল।
আমি তো হতভম্ব! আমার সমস্ত যুক্তি, আমার না-বিশ্বাস—সব চুপ হইয়া গেল। ওয়াইফের মনের ইচ্ছা পূরণের তরি ঠাকুর কী সহজ একখান রাস্তা বাইর করলো! তারে দিয়া জোর কইরা গোসল না করাইয়া, এমনভাবে তারে পবিত্র জলে ডুবাইলো যেন কারোর কোনো দোষ নাই।
বিপদে পড়লাম শাড়ির তরি। এই ভিজে কাপড়ে ফিরা যাই কেমনে? তখন আশপাশে একখান মুসলিম পরিবারের বাড়িতে গেলাম। ভয়ে ভয়ে সব ঘটনা কইলাম।
জান, সেই পরিবারের মানুষগুলার দয়ামায়া দেখলে তুমি অবাক হইতা! তারা আমার ওয়াইফের কষ্টডা দেইখা কোনো কথা না কইয়া নিজের ঘর থেইকা একখান শাড়ি বাইর কইরা দিল। আর সেই ভিজে যাওয়া শাড়িডা যত্ন কইরা ধুইয়া, শুকাতে দিল।
অনেক অপেক্ষার পরে, যখন শাড়ি শুকা গেল, তখন আমরা তাদের ধন্যবাদ দিয়া বিদায় নিলাম।
ফিরা আসার পথে আমার মনে হইলো, জান, লাঙ্গলবন্দ খালি পুণ্যস্নানের জাগা না। এইখানে গিয়া আমার ওয়াইফের মনের ইচ্ছাডা পূরণ হইল, আর আমার মনে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা নিয়া একখান নতুন বিশ্বাস জন্মাইলো। সেইদিন আমি দুইরকমের পুণ্য অর্জন করছিলাম: নদের পবিত্রতা আর মানবিকতার শুদ্ধতা! এইডা শুধু একখান গল্প না, জান, এইডা হইল দৈবকৃপা আর উদারতার একখান দারুণ সাক্ষী।
কেমন হইলো, জান? এইবার কি তোমার মন মতো সুন্দর হইছে?