11/08/2026
🤔🤔নাস্তিকতা এক মরীচিকা
এটি বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকের ইউরোপের একটি সমুদ্রতটের দৃশ্য। সারা বিশ্ব বিস্ময়ে দেখেছিল যে বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজগুলো এত মানুষের ভিড়ে উপচে পড়েছিল যে অনেকে ছাদে, রেলিংয়ে, কিনারায় এমনকি দড়ি ধরে ঝুলেও যাত্রা করতে প্রস্তুত ছিল। যেমন কাবুল থেকে পালানোর সময় মানুষকে বিমান থেকে পড়ে যেতে বিশ্ব দেখেছিল, তেমনি এখানে বহু মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছিল। পুরুষ, নারী, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে শুধু একটি আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বেরিয়েছিল, যেভাবেই হোক নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এটি কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের দৃশ্য ছিল না। এটি ছিল ইউরোপের শান্তিপূর্ণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আলবেনিয়ার চিত্র, যেখানে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এমন এক মতাদর্শ শাসন করেছিল, যা আল্লাহ, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে উন্নতির সবচেয়ে বড় বাধা বলে ঘোষণা করে সেগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
এই সেই আলবেনিয়া, যাকে ১৯৬৭ সালে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম সরকারি নাস্তিক রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। সে সময়ের কমিউনিস্ট শাসক এনভার হোজা দাবি করেছিলেন, ধর্মকে বিলুপ্ত করেই একটি আধুনিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। ফলে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়, আজানের ধ্বনি স্তব্ধ করা হয়, পবিত্র কুরআনের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়, আলেম ও ইমামদের কারাগারে বন্দি করা হয় এবং নতুন প্রজন্মকে বোঝানো হতে থাকে যে আল্লাহর প্রতি ঈমান নয়, বরং নাস্তিকতাই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
কিন্তু ইতিহাসের রায় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আজও বিশ্বের কিছু মহলে দাবি করা হয়, “ধর্ম উন্নতির পথে বাধা।” আলবেনিয়ার ইতিহাস এই দাবির ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। যদি ধর্মকে মুছে ফেলাই উন্নতির নিশ্চয়তা হতো, তাহলে বিশ্বের প্রথম সরকারি নাস্তিক রাষ্ট্রই পৃথিবীর সবচেয়ে সফল দেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ঠিক তার বিপরীত। সমস্যা ধর্মে ছিল না, বরং এমন এক মতাদর্শে ছিল, যা মানুষকে তার স্রষ্টা, তার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং তার স্বাভাবিক প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
এখানে একটি মৌলিক সত্যও বিবেচনার দাবি রাখে। ইসলামের অবস্থান এ ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামের প্রথম ওহি শুরু হয়েছে “ইকরা” অর্থাৎ “পড়ো” শব্দ দিয়ে। পবিত্র কুরআন বারবার চিন্তা, গবেষণা, ন্যায়বিচার, সততা, পরিশ্রম, ব্যবসা, পরামর্শ এবং মানবসেবার আহ্বান জানায়। এ কারণেই মুসলমানরা যখন কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার অনুসরণ করছিল, তখন বাগদাদ, কর্ডোভা, দামেস্ক, কায়রো, সমরকন্দ ও বুখারার মতো শহর জ্ঞান ও গবেষণার বিশ্বকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, প্রকৌশল ও দর্শনে মুসলমানদের অবদান আজও ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়। মুসলমানদের পতন ইসলামের অনুসরণের কারণে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর শুরু হয়।
আলবেনিয়া ছিল ইউরোপের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর একটি। উসমানীয় আমলে এখানে ইসলাম সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এনভার হোজা ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় ৪৪ বছর কঠোর হাতে দেশ শাসন করেন। শুরুতে তিনি সমতা, ন্যায়বিচার ও উন্নতির স্লোগান দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সরকার কঠোর একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়।
তিনি আলবেনিয়াকে বিশ্বের প্রথম সরকারি নাস্তিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে ধর্মের বিরুদ্ধে সংগঠিত অভিযান শুরু করেন। দুই হাজারেরও বেশি মসজিদ, গির্জা, খানকাহ ও উপাসনালয় বন্ধ করে দেওয়া হয় অথবা সেগুলোকে গুদাম, ক্রীড়া হল, জাদুঘর ও সরকারি দপ্তরে রূপান্তর করা হয়। আজান, নামাজ, রোজা, ধর্মীয় সমাবেশ ও ধর্মীয় শিক্ষা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পবিত্র কুরআনসহ অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ জব্দ করা হয়। আলেম, ইমাম, পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে গ্রেপ্তার করে কারাগার ও শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। অনেকে বছরের পর বছর বন্দি ছিলেন এবং কেউ কেউ প্রাণও হারান।
ইসলামী পরিচয় মুছে ফেলার জন্য ধর্মীয় নাম রাখা, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া এবং ধর্মীয় প্রতীক প্রকাশের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় নাস্তিকতাকে উৎসাহিত করা হয় এবং নতুন প্রজন্মকে শেখানো হয় যে ধর্ম অতীতের একটি অচল ধারণা।
কিন্তু আদর্শগত দমননীতি অর্থনৈতিক সাফল্য এনে দিতে পারেনি। এনভার হোজা প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক নষ্ট করেন। ফলে আলবেনিয়া প্রায় পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যায়, খাদ্যসংকট দেখা দেয়, অবকাঠামো ভেঙে পড়তে থাকে এবং সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বঞ্চনার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়।
নাস্তিক ব্যক্তি মানসিকভাবে অস্বাভাবিক হয়ে থাকে এবং এনভার হোজাও তেমনই ছিলেন। তিনি বিদেশি হামলার ভয়ে পুরো দেশে প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার কংক্রিটের বাঙ্কার নির্মাণ করান। একটি দরিদ্র দেশের মূল্যবান সম্পদ জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের পরিবর্তে এসব বাঙ্কার নির্মাণে ব্যয় করা হয়। আজও এই বাঙ্কারগুলো সেই সময়ের ভীতসন্ত্রস্ত মানসিকতা ও ব্যর্থ নীতির নীরব স্মারক হয়ে আছে। একই সঙ্গে জনগণের বিদেশে যাওয়ার ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
১৯৮৫ সালে এনভার হোজার মৃত্যু হয়। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ভিত তখনই নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আলবেনিয়াতেও আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৯৯০ ও ১৯৯১ সালে বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে।
উন্নত ভবিষ্যতের আশায় লাখ লাখ আলবেনীয় দেশ ছাড়তে শুরু করে। বন্দরগুলোতে এমন ভিড় ছিল যে মানুষ ইতালিগামী জাহাজে যেকোনোভাবে উঠতে চাইছিল। অনেক জাহাজে ধারণক্ষমতার বহু গুণ বেশি মানুষ উঠে পড়ে। শুধু ১৯৯১ সালেই প্রায় তিন লাখ মানুষ আলবেনিয়া ত্যাগ করে। পরবর্তী কয়েক বছরে এই সংখ্যা আরও কয়েক লাখে পৌঁছে যায়। এটি ছিল সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের নীরব রায়, যে ব্যবস্থা উন্নতির স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের বঞ্চনা, ভয় ও নিঃসঙ্গতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি।
কমিউনিস্ট সরকারের পতনের পর ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরে আসে। বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা মসজিদগুলো আবার জনবহুল হতে থাকে, মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়, কুরআন শিক্ষার ধারা পুনরায় শুরু হয় এবং আজানের ধ্বনি আবার আকাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। রাজধানী তিরানায় নির্মিত বিশাল নামাজগাহ মসজিদ এই নতুন ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আজ আলবেনিয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা সাংবিধানিক অধিকার। জনসংখ্যার অধিকাংশ এখনো মুসলিম, যদিও কমিউনিস্ট যুগের গভীর প্রভাব সমাজে এখনো অনুভূত হয়। তবুও গত তিন দশকে ইসলামী শিক্ষা, মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কুরআনভিত্তিক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আলবেনিয়া ধীরে ধীরে উন্নতির পথেও এগিয়ে চলেছে। দেশটি ন্যাটোর সদস্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রার্থী। পর্যটন, জ্বালানি, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে ধারাবাহিক উন্নতি করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও বাড়ছে। রাজধানী তিরানা আধুনিক ইউরোপীয় শহরগুলোর তুলনায় খুব বেশি পিছিয়ে নেই। সড়ক, বিমানবন্দর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পর্যটনকেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। আজকের আলবেনিয়া প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র যখন জবরদস্তি, চিন্তার একনায়কত্ব ও ধর্মবিদ্বেষ ত্যাগ করে স্বাধীনতা, ভারসাম্য এবং বিশ্বের সঙ্গে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে, তখনই প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, কোনো জাতির উন্নতি তার বিশ্বাসকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং জ্ঞান, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী আধ্যাত্মিক ভিত্তির মধ্যে নিহিত। যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ওপর নিজেদের দাঁড় করায়, তারা সাময়িকভাবে কিছু হৈচৈ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বভাব, তার ঈমান এবং তার স্বাধীনতাকে চিরদিনের জন্য পরাজিত করতে পারে না। উন্নতির নামে উপস্থাপিত নাস্তিকতা শেষ পর্যন্ত একটি মরীচিকাই প্রমাণিত হয়, আর ঈমান চিরকাল জীবন্ত ও অমর থাকে।
ছবিগুলো আলবেনিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া নাগরিকদের।